গৌরের ব্যাখ্যান শুনতে শুনতে চোখটা ঘনাদার দিকেই রাখতে হয় তাঁর মেজাজের ওয়েদার রিপোর্ট ঠিকঠাক নিয়ে যাবার জন্য। তাঁর দান ফেলতে দেরি করিয়ে দেবার জন্য একটু আধটু তাতলে কোনও ক্ষতি নেই। বরং গরম হলে তুবড়ি ছুটবে ভাল বলে একটু তাতাতেই চাই। কিন্তু তাতে গিয়ে তেতো না হয়ে যায় সেটাও খেয়াল রাখা চাই।
ঘনাদার একটু যেন সেরকম ভাবগতিক দেখে গৌরকে একটু তাড়া দিতে হল।
প্যাঁচটা কী কেষ্ট ঠাকুরের? পাঁচ গাঁয়ের প্রত্যেকটিতে পাণ্ডবভবন বসিয়ে পাণ্ডব কীর্তিকাহিনী শুনিয়ে শুনিয়ে দুর্যোধনের বিরুদ্ধে খেপানো?
উঁহুঃ!! গৌর একেবারে কৌটিল্য সেজে বললে, করিডর দাবি।
করিডর দাবি? আমরা যথাবিহিত আর যথোচিত হতভম্ব।
হ্যাঁ, করিডরই—গৌর বিশদ হল। আয়ুব খাঁ যেমন তখনকার পুব পশ্চিমের দুই পাকিস্তানের মধ্যে করিডরের কথা ভেবেছিলেন, সেইরকম করিডর দাবি করা পাঁচ-ভাইয়ের পাঁচ রাজ্যের মধ্যে। দুর্যোধন সস্তায় সারবার লোভে পাঁচ গাঁ দেবার প্রস্তাবে রাজি হলেই জম্বুদ্বীপ এফোঁড় ওফোঁড় করা এই পাঁচ করিডরের ঠেলাতেই কুপোকাত হতেন। শ্রীকৃষ্ণের লুকোনো প্যাঁচটি ধরে ফেলেই বিনা যুদ্ধে ছুঁচের ডগার জমিও দেব না বলে তিনি যে তম্বি করেছিলেন সেটা তাঁর ভুল নয়। দুর্যোধনের ভুল হল ওই এগারো অক্ষৌহিণী সৈন্য।
তার মানে? গৌরকে কড়া গলায় জেরা করতে হল, ওই অত সৈন্য জোগাড় করাই দুর্যোধনের ভুল তুমি বলতে চাও।
হ্যাঁ, দারুণ ভুল! গৌর তার সিদ্ধান্তে অটল, ওই অত সেনাদের সামলানো কি সোজা কথা! তখন তো আর রেডিয়ো ছিল না, টেলিফোনও নয়। শুধু তুরী ভেরী বাজিয়ে দরকারের সময় ঠিক মতো কাউকে কি পাওয়া যায়। ধনুর্ধারী বাহিনীকে চাইলে জগঝম্প বাজিয়েরা এসে কান ঝালাপালা করে। অত অগুনতি সৈন্যে বেসামাল হয়েই দুর্যোধন কুরুক্ষেত্রে কাবু। তাই না, ঘনাদা?
না–বলে একটি প্রচণ্ড ধমক শোনবার জন্য ঘনাদার দিকে উৎসুক ভাবে চাইলাম।
তাঁকে এতক্ষণ কিউ-এ দাঁড় করিয়ে রাখার শোধ কেমন করে তিনি নেন তাই দেখবার জন্যই তো এত তোড়জোড়।
কিন্তু এ কী হল? দুমফটাস করে যা ফাটবে তা যে শুধু একটু ফুস করল মাত্র!
একদিক দিয়ে তা অবশ্য বলা যায়! আমাদের যেমন হতাশ তেমনই হতভম্ব করে ঘনাদা গৌরের কথাতেই সায় দিলেন যে!
শুধু কি সায়। সেই সঙ্গে গৌরের তরফে নজিরও হাজির করে যেন হাতের খবরের কাগজের মতো পড়ে গেলেন, মিলিটারি রেকর্ডে তো পাচ্ছি, হস্তিনাপুর নগরে ধরেনি বলে শুধু পঞ্চনদে নয়—সমস্ত কুরু জাঙ্গাল, রোহিতকারণ্য, অহিচ্ছত্র, কালকূট, গঙ্গাকুল, বারণ, বাটধান, সামুন পর্বত পর্যন্ত তাদের চালান করা হয়েছে।
কুরুক্ষেত্রের মিলিটারি রেকর্ডে তাই আছে বুঝি? আমরা হতাশ হয়ে ঘনাদার দিকে তাকিয়ে বললাম, তা হলে ওই এগারো অক্ষৌহিণীই দুর্যোধনের কাল হয়েছে বলতে হবে!
