সে শব্দ যদি তেতলা পর্যন্ত না পৌঁছয়, যা ভাজা হচ্ছে তার সুবাস গোটা বাড়ি তো বটেই, ছাদ ডিঙিয়ে পাশের বাড়ির মানুষের জিভেও জল না ঝরিয়ে ছাড়বে না।
সে হিঙের কচুরির মোহিনী সুরভিতে যদি কাত না হন, তার পরেই পাড়া আমোদ করা চাকাচাকা গঙ্গার ইলিশ ভাজার গন্ধ।
হিঙের কচুরির সঙ্গে ইলিশ ভাজা কি রসে রুচিতে মেলে?
মিলুক না মিলুক, কার্যোদ্ধার হওয়া নিয়ে কথা। তা যে হয়েছে ন্যাড়া সিঁড়িতে চটির আওয়াজেই তো বোঝা যাচ্ছে। নীচে থেকে এসব গন্ধ তাঁর ঘরে গিয়ে পৌঁছচ্ছে অথচ বনোয়ারির চুলের টিকিও দেখা যাচ্ছে না ওপরের ছাদে, এ যন্ত্রণা কতক্ষণ আর সহ্য হয়!
আমাদের গণনা মতো ঘনাদাকে নিজেই একবার তাই সরেজমিনে তদন্ত করবার জন্য নামতে হচ্ছে।
তাঁর নেমে আসার খবর জানার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের দোসরা চাল শুরু। সে চাল হল শিশিরের ওই পাড়া কাঁপানো গলায়-না, নেই।
নেই? গৌরের পাল্লা দেওয়া গলার প্রতিবাদ—মহাভারতে খাণ্ডবদাহের ঠিক বিবরণ নেই? শোন তাহলে—
শতেক যোজন বন খাণ্ডব বিস্তার।
লাগিল অনল, উঠে পর্বত আকার॥
কৃষ্ণার্জুন দুই দিকে রহে দুই জন।
নিঃশঙ্কে দহয়ে বন দেব হুতাশন॥
প্রলয়ের মেঘ যেন, শুনি গড়গড়ি।
নানা জাতি বৃক্ষ পোড়ে শুনি চড়বড়ি॥
নানাজাতি পশু পোড়ে নানা পক্ষিগণ।
নানাজাতি পুড়িয়া মরয়ে নাগগণ॥
গৌর এ পর্যন্ত আওড়াবার মধ্যেই ঘনাদা আড্ডাঘরে পৌঁছে যান। দরজা থেকে ভেতরে আসবার মধ্যেই সবাই আমরা দাঁড়িয়ে উঠে নিঃশব্দে অভ্যর্থনা জানাই তাঁর মৌরসি আরামকেদারাটা ওরই মধ্যে একটু ঝাড়ামোছার ভান করে এগিয়ে দিয়ে।
ঘনাদা সে কেদারায় যথারীতি গা এলিয়ে দেওয়ার পরও আমাদের পালা কীর্তন কিন্তু থামে না। এতক্ষণ ধরে সবকিছুর মধ্যে তা সমানে চলে এসেছে। গৌর তার আবৃত্তি শেষ করতে না করতে শিবু পয়ার থেকে ত্রিপদীতে নামার ভূমিকা করে বলেছে, শুধু ওই খাণ্ডবদাহ ঠেকাবার জন্যে যুদ্ধটার কথা কি ভুলে যাব নাকি? সব ক-টি দেবতা আর চর অনুচর নিয়ে স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র এসেছেন খাণ্ডব বন বাঁচাতে–
এই মত গুটিগুটি দেবতা তেত্রিশ কোটি
গেল বন রক্ষার কারণে।
আইল গরুড় পক্ষী সঙ্গে লক্ষ লক্ষ পক্ষী
রক্ষা হেতু নিজ জ্ঞাতিগণে।
যক্ষরক্ষ ভূতদানা সহ নিজ নিজ সেনা
নানা অস্ত্র শেল শূল লৈয়া।
এমত লিখিব কত ত্রিভুবন আছে যত
রহে সবে আকাশ জুড়িয়া।
তবে দেব পুরন্দরে আজ্ঞা দিল জলধরে
বৃষ্টি করি নিবায় অনল।
আজ্ঞামাত্র অতি বেগে সম্বর্তাদি চারি মেঘে
মূষল ধারায় ঢালে জল।
প্রলয় কালের বৃষ্টি যেন মজাইতে সৃষ্টি
শিলা জলে ছাইল আকাশ।
মহাঘোর ডাক ছাড়ে ঝনঝনা ঘন পড়ে
তিন লোকে লাগিল তরাস।
দেখি পার্থ মহাবল না পড়িতে বৃষ্টি জল
শোষক বায়ব্য অস্ত্র এড়ে।
শূন্যে অস্ত্র উঠে রোষে শোষকে সলিল শেষে
বায়ব্যে সকল মেঘ ওড়ে॥
গৌর শিবুর চেয়ে আমি-ই বা কম যাই কেন? শিবু দম নিতে একটু থামতেই আমি একেবারে মূল মহাভারত নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম –আদি মহাভারতে স্বয়ং ব্যাসদেব কী বলে গেছেন জানিস? বলে গেছেন, ভগবান হুতাশন সপ্ত শিখা বিস্তার করিয়া চতুর্দিকে প্রজ্জ্বলিত হইয়া খাণ্ডবারণ্য দগ্ধ করিতে আরম্ভ করিলেন, তৎকাল যুগান্ত কালের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল—
গুল! শিশির বাধা দিয়ে মাতব্বরি চালে বললে, গুল না হলে বেবাক ভুল!
