কাঁচা ইট পোড়ালে যদি শক্ত হয় তাহলে দুর্গাপুরের দুটো সাদা বেড়াল তিনটে নেংটি ধরবে না কেন। এই তো যুক্তির নমুনা।
যত আজগুবিই হোক-এ-যুক্তি শেষ প্যাঁচ পর্যন্ত যাতে না পৌঁছোত পারে তার জন্য একেবারে গোড়াতেই কোপ বসাতে চাই আমরা।
ইট শক্ত কি না বলবার সুযোগ না দিয়ে সাদা বেড়ালের নেংটি ধরার কথা তো আসে না। যুক্তি প্রলাপের প্রথম ধাপটাই তাই আমরা পাততে দেব না ঠিক করেছি।
পাততে দেব না কাকে তা আর বোধহয় বলে বোঝাতে হবে না।
একমেবাদ্বিতীয়ম্ ঘনাদা ছাড়া আর কার পক্ষে ন্যায়শাস্ত্র নিয়ে এমন ছিনিমিনি সম্ভব?
যুক্তির প্রথম ধাপটি পাতবার জন্য তিনি যে তৈরি হচ্ছেন, বুধবার সকালেই তা টের পেয়েছি আমাদের বনোয়ারিলালের ভগ্নদূতের চেহারা নিয়ে ঘরে ঢোকা থেকেই।
ছুটির দিন নয়, কিন্তু কী একটা দারুণ কারণে বুধবারটা আমাদের পাড়া বন্ধ বলে ঘোষিত হয়েছে। সারা বাংলা কি কলকাতা নয়, বন্ধু শুধু আমাদের বারো-তেরো-চোদ্দ পল্লী। এখন থেকে পল্লী ধরেই নাকি বন্ধ চালু রাখা হবে। কাজে কর্মে যাবার তাড়া না থাকায় সকালবেলাই আড্ডা ঘরে এসে জমায়েত হয়েছি টঙের ঘর থেকে নামবার সিড়ির দিকে কান পেতে রেখে।
ঘনাদা নয়, সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঘরে ঢুকেছে বনোয়ারিলাল। একেবারে কাঁদো কাঁদো চেহারা।
মুখে সে কিছু বলেনি। করুণ নিবেদনটা নীরব মুখেই ফুটিয়ে এসেছে।
কী রে, কী হল কী! আমাদেরই জিজ্ঞাসা করতে হয়েছে সন্ত্রস্ত হয়ে, বড়বাবুর মেজাজ গরম নাকি?
হাঁ, বড়া গরম। বনোয়ারি সরলভাবে অপরাধ স্বীকার করেছে, হামার কসুর হেইয়ে গেছে।
কী কসুর হল? আজ এই এমন দিনে সক্কাল বেলাই গণ্ডগোল বাধিয়ে বসলি। দিনটাই দিলি মাটি করে!
একসঙ্গে আমাদের সকলের প্রশ্নবাণের সামনে হতভম্ব হয়ে বনোয়ারিলালের প্রায় বোবা হবার অবস্থা। অনেক কষ্টে তার সাড়া ফেরাবার পর সে জানালে যে সকালে বড়বাবুর ঘর ঝাঁট দিতে গিয়ে সে তাঁর একটা লোকসান করে ফেলেছে।
কী লোকসান? কী? আমরা উদ্বেগে ব্যাকুল হয়ে জানতে চাইলাম।
সে হামি জানে না! বনোয়ারি যথাযথ বিবরণ প্রকাশ করলে, হামি ঝাড়ু দিতে আছিলাম, বড়বাবু আচানক গোসা হয়ে আমাকে বাহার যেতে বললে। বোললে হামি বহুৎ লোকসান কোরে দিয়েছি।
কী করেছিস, কী? ভেঙেছিস কিছু?
বনোয়ারি আমাদের প্রশ্নে প্রবল ভাবে মাথা নেড়ে জানালে যে জ্ঞানত কোনও কিছু সে ভাঙেনি, নষ্টও করেনি কিছু।
তাহলে?
বনোয়ারিকে বিদায় দিয়ে তখনই আমাদের মন্ত্রণা সভায় বসতে হল। ব্যাপারটা আসলে যে কী তা আমাদের আর বুঝতে বাকি নেই।
আহাম্মক বনোয়ারির দোষে কোনও কিছু লোকসান হয়েছে এ-ই হল প্রথম ধাপ। এই ধাপটুকু পাততে দিলেই কাঁচা ইট পোড়ালে শক্ত হয়-এর পর সাদা বেড়ালের ইদুর ধরার মীমাংসায় ঘনাদা আমাদেরও ঠেলে তুলবে।
প্রথম ধাপ পাতাটাই ভেস্তে দিতে হবে।
কী লোকসান হয়েছে ঘনাদার? তাঁর কোন রাজকীয় ঐশ্বর্যই বা খোয়া যেতে পারে?
