কী করে বুঝলেন, ঘনাদা! একটু ধাতস্থ হয়ে কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করতে পেরেছি এবার, শুধু কানে দিয়ে?
হ্যাঁ। ঘনাদা জ্বলন্ত ক্ষুব্ধ স্বরে জানিয়েছেন, এই জাল খুশকি দিয়ে আমায় কালা করবার একটা ষড়যন্ত্র হয়েছে বলে সন্দেহ হচ্ছে।
যথার্থই প্রমাদ গুণে আমরা প্রাণপণে তাঁকে আশ্বস্ত করবার চেষ্টা করেছি, না না, সে কী বলছেন! ষড়যন্ত্র কে করবে! আর একটা খুশকি কানে দিলে কি কালা হতে হয়?
হয়। ঘনাদার স্বর জলদগম্ভীর—এ খুশকি আমার কানের পর্দা ফুটো করে ভেতরের নলে চলে যেতে পারে। এক-আধটা নয়, দস্তুর মতো তিয়াত্তর ঢেউ বড় এটা?
আমাদের বিহ্বল বিমূঢ় মুখগুলোর দিকে চেয়ে এবার বুঝি ঘনাদার একটু দয়া হয়েছে। করুণা করে বলেছেন, তিয়াত্তর ঢেউ বুঝতে পারছ না বোধহয়! ওটা হল সবচেয়ে হালফিল মাপের একটা হিসেব। এখন আর প্যারিসের কাছে রাখা দু-জায়গায় লাইন কাটা প্ল্যাটিনম ইরিডিয়ম-এর বার দিয়ে নিখুঁত মাপ ঠিক করা হয় না। ১৯৬০ সালেই ও ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেছে। এখন এক মিটারের মাপ ঠিক করা হয় আলোর ঢেউ দিয়ে। তা-ও সাধারণ যে-কোনও আলোর নয়, দুর্লভ গ্যাস ক্রিপটন-৮৬, তারই বাতি জলের মতো তরল করা নাইট্রোজনের মধ্যে রাখবার পর যে জরদা-লাল আলো বার হয় তার-ই যোলো লক্ষ পঞ্চাশ হাজার সাতশো তেষট্টি দশমিক তিয়াত্তর তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য হল এক মিটার।
মাথায় চরকিপাক লাগার দরুনই শুধু কানে দিয়ে খুশকিটা লম্বায় তিয়াত্তর ঢেউ বেশি কী করে বুঝলেন তা আর ঘনাদাকে জিজ্ঞাসা করতে পারিনি।
ক্লোরোফর্ম গোছের অ্যানেসথেসিয়ার ওষুধে একবার অসাড় করে যা খুশি কাটা-ছেঁড়া করতে পারে ডাক্তারেরা। আমাদের অবস্থাও হয়েছে তাই।
টঙের ঘর থেকে একরকম পাকা কথা দিয়েই নেমে এসেছি।
আমাদের সদাশিব বাড়িওয়ালাকে চটাতে হয় চটাব। করপোরেশনের সঙ্গে মামলায় আসামি হতে হয়, তা-ও সই। যা ঝক্তি নিতে হয় সব নিয়ে ঘনাদার ঘরের দক্ষিণের দেওয়ালে জানালা একটা ফোটাবই।
কাঁচা ইট পোড়ালে যদি শক্ত হয়, তাহলে দুর্গাপুরের দুটো সাদা বেড়াল নিটে নেংটি ধরবে না কেন।
কেন ধরবে ঘনাদা তা আমাদের জল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর অকাট্য যুক্তির শৃঙ্খলে। বনোয়ারির বেকুফিতে ঘনাদার মহামূল্য কান-খুশকি হারালে কেন তাঁর ঘরের দক্ষিণ দেওয়ালে জানালা না ফোটালে নয়, তা বোঝাবার ধাপগুলো হল এই—এক) বনোয়ারি ঘর ঝাঁট দিতে গিয়ে কান-খুশকি হারিয়েছে। (দুই) কান-খুশকি ঘরে না থাকলে হারাতো না। (তিন) কান-খুশকি ঘরে থাকে কেন? (চার) কান চুলকোয় বলে। (পাঁচ) কান চুলকোয় কেন? (ছয়) চোখের কাজ কম! (সাত) কেন কম? (আট) ঘরে আলোর অভাব। (নয়) আলো বাড়বে কেমন করে? (দশ) দক্ষিণের দেওয়ালে জানালা ফুটিয়ে।
ঘনাদার ফুঁ (গল্পগ্রন্থ)
কুরুক্ষেত্রে ঘনাদা
ভুল! বললেন ঘনাদা।
মনে মনে বললাম, শুরু হল গুল! মুখে কিন্তু পুরো ভ্যাবাচ্যাকা ভাব ফুটিয়ে বললাম, বলেন কী, ঘনাদা? কুরুক্ষেত্রের ওই পরিণাম হল দুর্যোধনের শুধু একটি ভুলে?
