উঁহু! মাথা নাড়লেন ঘনাদা। এ পক্ষে ও পক্ষে কথা যা চালাচালি করেছে তা একেবারে যেন টেপ রেকর্ডারের মতো। একটি কথাও ভুলচুক নেই।
তবে? আমাদের বিমূঢ় জিজ্ঞাসা—উলূককে নিয়ে দুর্যোধনের ভুলটা কোথায়?
ভুল! ঘনাদা এবার বোঝালেন, তার দৌত্যের বাহাদুরি দেখে তাকে যুদ্ধের কমিশেরিয়াটের মাথায় বসিয়ে দেওয়া—উলূক এইটেই চেয়েছিল। যুদ্ধ আরম্ভ হবার আগেই সে রীতিমত গুছিয়ে নিয়ে তার নিজের দেশ গান্ধারে যা পাঠালে তাতে, কৌরব পাণ্ডব যে পক্ষই জিতুক, তার কিছু আসবে যাবে না। পায়ের ওপর পা দিয়ে অমন সাতপুরুষ তার সুখে কাটিয়ে দিতে পারবে।
তার মানে চুরি করেছিল উলুক? আমরা স্তম্ভিত কিন্তু যুদ্ধ আরম্ভ করবার আগে অত চুরি করল কী করে?
কী করে আবার? ঘনাদা ঈষৎ হাসলেন। স্রেফ ওই গুনতির ফাঁকিতে। দুর্যোধনের হয়ে যুদ্ধ করতে এক এক রাজা তাঁর দলবল আর লটবহর নিয়ে আসেন আর উলূক তাদের খাওয়া থাকার ব্যবস্থা থেকেই মোটা রোজগারের ব্যবস্থা করলেন। বেশি কিছু ঝামেলা তো নয়, শুধু একটা দুটো শূন্য বাড়িয়ে যাওয়া। এক অক্ষৌহিণী কীসে হয় জানো তো? পদাতিক, ঘোড়সওয়ার, রথ আর হাতি নিয়ে মোট দু লক্ষ আঠারো হাজার সাতশো সেনায় এক চতুরঙ্গ। পুরো চতুরঙ্গ হবার তো দরকার নেই। উকের কাছে। এখানে একটা, ওখানে একটা শূন্য বসিয়েই সে অক্ষৌহিণী পুরো করে দিয়ে তাদের খানাপিনা তোয়াজ তদ্বির বাবদ দুর্যোধনের খাজাঞ্চিখানা ফাঁক করবার ফিকির করে নেয়, সামনাসামনি রাখলে পাছে ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণের মতো ধুরন্ধর সেনাপতিদের চোখে ধরা পড়ে যায় বলে জায়গার অভাবের ছুতোয় উলূক যত দলকে পারে, পাঠিয়ে দেয় দূর-দূরান্তরে।
ঘনাদা একটু থামতে তাঁর এ ব্যাখ্যানের একটু খুঁত ধরতেই হল। তা উনূকের এই চুরির জন্য, কুরুক্ষেত্রে কৌরবদের হার হয়েছিল বলতে চান?
পাগল! ঘনাদা অবজ্ঞাভরে প্রতিবাদ জানালেন, ও চুরি তো দুর্যোধনের খাজাঞ্চিখানায় একটু বড় গোছের ফুটোও করতে পারেনি। ও চুরির ওপর উলূক যদি হস্তিনাপুরের সব কটা পুকুর মায় কুরুক্ষেত্রের দ্বৈপায়ন হ্রদটাও চুরি করে পাচার করত কৌরবেরা তাতেও কাবু হত না।
তা হলে কাবু তারা হল কেন? আমরা যুক্তি দেখালাম, গুনতির ফাঁকি-টাকি সব বাদ দিয়ে ধরেও দুর্যোধনের পক্ষে মোটমাট আট অক্ষৌহিণী তো ছিল। পাণ্ডবদের চেয়ে পুরো এক অক্ষৌহিণী বেশি। তাতে তাদের হার হওয়া কী উচিত?