যাক বা না যাক বনোয়ারির ঘাড়ে দোষ চাপাবার সুযোেগই তাঁকে দেওয়া হবে না। যা কিছু হারিয়েছে বা লোকসান হয়েছে তিনি বলতে পারেন, সব আগে থাকতে, এমন মজুত রাখব যে মুখের কথা খসতে না বসতে হাজির করব সামনে। বোয়ারির ঘর সাফের গলতি থেকে ঘরের দেওয়ালে একটা জানালা ফোটাবার আবদারে কিছুতে তিনি যাতে না পৌঁছোতে পারেন।
হ্যাঁ, এই আবদারই ধরেছেন ঘনাদা আজ কয়েকদিন হল। তাঁর ঘরে একটা মাত্র জানালা হাওয়া খেলবার জন্যে আরেকটা না খোলালে নয়।
বোঝাতে কিছু তাঁকে বাকি রাখিনি। বলেছি যে বাড়িওয়ালা অতি সজ্জন ব্যক্তি। পুরোেনো হোক সেকেলে হোক বছরের পর বছর নামমাত্র ভাড়ায় এ বাড়ি আমরা প্রায় মৌরসিপাট্টা নিয়ে ভোগদখল করে আসছি। ভাড়া বাড়াবার কথা তিনি ভুলেও একবার উচ্চারণ করেননি, কিন্তু স্নাদার টঙের ঘরে দক্ষিণের জানালা ফোটানে আঁয় সাধ্যের বাইরে। আগের আমলের ঝড়, এখনকার আনে জানালা খুলতে যতখানি জমি ছাড়া দরকার ততখানি দক্ষিণ দিকে নেই। সুতরাং জানালা ফোটানোর কথা উঠতেই পারে না।
কিন্তু ঘনাদা তাঁর সেই এক আবদার ধরে বসে আছেন। বাইরে ক-দিন একটু চুপচাপ থাকলেও ভেতরে ভেতরে যে তিনি ধোঁয়াচ্ছেন বনোয়ারির ওপর সেদিন সকালের হম্বিতম্বি থেকেই তা টের পাওয়া গেছে।
ঘরের জিনিস হারানোর ব্যাপারটাই যুক্তির প্যাঁচে পাকিয়ে পাকিয়ে এবার তিনি দেওয়াল কুঁড়ে জানালা ফোটাবার অস্ত্র করে তুলবেন।
কিন্তু সেটি হতে দেব না, আমাদেরও পণ।
ঘনাদার পক্ষে কী হারিয়েছে বলা সম্ভব?
আমরা তালিকা করে ফেলেছি তৎক্ষণাৎ। তক্তপোশ তোরঙ্গ শেলফ আলনা বাদে, হারাতে পারে এমন অস্থাবর জিনিস মাত্র কটিই পেয়েছি। তাঁর হুঁকোর কলকে, মাথায় চিরুনি, নখের নরুন, সেলাই-এর ছুঁচ আর…আর…কানখুশকির কাঠি! হ্যাঁ, নিরিবিলিতে ঘনাদাকে চোখ বুজে তন্ময় হয়ে এই শলাকাটি কানে দিয়ে যেন তুরীয় আনন্দ পেতে দেখা গেছে। শুধু একটু ঝাঁটা চালানোতে এই ক-টি ছাড়া হারাবার তাঁর কিছু নেই।
কজনে মিলে বাজার কুঁড়ে ওই কটা জিনিস কিনতে বেরিয়েছি সেদিন দুপুরেই। জিনিস অতি সামান্য, কিন্তু ওই সামান্য জিনিস কেনারই এত ঝামেলা তা আগে ভাবতে পেরেছি? শুধু জিনিসটা হলেই তো হবে না, ঘনাদার নিজস্ব সম্পত্তির সঙ্গে তার হুবহু মিল হওয়াও চাই।
কলকের কথাই ধরা যাক না। বাজারে অভাব নেই। কিন্তু ঘনাদার স্পেশ্যাল ব্র্যান্ডের গড়ন, রং, মাপ তো আর মুখস্থ করা নেই। কলকের বেলা যেমন—চিরুনি, নরুন, খুশকির কাঠির বেলাতেও তাই। কান-খুশকি, তামা না পেতল না নিকেলের, কী তার মাপ অত কি লক্ষ করে দেখেছি।
