অতি ক্রোধে ভগদত্ত করয়ে সংগ্রাম।
লিখনে না যায় তার যুদ্ধ অনুপম॥
লক্ষ লক্ষ সেনা মারে চক্ষের নিমেষে।
ভগদত্ত যুদ্ধ দেখি দুর্যোধন হাসে॥
পাণ্ডবের সেনাগণ হইল অস্থির।
দেখি মহা ভয় পান রাজা যুধিষ্ঠির॥
এ তো কাশীরাম দাসের তিন হাত ফের বিবরণ। আদি মূল মহাভারতেই কী। লিখেছেন, শোনো—এইরূপ গজারোহী মহাবাহু ভগদত্ত পাণ্ডব ও পাঞ্চাল সৈন্যগণকে সংহার করিতে আরম্ভ করিলে তাহারা রণে ভঙ্গ দিয়ে পলায়ন করিতে লাগিল।
গোপাল বনমধ্যে দণ্ড দ্বারা পশুগণকে যেরূপ তাড়িত করে, মহাবীর ভগদত্ত তদ্রপ পাণ্ডব সৈন্যগণকে বারবার তাড়িত করিতে লাগিলেন।
এ ভগদত্তকে ভয় করে না কুরুক্ষেত্রে এমন কেউ নেই। ধনঞ্জয় অর্জুন নিজেই স্বীকার করেছেন—মহাবীর ভগদত্ত গজযান বিশারদ ও পুরন্দর সদৃশ। উনি এই ভূমণ্ডলে গজবোধীগণের প্রধান। উঁহার গজের প্রতিগজ নাই। ওই গজ কৃতকর্মা জিতক্লম এবং অস্ত্রাঘাত ও অগ্নিস্পর্শ সহনক্ষম। অদ্য ওই হস্তী একাকী সমুদয় পাণ্ডব সৈন্য সংহার করিবে।
শুধু পাণ্ডব সৈন্য নয়, স্বয়ং অর্জুনেরও মরণ বাণ ওই ভগদত্তের হাতে।
ঠিক ঠিক? গৌর বিদ্যে জাহির করবার সেই মৌ-কাটা ছাড়তে পারল না, ভগদত্তের সেই বৈষ্ণবাস্ত্র কেমন! কিন্তু সে অস্ত্র তো শ্রীকৃষ্ণ নিজের বুক দিয়ে ঠেকিয়ে বৈজয়ন্তীমালা বানিয়ে ফেললেন।
বানিয়ে ফেললেন আবার কোথায়? ঘনাদা প্রায় ধমকই দিলেন আমাদের, সে অস্ত্র বজ্র হয়ে পড়তে গিয়ে আলোর মালাই হয়ে গেল আকাশে! কিন্তু কেন? ভগদত্তের অমোঘ বৈষ্ণবাস্ত্রের ও দশা হল কেন?
আমরা নির্বাক। কারও মুখে আর কথা নেই।
ঘনাদা নিজের জিজ্ঞাসার জবাব নিজেই দিলেন, এ ভেস্তা বৈষ্ণবাস্ত্রের মূলেও দুর্যোধনের সেই ভুল উলুক। তাঁর হাতিদের ন্যায্য খোরাক না দিতে পেরে ভগদত্তের কিছুদিন থেকেই মেজাজটা খুব খারাপ। যুদ্ধটা তাড়াতাড়ি চুকিয়ে দিয়ে দেশে ফেরার জন্য তাই তিনি অস্থির। সেই মতলবেই ক-দিন থেকে রোজ তিনি উলূককে কটা জিনিস আনিয়ে দেবার জন্য তাগাদা দিচ্ছেন। তিনি নিজে হস্তিনার বাজারে জিনিসগুলোর সরেস নমুনা পাননি বলেই অন্য কোনও শহর থেকে সেগুলো আনিয়ে দেবার জন্যে উন্মুককে এই ফরমাশ। উলূক কিন্তু যেন গা-ই দেয় না তাঁর কথায়। দু-চারটে নমুনা যা এনে তাঁকে দেখিয়েছে ভগদত্ত তা দেখেই হস্তিনার বাজারেরই রদ্দি মাল বলে চিনে বাতিল করলেন। হস্তিনার বাজারে রদ্দি ছাড়া কোনও মাল কেন নেই এই বিষয়েই কোনও সন্দেহ শুধু তাঁর মাথায় আসেনি। সত্যের খাতিরে অবশ্য স্বীকার করতে হবে যে বাজারের সরেস মাল উধাওর ব্যাপারে উকের কোনও হাত ছিল না। অন্য শহরে গিয়ে সওদা করে আনার দায়টুকু শুধু সে নেয়নি, আর গড়িমসি করে শেষ পর্যন্ত হস্তিনার বাজার থেকে সে রদ্দি মাল এনে। দিয়েছে, নিরুপায় হয়ে ভগদত্তকে কাজ সারতে হয়েছে তাই দিয়েই।
