তা মাপ এক চুল এদিক-ওদিক হলে, ঘনাদাই বা ধরবেন কীসে? তিনি তো আর হিসেব দেখে রাখেননি।
সেই ভরসাতেই ঘনাদার উদ্ভট ন্যায়শাস্ত্রের প্রথম চালের জন্য তৈরি হয়েছিলাম।
বনোয়ারি করুণ কাতর মুখে ওপর থেকে নেমে জানিয়েছে যে বড়বাবু সকালের চা জলখাবার ফেরত দিয়েছেন।
ফেরত দিয়েছেন। কিন্তু এ পাড়ায় নয়, চার চারটে পল্লী ছাড়িয়ে ডাকসাইটে দোকান থেকে স্পেশ্যাল লড়াই-এ চপ ভাজিয়ে এনে প্রায় এক ধামা মশলা মুড়ির সঙ্গে পাঠানো হয়েছে যে।
যেতে হল তখুনি টঙের ঘরে! না, ডিমোক্রেসি অর্থাৎ রাজনীতির চালে আমরাও ভুল করব না। মশলা মুড়ি লড়াই-এ চপের খবরই আমরা যেন রাখি না। আমরা শুধু গেছি আজকের খ্যাঁটের মেনুটা কী হবে একটু পরামর্শ করতে।
তপসে উঠেছে নাকি শেয়ালদার বাজারে! শিশির যেন ডায়মন্ডহারবারের পেট্রলের খনি আবিষ্কারের খবর জানিয়েছে।
পোস্তায় বেগুনফুলিও পৌঁছে গেছে। শিবু তাল দিয়েছে সমান উৎসাহের সঙ্গে।
ঘনাদা কি বধির হয়ে থেকেছেন? না। তিনি শুধু নির্বিকার নির্লিপ্ত। আমাদের দিকে একবার চোখ তুলে চেয়ে আবার তাঁর খবরের কাগজে মনোনিবেশ করেছেন।
সকালের লড়াই-এ চপ হার মেনেছে। শেয়ালদা বাজারের তপসে আর পোস্তার নতুন আমদানি বেগুনফুলি আমও বিফল। তাই আর একটু কড়া উসকানি দিতে চেয়েছি। বলেছি, সকাল থেকে একটু মেঘলা মেঘলা আছে। ভাবছি ঠিক পোলাও-টোলাও নয়, আজ একটু ঘি-ভাত করা যাক। কী বলেন, ঘনাদা?
ওই ঘি-ভাতের কথাতেই কাজ হয়েছে! ঘি-টা ভাতে নয়, যেন ঘনাদার ভেতরে একয়দিন ধরে ধোঁয়ানো আগুনের ওপরই পড়েছে। ঘনাদা একেবারে দপ জ্বলে উঠেছেন, আমায় এসব কী শোনাচ্ছ? তোমরা আমায় এখানে খেতে বলো?
ঘনাদার মুখটা সত্যি দেখবার মতো। ইলেকশনের পর বিজয়ী পার্টির নেতাকে যেন দলত্যাগ করতে বলেছি, ভাবখানা এই রকম।
কেন? কী হয়েছে, ঘনাদা! আমরা তারস্বরে হাহাকার করে উঠেছি।
এর পর চার মাথা এক করে যেমন এঁচে রেখেছিলাম ঠিক তেমনিই সব ঘটেছে, একেবারে দাগে দাগ মিলিয়ে।
তবু শেষ পর্যন্ত ঘনাদার কাছ থেকে একেবারে কুপোকাত হয়ে ফিরতে হয়েছে।
দোষটা পুরোপুরি গৌরের। কী দরকার ছিল তার পাকামি করে ওই পাঁচকড়ার বিদ্যে জাহির করতে যাওয়ার।
নইলে, সব খুঁটি তো আমাদের জিবের মুখেই নড়ছিল। আমাদের হাহাকারে ফল ঠিক ফলেছে। ঘনাদা গণনা মাফিক বেকুব বনোয়ারির মুণ্ডপাত করতে করতে তাঁর লোকসানের কথা জানিয়েছেন।
কী লোকসান গেছে? আমরা উদ্বেগে সমবেদনায় গলা ধরিয়ে ফেলেছি।
আশ্বস্ত হয়েছি, আমাদের হিসেব ভুল হয়নি জেনে। হারিয়েছে ঘনাদার সেই মহামূল্য কান-খুশকি।
আমরা ব্যস্ত হয়ে উঠেছি, অমন জিনিসটা হারিয়ে গেল! ভাল করে খুঁজে দেখেছেন তো?