কী ভুল বলব? শিবু আগ বাড়িয়ে সাহায্য করতে–বিচক্ষণতা দেখাতে এল, যুদ্ধের তারিখটা আরও একটু পিছিয়ে না দেওয়া।
ঘনাদা তো নয়ই, আমরাও কেউ তার বিচক্ষণতায় উৎসাহ না দেখালেও সে সবিস্তারে তার ব্যাখ্যাটা আমাদের না শুনিয়ে ছাড়ল না। এই যেমন আমাদের ইলেকশনে হয়। বেশ জাঁকিয়ে যারা গদিতে বসে আছে তারা ভাবে তাড়াতাড়ি ইলেকশন করালে নতুন উটকো দল জোগাড়যন্তর করে লড়বার জন্য তৈরি হবার সময়ই পাবে না। দখলদার দলই ফাঁকা মাঠে লাঠি ঘুরিয়ে বাজিমাত করবে। কিন্তু সেইখানেই হয় ঠিকে ভুল। দুর্যোধন ভেবেছিল তাড়াতাড়ি যুদ্ধটা আরম্ভ করিয়ে দিলে পাণ্ডবেরা কৌরবদের মতো সৈন্য জোগাড় করতে পারবে না
তা তো পারেইনি। শিশির একটানে শিবুর মাঞ্জা দেওয়া যুক্তির সুতো ভোকাট্টা করে দিল। কোথায় কৌরবদের এগারো অক্ষৌহিণী সৈন্য আর পাণ্ডবদের মোটে সাত। ভুল এখানে নয়, দুর্যোধনের মারাত্মক ভুল হয়েছে পাণ্ডবেরা বোকার মতো যে প্রস্তাব করে বসেছিল তাতে তৎক্ষণাৎ রাজি না হয়ে যাওয়া। কী চেয়েছিল পাণ্ডরেরা? পাঁচটা মাত্র গাঁ। কেমন গাঁ, কোথায়, তা তো কিছু বলেনি। একসঙ্গে দিতে হবে এমনই কথা ছিল না। পাঁচ ভাইকে জম্বু দ্বীপের পাঁচ ধাড়ধাড়া গোবিন্দপুরে পাঁচটা অখদ্দে গাঁ দিলেই চুকে যেত ল্যাটা। নামগুলো যাই হোক ম্যালেরিয়া কালাজ্বর পেলেগ-টেলেগ তখন কি আর ছিল না! খুব ছিল। বেছে বেছে সেই রকম ক-টা গাঁয়ে পাঁচ ভাই পাণ্ডবকে বসিয়ে দিলেই ব্যাস, আর দেখতে হত না। যুধিষ্ঠির নকুল সহদেব তো নস্যি! ওই ভীমার্জুনও বছর ঘুরতে না ঘুরতে কুপোকাত! কী বলেন, ঘনাদা?
ঘনাদা আবার কী বলবেন? গৌর শিশিরের বাহাদুরির ফাঁপা ফানুসটা ঘনাদার কাছে পর্যন্ত পৌছবার আগেই খুঁচিয়ে ফুটো করে বললে, ভীমার্জুন পাঁচ ভাইকে পাঁচটা বনগাঁ দিলেই দুর্যোধন যেন কুরুক্ষেত্রে না নেমে পাণ্ডবদের রামঠকান ঠকাতে পারতেন! আরে পাঁচটা মাত্র গ্রাম চেয়ে পাঠিয়েছিলেন যুধিষ্ঠির। শুনতে ভারী সহজ সরল আহাম্মকের মতো প্রস্তাব। কিন্তু ওর ভেতর যা প্যাঁচ, তা শকুনির পাশার খুঁটিতেও ছিল না সেই দূতক্রীড়ার সময়। ও প্যাঁচ যার-তার তো নয়—প্যাঁচের চ্যাম্পিয়ন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের মাথা থেকে বার করা। এ প্রস্তাব মেনে নিলে দুর্যোধন কীরকম গাঁ যে দিতেন তা বাসুদেবের ভাল করেই জানা ছিল। তাঁর প্যাঁচের খেলা শুরু জম্বুদ্বীপের পাঁচ কোনায় পাঁচটি গ্রাম পাবার পর।