হ্যাঁ, তা-ই হত। ঘনাদা গলাটায় যেন একটু বাঁকা সুর দিয়ে বললেন, যদি—
যদি? আমরা যেন মৃতসঞ্জীবনীর কৌটায় চাঙ্গা হতে হতে বললাম, যদি কী?
যদি, গুনতিটা ঠিক হত।ঘনাদা হাতের শেষ করা সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে চেপে ধরে বললেন।
আর কি কিছু আমাদের ভুল হয়!
তাঁর ফুরোনো সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে ঘষে নেভানো হতে না হতে শিশির তার নতুন টিনটা খুলে সামনে ধরে জিজ্ঞাসা করলে, গুনতিতেই ভুল আছে বুঝি? এগারো অক্ষৌহিণী নয়?
ঘনাদা শিশিরের টিন থেকে নতুন সিগারেট নিয়ে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের নখের ওপর ঠুকতে ঠুকতে একটু নাসিকাধ্বনি করলেন মাত্র। শিশির ততক্ষণে লাইটার জ্বেলে সামনে ধরেছে।
সিগারেটটা মুখে নিয়ে সেই লাইটারের আগুনে ধরিয়ে একটানেই একরাশ ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ঘনাদা অবজ্ঞাভরে বললেন, মেরেকেটে আট অক্ষৌহিণী হলেও যথেষ্ট! যথেষ্ট!
তা হলে? আমরা পালা করে বিস্মিত জিজ্ঞাসা চালালাম।
ওই যে এগারো অক্ষৌহিণী বলে লেখা? আমি বিস্ময়ে মুখব্যাদান করলাম।
সে লেখার তা হলে কোনও দাম নেই! শিবু হাঁ হল!
মাত্র আট অক্ষৌহিণী তা হলে এগারো বলে চালু হল কী করে? গৌরের সোজাসুজি প্রশ্ন।
সেই সঙ্গে শিশিরের ছোট্ট একটু টিপ্পনি–দুর্যোধনের হামবড়াই নিশ্চয়!
না, দুর্যোধনের হামবড়াই নয়। ঘনাদা শিশিরকেই আগে জবাব দিয়ে আর একরাশ ধোঁয়ার সঙ্গে তাঁর মোক্ষম সম্মোহন শর কয়টি ছাড়লেন, আট অক্ষৌহিণী এগারো হওয়ার মূলেই আছে দুর্যোধনের সর্বনাশা ভুল, যার নাম হল উলুক।
উলূক? এবার আমাদের আর অবাক হবার ভান করতে হল না।
হ্যাঁ, উল্লুক নয়, উলূক! ঘনাদা বিশদ হলেন–তবে নামটা যে একদিন ওই গালাগাল হয়ে উঠবে ভারত বীর ভগদত্ত শাপ দিয়ে সেই ভবিষ্যদ্বাণী তখনই করে গিয়েছিলেন।
এই উল্লুক থুড়ি উল্কই হল দুর্যোধনের ভুল? আমরা আঁচটা পড়তে না দেবার জন্য উসকে দিয়ে বললাম, যে কুরুক্ষেত্রে কৌরবদের হারের মূল? কে ইনি?
ইনি কে জানো না! ঘনাদা খুশি হয়ে আমাদের অজ্ঞতা দূর করলেন, ইনি হলেন স্বয়ং ধৃতরাষ্ট্রের সম্বন্ধী, দুর্যোধনের মাতুল স্বনামধন্য শকুনির ছেলে। বাপের চেয়ে এক কাঠি সরেস। ছোকরা খুব চটপটে চালাক চতুর, চোখে মুখে খই ফোটে বলে এই মামাতো ভাইটিকে দুর্যোধনের খুব পছন্দ। পাণ্ডবদের কাছে তাকেই পাঠিয়েছেন দূত করে, শ্রীকৃষ্ণের কাছে দ্বারকায় পর্যন্ত দৌত্য করতে গেছে এই উলুক।
দৌত্য করতে গিয়ে সব গুবলেট করেছিল বুঝি উল্লুকটা থুড়ি ওই উল্ক? সরলভাবে জিজ্ঞাসা করলে শিবু।
