উলূক অতিরথ ভগদত্তের কোনও খাতির গোড়া থেকেই রাখেনি। প্রথম দিনই ভগদত্ত অতি কষ্টে নিজেকে সামলেছেন। তিনি যে কে তা ওই একটা চ্যাংড়া ছোকরা জানবে কোথা থেকে! ক্ষত্রিয় যোদ্ধাদের ভেতর সেরা যারা, তাদের বলে রথ, রথের ওপর হল মহারথ। যেমন দ্রোণাচার্যের ছেলে অশ্বত্থামা, জরাসন্ধ। এই মহারথদের ওপর যাঁরা তাঁরা হলেন অতিরথ, যেমন ভীষ্ম দ্রোণাচার্য অর্জুনের মতো প্রাগজ্যোতিষপুরের ভগদত্ত। এই অতিরথ ভগদত্তের মতো মানুষকে চিনে যোগ্য সমাদরে অভ্যর্থনা করবার জন্য দুর্যোধনের পয়লা নম্বর হুঁশিয়ার পাকা লোক রাখা উচিত ছিল।
ভগদত্ত তো যুদ্ধের নামে রাজধানী হস্তিনাপুরটা একটু বেড়িয়ে যেতে আসেননি। যুদ্ধ করা কাকে বলে তিনি কুরু-পাণ্ডব দুই পক্ষকে দেখিয়ে দিতে এসেছেন। তা দেখতে শুধু হাতেআসবেন কেন? সঙ্গে যা এনেছেন দরকার হলে একাই তাতে বুঝি কুরুক্ষেত্রর যুদ্ধের ফয়সালা করে দিতে পারেন।
আমাদের কাশীরাম দাস তো সে সৈন্যসামন্তের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া বহর বোঝাতে অঙ্ক-টঙ্কই সব গুলিয়ে ফেলেছেন।
ভগদত্ত রাজা আসে পেয়ে নিমন্ত্রণ।
অবুদ অর্বুদ সৈন্য করিয়া সাজন।।
সহস্র শতেক কোটি অশ্ব আসোয়ার।
ষষ্ঠী-কোটি মহারথী তার পরিবার।।
ছত্রিশ সহস্র কোটি সঙ্গে মত্ত হাতি।
চতুরঙ্গ দল সহ আসে নরপতি॥
বিবিধ বাদ্যের শব্দে কাঁপে মহীধর।
মিলিত হইল কুরু সৈন্যের ভিতর।।
মিলিত হওয়া আর হল কই! প্রথম থেকেই উলূকের সঙ্গে খটাখটি।
দপ্তরে বসে ভারিক্কি চালে জাবদা খাতা খুলে টুকতে ঢুকতে মুখ না তুলেই বলেছে, কী নাম? ভগদত্ত। ঠিকানা? প্রাগজ্যোতিষপুর। সঙ্গে লটবহর লোকজন কত?
অতিরথ ভগদত্ত তখনই রাগে ফুলছেন। তবু নিজেকে সামলে উত্তর যা দিতে গিয়েছেন তার কটা শব্দ উচ্চারণ করতে না করতেই উলূক খাতায় চোখ রেখেই ক-টা টিক মারতে মারতে বলেছে, যান, চলে যান যামুন পর্বতে।
যামুন পর্বতে কেন? ভগদত্তের গলা তখনও নামানো। যুদ্ধ করতে এসেছি। কুরুক্ষেত্রে, যামুন পর্বতে যাব কোন দুঃখে!
