এ দিকে আমাদের কথার প্যাঁচের পুঁজি যে ফুরিয়ে এসেছে।
এতদূর পর্যন্ত পৌঁছবার আগেই ঘনাদা তেতে উঠতে উঠতে একেবারে দাউ দাউ করে জ্বলে আমাদের বেয়াদপির উচিত শিক্ষা দেবেন এই ছিল আমাদের হিসেব।
কিন্তু দাউ দাউ করে জ্বলা কোথায়, ঘনাদার একটু উষম গরম হবার লক্ষণও যে নেই।
শিশির ইতিমধ্যেই বেশ ফাঁপরে পড়েছে বোঝা যাচ্ছে।
রিহার্সেল মাফিক আমাদের তখন একটু বাঁকা সুরে শেষ প্রশ্নটা ঝুলি থেকে ছাড়তে হয়েছে।
জ্বালাবার বদলে কৃষ্ণ আর অর্জুন তো আগুন নেভাতে হন্যে হয়েছিলেন। খাণ্ডব বনে আগুনটা তাহলে লেগেছিল কেন?
কেন লেগেছিল? জবাবের পুঁজি ফুরিয়ে ফেলে শিশিরের অবস্থা তখন কাহিল। হালে পানি না পেয়ে আমাদের জিজ্ঞাসাটাই সে আবার আউড়ে বললে, কেন লেগেছিল জিজ্ঞাসা করছ?
হ্যাঁ, করছি।–কথার পিঠে খোঁচাটা দিতেই হল—অর্জুন শ্রীকৃষ্ণ তো আর বনের মধ্যে লুকিয়ে সিগারেট থুড়ি তামাক খাচ্ছিলেন না!
তামাক খাবেন কেন! সুরটা চড়া হলেও শিশিরের গলায় তখন আর যেন জোর নেই—তামাক বলে কিছু তখন ছিল? ভারতে তো নয়ই, ইউরোপে এশিয়াতেও কেউ এ জিনিস জানত না।
শিশিরের এ বিদ্যে জাহিরের চেষ্টাতেও কিন্তু আসল সমস্যার সুরাহা কিছু হল না। আমরা শিশিরকে নাকাল করতে চাই না। কিন্তু যেমন করে তোক তর্কটাকে গরম রাখবার জন্য শিশিরকেই না খুঁচিয়ে আমাদের উপায় কী?
থাক, তামাক নিয়ে আর জ্ঞান দিতে হবে না! বলতেই হল আমাদের, খাণ্ডব বনে আগুন কী করে লাগল, সেইটেই আগে শোনাও।
আগুন লাগল মানে—শিশির এবার তোতলা হতে শুরু করেছে—আগুন, কী বলে বনে আগুন কি কখনও লাগে না?
নিশ্চয়ই লাগে!-আমরাও তখন জুতসই জবাব খুঁজতে দিশাহারা।
কিন্তু কথাটা হচ্ছে যে আলাদা—” বলে কোনও রকমে খেইটা টেনে রেখে ঘনাদার দিকে চাইলাম। দৃষ্টিটা এবার সত্যিই অসহায় করুণ। সত্যি, হল কী ঘনাদার? এখনও তিনি নির্বিকার। আমাদের বেয়াদবির শোধ নেবার এমন মৌ-কা পেয়েও মুখ বুজে থাকবেন! এই ভারত-যুদ্ধে সত্যিই অস্ত্রগ্রহণ করবেন না একেবারে?
আমাদের তো তাহলে নাকে খত দিয়ে রণে ভঙ্গে দিতে হয়। নইলে ওদিকে হিঙের কচুরি আর ইলিশ ভাজা তপ্ত খোলা থেকে নেমে যে ক্রমশ জুড়িয়ে মিইয়ে যাবে।
মরিয়া হয়ে তাই সোজা ঘনাদাকেই মুরুব্বি মানলাম—শুনেছেন তো, ঘনাদা, আজগুবি কথা! মহাভারতের গুল না ভুল বার করেছে শিশির!
কিন্তু কই, তাঁর সাড়া কই। ঘনাদার চোখ দুটো যেন একটু কোঁচকানো, কিন্তু মুখ দিয়ে তো স্রেফ খানিকটা ধোঁয়াই ছাড়লেন!