তা আর দেখিনি! বলে ঘনাদা সন্দেহের ওদিকটায় দাঁড়ি টানতে চেয়েছেন। আমরা যেন শুনতেই পাইনি। এক একজন পকেটে এক একটি মুশকিল আসান নিয়ে ঘরে ঢুকেছিলাম। কান-খুশকি খুঁজে পাওয়ার বরাত ছিল আমার ওপর। ঘরের মেঝের কোণ কানাচগুলো একটু দেখতে দেখতে হঠাৎ তোরঙ্গের তলা থেকেই যেন বার করে ফেলেছি খুশকিটা।
এই! এই তো আপনার খুশকি!
ঘনাদাও খুশকি হাতে নিয়ে একটু হকচকিয়ে গেছেন। দু আঙুলে ধরে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখেছেন মাত্র। মুখে আর কথা সরেনি।
শিবুর ফোড়নটাও জুতসই হয়েছে, পা গলালেই যেমন জুতোর, কানে দিলেই তেমনই খুশকির বিচার। একবার কানে দিয়েই দেখুন না, কদিন হারিয়ে পড়ে থেকেও সেই আগের সুখই দিচ্ছে।
ঘনাদা খুশকি বুঝি কানে ঢোকাতেই যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে গৌরের হিমালয় প্রমাণ আহাম্মকি!
সুখ দেবে না মানে! গৌর যেন খুশকিটাকেই ধমক দিয়েছে, যে হালেই থাক, খুশকি সুখ দেয় কানের সঙ্গে মাপের মিলে। ঘনাদা তো আর লম্বকর্ণ নন। ওঁর খুশকির মাপ একেবারে পাক্কা আট দশমিক ঊনআশি।
তার মানে? একটু অবাক হয়ে আমাদেরই জিজ্ঞাসা করতে হয়েছে, আট দশমিক উনআশি আবার কী?
কী আবার? সেন্টিমিটার! গৌর মাতব্বরের মতো বলেছে, আদর্শ খুশকির মাপ হল পাক্কা আট দশমিক উনআশি সেন্টিমিটার। একেবারে দাগে দাগে মিলে যাওয়া চাই।
কীসের দাগে দাগে?
প্রশ্নটা ঘনাদার। তিনি তখন সত্যিই খুশকিটা কানে ঢুকিয়েছেন।
বিদ্যে জাহির করবার এমন সুযোগ গৌর আর ছাড়তে পারে! মরক্কোয় বাঁধানো ঘনাদারই যেন কাগজের মলাট দেওয়া সংস্করণ হয়ে বলেছে, যে-জিনিসটি দিয়ে দুনিয়ার মাপ নির্ভুল বলে মঞ্জুর হয়, প্যারিসের কাছে ইন্টারন্যাশন্যাল ব্যুরো অফ ওয়েটস অ্যান্ড মেজার্স-এ রাখা প্ল্যাটিনম ইরিডিয়ম-এর সেই বারটির গায়ে টানা দুটি দাগের।
ঘনাদার মৃদু নাসিকাধ্বনি শোনা গেছে। এটা কানের সুখের উচ্ছ্বাস না গৌরকে উপহাস চট করে বোঝা যায়নি। ঘনাদা চোখ বুজে খুশকি নাড়তে নাড়তে থেমে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকেছেন। তারপর কান থেকে খুশকি বার করে অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ গম্ভীর স্বরে বলেছেন, না, তিয়াত্তর ঢেউ বেশি।
অ্যাঁ! আমাদের সকালের চোখ ছানাবড়া।
তিয়াত্তর ঢেউ-এর ধাক্কা সামলাতে না সামলাতে ঘনাদা আরেকটি যা আই-সি-বি-এম ছেড়েছেন তাতে আমরা একেবারে সসেমিরে!
মেম্ব্রানা টিপানি ফুড়ে রেসেস এপিটিস্প্যানিকস্ কি ইউস্টেকিয়ান টিউবে গিয়ে গোল বাধাতে পারে! বলেছেন ঘনাদা।
বুদ্ধিশুদ্ধির মতো জিভটারও সাড় ফিরতে বেশ সময় লেগেছে। ঘনাদা ততক্ষণে খুশকিটার দিকে বার কয়েক ঘৃণার দৃষ্টিতে চেয়ে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলেছেন, না, এটা আমার নয়!