যামুন পর্বত পছন্দ না হয় চলে যান রোহিতকারণ্যে। উলুক তখনও মুখ তোলেনি, অঢেল জায়গা পড়ে আছে।
অঢেল জায়গার লোভে তো আসিনি, ভগদত্ত কোনও রকমে নিজের ওপর রাশ টেনে বলেছেন, অঢেল জায়গার অভাব আমার দেশে নেই। আমি কৌরবপক্ষে যুদ্ধ করতে এসেছি। এখানেই কাছাকাছি থাকার ব্যবস্থা চাই।
মনে মনে ভগদত্তের উচ্চারণের খুঁতগুলোতে মজা পেলেও মানুষটার জেদের দাবিতে তখন বিরক্ত হয়ে উঠেছে উল্ক। জাবদা খাতায় কী লিখতে লিখতে মাতব্বরি চালে যেন হুকুম শুনিয়েছে, কাছাকাছি কোথাও হবে না। এখানে বড় ভিড়। হয় যামুন পর্বত নয় রোহিতকারণ্যে যেতেই হবে।
না।
এবার চমকে উলূককে মুখ তুলতে হয়েছে। হঠাৎ এই বাজ পড়ার আওয়াজ যিনি গলা থেকে বার করতে পারেন, দেখতেও হয়েছে সে মানুষটাকে একটু মন দিয়ে।
হ্যাঁ, বাজের আওয়াজ বার করবার মতোই যে চেহারা তা স্বীকার করতে হয়েছে মনে মনে। লম্বা চওড়া তেমন নয়, কিন্তু একেবারে যেন লোহা পিটিয়ে গড়া। মুখের দিকে চাইলে তো একটু শিউরে উঠতেই হয়। চোখ দিয়ে যেন আগুনের হলকা বার হচ্ছে।
উলূক আর তর্কাতর্কি করেনি। হস্তিনানগরের কাছেই জায়গা দিয়েছে প্ৰাগজ্যোতিষপুরের ভগদত্তকে। কিন্তু সে জায়গায় তাঁর সৈন্য-সামন্ত আর হাতির পাল নিয়ে কুলোবে কেন?
বিরক্ত হয়ে ভগদত্ত তাঁর সেরা এক কুড়ি হাতি ফেরতই পাঠিয়ে দিয়েছেন। প্ৰাগজ্যোতিষপুরে।
উলূক একদিকে হার মানতে বাধ্য হলেও এ হারের শোধ নিয়েছে আর-এক দিকে। হাতে না মারতে পেরে ভাতে মেরেছে বলা যায়। ভগদত্তের সেইসব মত্ত মাতঙ্গের খোরাক দিয়েছে যেন ঘোড়ার মাপে।
এই নিয়ে ভগদত্তকে প্রায় রোজ আসতে হয়েছে উলূকের কাছে নালিশ জানাতে।
শকুনির ছেলে উলূক এখন ভগদত্তের সামনে যেন ননীর মতো নরম। হাত জোড় করে নালিশ শুনে তার অনুচরদের লোক-দেখানো গালাগাল দেয়, কিন্তু হাতিদের খোরাকের ব্যবস্থা থাকে যথাপূর্বম।
ভগদত্ত শেষে একদিন তাই আগুন হয়ে উঠে শাপ দিয়েছেন উলূককে, তোমার জন্য যমদূতেরা তো নরকের দরজা খুলেই রেখেছে, তোমার নামটাকে আমি অভিসম্পাত দিয়ে গেলাম। যুগ যুগ বাদেও এ নামটা লোকের মন থেকে মুছে যাবে না, গালাগাল হয়ে থাকবে মানুষের মুখে।
ও! আমরা যথারীতি বিস্মিত হয়ে বললাম, ও! উল্কই হয়েছে উল্লুক।
হ্যাঁ, ঘনাদা মুখটাকে যেন করুণ করে এবার বললেন, কিন্তু উল্লুক না উলুক যাই বলো, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধটার পরিণাম ওলট-পালট হয়ে যাবার মূল হল সে-ই। তাকে। তোমরা যাকে বলো কমিশারিয়েট, সেখানে বসাবার মতো ভুল যদি দুর্যোধন না করতেন তাহলে কোথায় থাকে পাণ্ডবদের জারিজুরি, পাঁচ ভাই পাণ্ডবের মধ্যে যিনি মধ্যমণি সেই গাণ্ডিবী অর্জুনই কেঁসে যান সবার আগে।
ওই উল্লুক, থুড়ি উলুক সৈন্যসামন্তদের তদ্বির তদারক আর খানাপিনার সেরেস্তাদার হয়েছিল বলে স্বয়ং অর্জুনের নির্ঘাত মৌথের ফাঁড়া কেটে গেল।— ঘনাদার কাছ থেকেও এতটা বাড়াবাড়ি হজম করা যে একটু শক্ত গলায় তার সুরটা একেবারে গোপন রাখলাম না।
কিন্তু ঘনাদা নট নড়নচড়ন নট কিচ্ছু! রীতিমতো জোর দিয়ে বললেন, তাই তো গেল। ভগদত্তের সৈন্যসামন্ত আর হাতির পালের কথাই শুনেছ, সে কী রকম লড়িয়ে তা আর কতটুকু জানো! কাশীরাম দাস তো বর্ণনা দিতে গিয়েই হার মেনে শুধু লিখেছেন,