আর কোনও আশা আমাদের নেই ভেবে যখন হাল ছেড়ে দিয়েছি তখন হঠাৎ অঘটন ঘটে গেল। ঘটল শিশিরেরই ড়ুবতে গিয়ে কুটো ধরার এক চালে।
আমরা যখন ঘনাদার মুখের দিকে আকুল হয়ে চেয়ে আছি তখন হঠাৎ বারান্দা থেকে তার বাজখাঁই গলা শোনা গেল—বনোয়ারি, রামভুজ! বলি, তোমরা কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছ নাকি! খাবারগুলো কি ভিজে ন্যাকড়া করে আনবে!
ব্যস, ওই ক-টা কথাতেই অমন ভোজবাজি হয়ে যাবে কে ভেবেছিল!
ঘনাদাকে আরাম-কেদারায় হেলান দেওয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসতে দেখা গেল।
তারপর আমাদের সকলের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে তিনি মুখও খুললেন!
কিন্তু যা আশা করছিলাম সে বজ্রস্বর কোথায়? তার বদলে নরম গলায় যেন একটু আসকারা দেওয়া জিজ্ঞাসা—শিশির খাণ্ডবদাহের বৃত্তান্তটা বেঠিক বলছে, না?
তা গলাটা খাদেই হোক বা নিখাদে, আমরা ওই মুখ খোলাটুকুতেই কৃতার্থ। আগুনের ওই ফুলকিটুকুই গনগনে করে তোলবার আশায় প্রাণপণে হাওয়া দিলাম।
শিশির তখন বারান্দা থেকে তার জায়গায় এসে বসেছে। তাকে প্রায় খুনের আসামির কাঠগড়ায় তুলে কড়া নালিশ জানালাম, শুধু বেঠিক কী! ও বলছে ভুল না হলে গুলও হতে পারে। কৃষ্ণ আর অর্জুন নাকি খাণ্ডব বনে আগুনই লাগাননি!
তা, শিশির ভুল আর কী বলেছে?
একেবারে হাঁ হয়ে গিয়ে ঘনাদার দিকে তাকালাম। না, আমাদের শোনার কিছু ভুল হয়নি। কথাগুলো ঘনাদার মুখ থেকেই বেরিয়েছে।
কিন্তু, খাণ্ডব বনে আগুন তাহলে লাগল কী করে? হতভম্ব মুখে আগের মিথ্যে করে বানানো প্রশ্নটা এবার সত্যি করেই বললাম ঘনাদাকে।
উত্তর তখনই মিলল না। ঘনাদার চোখ তখন বনোয়ারি যেখান দিয়ে ঢুকছে সেই দরজার দিকে।
উত্তরের জন্য একটু অপেক্ষা করতে হল তাই। একটু মানে, আলুর দম সমেত ডজন খানেক হিঙের কচুরি আর প্রায় ততগুলি ইলিশ ভাজার সদগতির পর বোয়ারির দেওয়া প্লেটটি চাঁচাপোঁছা হয়ে যতক্ষণ না ঘনাদার কোল থেকে আবার সামনের টেবিলে নামল।
প্লেট নামিয়ে চায়ের পেয়ালাটা মুখে তোলবার পর নিজে থেকেই আমাদের প্রশ্নটা স্মরণ করে বললেন, কেমন করে খাণ্ডব বনে আগুন লাগল জিজ্ঞাসা করছ? কেমন করে আর! অগ্নিদেব নিজেই আগুন লাগালেন নিজের গরজে।
মহাভারতেও তো তাই আছে—আমরা উৎসাহিত হয়ে যা বলতে যাচ্ছিলাম তা আর বলা হল না।
ঘনাদা তর্জনী আর মধ্যম আঙুলের মাঝে শিশিরের জ্বালিয়ে দেওয়া পরের সিগারেটটি ধরে বাধা দিয়ে বললেন, ওইটুকুই মহাভারতে ঠিক আছে, তার বেশি নয়।
তার মানে? আমাদের বিস্ফারিত চোখে বলতেই হল, ইন্দ্রদেব মেঘের পাল নিয়ে বৃষ্টিতে আগুন নেভাতে আসেননি?
আসবেন না কেন? ঘনাদা এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ইন্দ্রদেবও বৃষ্টি নামিয়েছেন, কৃষ্ণার্জুনও সে বৃষ্টি উড়িয়ে দিয়েছেন অস্ত্রের কেরামতিতে, কিন্তু সে লড়াই তো আপোসের। তলায় তলায় ইন্দ্রদেবের সঙ্গে কৃষ্ণার্জুনের সড়-ই ছিল ওই রকম।