সেই জন্যেই বজ্র হয়ে যার নামবার কথা অব্যর্থ সে বৈষ্ণবাস্ত্রের ওই দশা। হাউইজার হয়ে ছোটার বদলে আকাশে হাউই-এর তারাবাজি। বাসুদেব সত্যিই গলায় পরুন বা না পরুন, তাঁর নামে গল্পটা ভালভাবেই রটেছে যুগের পর যুগে।
ঘনাদা থেমে শিশিরের সিগারেটের টিনটা হাতিয়ে উঠে যাবার উপক্রম করতেই আমাদের এবার তাঁকে ধরে থামাতে হয়েছে।
রদ্দি মশলার জন্যেই কি ভগদত্তের বৈষ্ণবাস্ত্রের ওই দুর্দশা? আমার প্রশ্ন।
মশলাগুলো কী? গৌরের কৌতূহল।
হস্তিনার বাজার থেকে সরেস মশলা সব উধাও হয়ে রদ্দি মালই শুধু রইল কেন? শিবুর সন্দিগ্ধ জিজ্ঞাসা।
মশলাগুলো হল সোরা, গন্ধক আর চিনি, ঘনাদা সংক্ষেপে তাঁর জবাব সেরেছেন। মশলা বাজে হওয়ায় কামানের বারুদের কাজ না হয়ে তাতে শুধু তারাবাজির হাউই-ই উড়েছে, আর বৈষ্ণবাস্ত্রের মশলা জেনে তা ভণ্ডুল করবার জন্য স্বয়ং কেশব বাসুদেবই বাজার থেকে সব সরেস মাল আগে থাকতে সরিয়ে ফেলেছেন।
শুনুন! শুনুন, ঘনাদা!
আরও অনেক প্রশ্ন তখন আমাদের মাথায় চাড়া দিয়ে উঠেছে সেগুলোর জবাবের জন্য ঘনাদাকে বৃথাই আকুলভাবে ডেকেছি।
ঘনাদা ততক্ষণে সিঁড়ি বেয়ে তাঁর টঙের ঘরে। শিশিরের সিগারেটের টিনটা নিয়ে অবশ্য।
খাণ্ডবদাহে ঘনাদা
না, নেই।
বাজখাঁই গলাটা শিশিরের। তবে শুধু আমাদের আড্ডাঘরের চার দেয়ালের মধ্যে থাকবার জন্যে নয়, বাহাত্তর নম্বরের সব কটা তলা ছাড়িয়ে বনমালি নস্কর লেনে বাঁক পর্যন্ত পৌঁছবার মতো।
গলাটা অত চড়াবার অবশ্য দরকার ছিল না। তেতলার টঙের ঘরে যাবার ন্যাড়া সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছবার মতো হলেই চলত। কারণ সেখানে তালতলার চটিজোড়ার পেটেন্ট আওয়াজ শোনামাত্রই পালাটা শুরু করা হয়েছে।
বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের টঙের ঘরে যাবার ন্যাড়া সিঁড়িতে তালতলার চটির আওয়াজটা যে কার পায়ের তা নিশ্চয় কাউকে বলে দিতে হবে না।
আওয়াজটা ঘনাদারই পায়ের, আর উঠতি নয়, নামতি। মানে ঘনাদা তাঁর টঙের ঘর থেকে নেমে আসছেন। আসছেন মানে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। না এসে যাবেন। কোথায়? দু-দিন ধরে প্ল্যান করে সেই ব্যবস্থাই করেছি। মাছের জন্য যেমন চার ফেলা, তেমনই তাঁকে টঙের ঘর থেকে টেনে বার করে আনার জন্য সকাল থেকেই গন্ধ ছড়ানো হচ্ছে বাতাসে।
প্রথমেই সকাল সাতটা না বাজতে বাজতে নীচের রসুইঘরে রামভুজের তেলের কড়ায় ছ্যাঁক ছ্যাঁক করে কী যেন ভাজার শব্দ।