শিশিরের এই টিপ্পনিই করবার কথা। কিন্তু আমাদের রিহার্সেল দেওয়া সিনেরিওর। মতো আমায় কথাটা শেষ করতে দেওয়া উচিত ছিল নাকি! আর দুটো লাইন মাত্র বলাটুকুর তর সইল না!
তখুনি ঘনাদার সামনে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়ে খাণ্ডবদাহ পালার ভুষ্টিনাশ করে দিতে ইচ্ছে করে কি না?
তবু নিজের মহানুভবতায় রাগটা সামলে পরের সংলাপটা সিনেরিও মাফিক-ই বললাম, গুল! গুল না হলে ভুল? মহাভারতের? কী বলছ, কী?
ঠিক কথাই বলছি। শিশির যেন তুরীয়লোক থেকে বললে, মহাভারতে কি ভুল কোথাও নেই?
তুমি যখন বলছ তখন আছে হয়তো! আড়চোখে একবার ঘনাদার দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কিন্তু ভুল বা গুলটা কী জানতে পারি?
তা পারো বইকী, শিশির যেন বাণী বিতরণের ভঙ্গিতে ঘনাদাকেও টেক্কা দিয়ে বললে, খাণ্ডব বন জ্বালাতে নয়, তার আগুন নেভাতেই কৃষ্ণ আর অর্জুনকে লেজে-গোবরে হতে হয়েছিল।
তার মানে খাণ্ডব বনে আগুন লাগাতে কৃষ্ণ আর অর্জুন সাহায্য করেননি? তাঁরা আগুন নেভাবার জন্যই অস্থির হয়েছিলেন?
একেবারে যেন হাঁ হয়ে প্রশ্নটা শিশিরকেই করলাম বটে, কিন্তু চোখগুলো আমাদের আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দেওয়া ঘনাদারই দিকে।
কী করছেন কী ঘনাদা? এত রকম টোপ ফেলে তাঁকে নামিয়ে আনা, তার ওপর তাঁর মুখের সামনে তাঁরই দেখানো চাল চেলে এই সব বাজে বুকনির বেয়াদবি করা, এতেও ঘনাদা খেপে উঠবেন না? তাঁকে একেবারে চিড়বিড়িয়ে তোলবার জন্য আয়োজনের কোনও ত্রুটি তো কোথাও রাখিনি। আমাদের এই গা-জ্বালানো বাজে বুকনির সঙ্গে নীচের রসুইঘর থেকে হিঙের কচুরি আর ইলিশ ভাজার গন্ধটুকুই শুধু তাঁকে পেতে দিয়েছি, আসল মালের এখনও পর্যন্ত দেখাই মেলেনি।
এসব জ্বালার ওপর খাণ্ডবদাহের এই নয়া ব্যাখ্যায় ঘনাদার তো নিজেরই আগুন হয়ে হুংকার দিয়ে ওঠবার কথা!
কিন্তু তার বদলে ঘরে ঢোকা মাত্র শিশিরের কৌটো খুলে বার করে ধরিয়ে দেওয়া সিগারেটটি মৌজ করে টানতে টানতে তিনি যেন নির্বিকার হয়ে আমাদের কথা শুনছেন মনে হচ্ছে।