কখনও নয়। তবু হার হল কেন? নিজেই প্রশ্ন তুলে ঘনাদা তার উত্তর দিলেন, হার হল উলূকের চুরির দরুন নয়, তার মুখখু মাতব্বরিতে। একাই গাণ্ডিবী অর্জুন সমেত পাঁচ ভাই পাণ্ডবকে যিনি কুপোকাত করতে পারতেন সেই বীরের সেরা বীরকেই উলূক দিয়েছে খেপিয়ে। নেহাত এক কথার মানুষ বলে দুর্যোধনের কাছে প্রতিজ্ঞা রাখবার জন্য চলে যেতে আর পারেননি। তবে নিজের যা বড় মূলধন তার অর্ধেকই দিয়েছেন দেশে পাঠিয়ে।
উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের শুকনো ন্যাড়া পাহাড়ের দেশ গান্ধারের ছেলে উলুক, ওই বীরের সেরা অতিরথ বীরের মর্ম সে আর কী জানবে!
কাজকর্মের পর সন্ধেয় ইয়ারবন্ধুর কাছে ওই বীরের সেরা বীরকে সে ঠাট্টা-তামাশাই করেছে।
ইয়ারবন্ধু তার অবশ্য হেঁজিপেজি কেউ নয়। দুর্যোধনের ছেলে লক্ষ্মণ, দুঃশাসনের ছেলে বৃহদ্বল, কর্ণের ছেলে বৃষসেন, এদের কাছেই ঠাট্টা করে নাক সিঁটকে সে বলেছে, কী সব মাল যে এই যুদ্ধের টানে আমদানি হচ্ছে হস্তিনাপুরে! আজ এক চিজ এসেছিলেন আমাদের কৌরবপক্ষকে কৃতার্থ করতে! জিভের এখনও আড়ই ভাঙেনি। সমস্তকে বলে হমন্ত। চোর বলতে বলে চুর, আর সঙ্গে যাদের এনেছে প্রায় অর্ধেক হস্তিনানগরই চাই তাদের থাকার জন্য।
বৃষসেন বাদে অন্য সবাই এ কথায় উলূকের সঙ্গে হেসে উঠেছে। কর্ণের ছেলেই একটু প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, মানুষটা নিশ্চয় পূর্বী। পূর্বীদের উচ্চারণ এমনই একটু বাঁকা হয়। কিন্তু তাতে হাসবার কী আছে! ওরা উচ্চারণ যেমনই করুক, যুদ্ধ যা করে দেখলে চোখ টেরা হয়ে জিভ এড়িয়ে যাবে তোমারও। মানুষটা কোথাকার বলো তো? মনে আছে তার দেশটার নাম?
আছে, আছে। তাচ্ছিল্য ভরে বলেছে উল্ক, ওই পুব সীমান্তের প্ৰাগজ্যোতিষপুর না কী যেন বললে।
প্রাগজ্যোতিষপুর! চমকে উঠে বলেছে বৃষসেন, সেখানকার ভগদত্ত নয় তো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ভগদত্তই যেন বলছিল নামটা। উলূক অবজ্ঞাভরেই বলেছে, যা কথাবার্তার ধরন আর উচ্চারণ, ভাল করে বুঝতেই পারিনি। তা ছাড়া তোমার এই ভগদত্ত সঙ্গে করে কী এনেছেন জানো? একটি দুটি নয়, শ-দুয়েক এক হাতির পাল। সেই হাতির পালের জন্য জায়গা দিতে হবে শুনে বলেছি—অত হাতির আমাদের কিছু দরকার নেই।
তুমি তা-ই বললে? উলূকের দিকে তাজ্জব হয়ে চেয়ে হতাশ সুরে বলেছে বৃষসেন, প্রাগজ্যোতিষপুরের ভগদত্তকে তুমি বললে যে তার হাতিতে আমাদের দরকার নেই! তা তুমি গান্ধারের নীরস ন্যাড়া পাহাড়ের গাধা আর অশ্বতরই চেনো, পুব মুলুকের বিশেষ করে প্রাগজ্যোতিষপুরের ভগদত্তের হাতির দাম আর তুমি কী করে জানবে? ভগদত্তের কথা ছেড়েই দাও, তার ওই এক-একটা হাতি প্রায় আধা অক্ষৌহিণী চতুরঙ্গ সেনার সমান তা জানো?
খুব জানি! খুব জানি? উলূক ব্যঙ্গের সুরে বলেছে, ও পূর্বিয়াদের দৌড় আমার খুব জানা আছে! নিজেদের বনজঙ্গলে সবাই ওরা খুব বাহাদুর। এখানে লড়াইয়ের দুটো হাঁক শুনলেই দাঁত চিরকুটিয়ে ভির্মি যাবে। ওই মালেদের এক পাল হাতি পুষতে আমি রোজ রোজ এক জঙ্গল করে খোরাক জোগাতে পারব না।
