ঘনাদা কখন ঘি-এর ভাঁড়ের কাগজের মোড়কটা খুলেছেন, কেউ দেখিনি। হাতে নিয়ে দেখি, সত্যিই মোড়কের সঙ্গে বনস্পতি কেনার রসিদটা থেকে গেছল।
কৈফিয়ত কিছু খুঁজে পাবার আগেই ঘনাদা আবার মাসতুতো ভাইকে বললেন, আমি বলি কি, নেফায় ডেয়ারি করেও সুরুসিরি কি ডাফলা আপাতানিদের নাম যখন ভুলে যান তখন আপনি নিজেই কিছু ব্রাহ্মীশাক দিয়ে ফুটিয়ে এই ঘি-টা খান গিয়ে। স্মরণশক্তি বাড়তে পারে।
না, না, ওসব ব্রাহ্মীঘৃত-টৃত নয়, শিবু সোৎসাহে বলে উঠল, এর ওষুধ আর্জেন্টাম নাইট্রিকাম।
হাসলাম, কিন্তু শিবুর সাজা মাসতুতো ভাইয়ের জন্য একটু দুঃখও হল। বেচারা আমাদের মদত দিতে এসে গৌরের শক থেরাপির মানে চমক চিকিৎসার শকটা নিজেই খেয়ে গেল। কিন্তু পার্টের মর্ম না বুঝে খোদার ওপর খোদকারি করে স্ক্রিপ্টের বাইরে ডায়লগ সে নিজের মুখে বসাতে যায়ই বা কেন?
মাপ
কাঁচা ইট পোড়ালে যদি শক্ত হয় তাহলে দুর্গাপুরের দুটো সাদা বেড়াল তিনটে নেংটি ধরবে না কেন?
কী রকম লাগছে যুক্তিটা?
আবোল-তাবোল আর হ-য-ব-র-ল-এর জট-পাকানো হারানো পাণ্ডুলিপি খুঁজে পেয়ে, তা থেকে টাটকা আমদানি করলাম মনে হচ্ছে?
সন্দেহ হচ্ছে কি যে হঠাৎ দুনিয়ার মাথার ঘিলু নিয়ে কেউ ঘোল বানিয়ে ফেলেছে?
এমন যুক্তি কারুর পক্ষে দেওয়া সম্ভব? সম্ভব বই কী! এমন যুক্তি দিতে পারেন শুধু একজন, আর সেই যুক্তির প্যাঁচে ফেলে নয়-কেহয় করে ফেলতে পারেন কথার ভেলকিবাজিতে। তাল নয়, সুতোয় একটু ঢিল পেলেই তিনি তিলকে পিষে একেবারে মোরগ-তন্দুরি আদায় করে ছাড়তে পারেন তা থেকে।
চালের ভুলে কি বিনা খেয়ালে তাঁর যুক্তির জাঁতাকলে একবার আটকা পড়লে আর রক্ষা নেই।
সেই বিপদ ঠেকাবার জন্যেই বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের একটা দিশেহ্বারা অবস্থা চলেছে ক দিন।
বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র—গত এই তিন দিন আমাদের চেহারা চাল-চলন দেখে কেউ কেউ বেশ একটু তাজ্জব হয়েছে নিশ্চয়ই। বনমালি নস্কর লেনের মেস বাড়িতে তো শুধু নয়, আমাদের দেখা গেছে বেপোট বেয়াড়া এমন সব জায়গায় যেখানে আমাদের উপস্থিতি সন্দেহজনক যদি না হয়, তাহলেও রহস্যজনক নিশ্চয়!
চেনা দু-চারজনের চোখে পড়ে তাদের প্রশ্নবাণে বেশ একটু বিব্রত হতে হয়েছে আমাদের সকলকেই।
তা প্রশ্ন যারা করেছে তাদেরই বা দোষ কী!
এই গরমের ঠা ঠা রোদুরে ভরা দুপুরবেলা শিবুকে যদি হঠাৎ বৈঠকখানা বাজারে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়, তাহলে চোখ একটু কপালে ওঠা অন্যায় নয়।
একটু সন্দিগ্ধ প্রশ্নও তারপর স্বাভাবিক।
বয়স্ক কেউ হলে বলেছেন, কী হে শিবদাস, ব্যাপার কী? দুপুরবেলা এ বাজারে কেন?
তা আপনিই বা এ বাজারে দুপুরবেলা করছেন কী? পালটা প্রশ্ন করবার ইচ্ছে হলেও বয়সের মর্যাদা দিয়ে শিবুকে সে লোভ সামলাতেই হয়!
তা ছাড়া তার নিজের অবস্থা যে অত্যন্ত কাহিল। দুপুর রোদে বাজারে কেন সে যে ঘুরে মরছে তার কৈফিয়ত কি সে সোজাসুজি দিতে পারবে? বলতে পারবে যে এক বিশেষ রঙের আর গড়নের এমন একটি মাটির তৈরি আধার সে খুঁজছে যার মধ্যে টিকের আগুনের ওপর তাম্রকুটের বটিকা সলিল সহযোগে পান করে স্বর্গীয় আনন্দ পাবার মতো ধুমরাশির সৃষ্টি হয়?
চোখ কান বুজে মরিয়া হয়ে এ-বাজারে এমন সময়ে মধ্যাহ্ন ভ্রমণের উদ্দেশ্য স্বীকার করে ফেললেও যে রেহাই নেই। তার পরের প্রশ্নের ফ্যাঁকড়া সামলাতেই যে প্রাণান্ত হবে।
অ্যাঁ! কলকে! কেন কাকে? এ রোগ আবার কবে থেকে হল? তা এই কাঠফাটা রোদে না কিনতে বার হলে নয়, এমন বেয়াড়া মৌতাত?
এমন অসময়ে বদনামের পয়লা ছোপ লাগানো কলকের মতো জিনিস কেন যে বাধ্য হয়ে খুঁজতে বেরুতে হয়েছে তা যখন বলা যাবে না তখন ধরাপড়া চোরের মতো কাঁচুমাচু মুখ করে যা হোক কিছু বিড়বিড় করে বলে সরে পড়া ছাড়া আর কী করবার আছে?
বৈঠকখানায় বাজারের বদলে কালিঘাটের মন্দিরের রাস্তায় ফুটপাথে পাতা ফেরিওয়ালাদের সওদা ঘাঁটতে বসলেও নিস্তার নেই।
আরে, গৌর না?
নিজে থেকে দেখাতে চাইলে চৌরঙ্গি দিয়ে ক্যাডিল্যাক হাঁকিয়ে গেলেও হয়তো কারুর চোখে পড়ে না, কিন্তু ঠিক এই বেয়াড়া সময়টিতে ঠাসা ভিড়ের মাঝখানেই বছর ভোর যার সঙ্গে দেখা নেই এমন চেনা লোকটির চোখে নির্ঘাত পড়ে যেতে হয়।
গৌর নিজের পরিচয়টা আর অস্বীকার করে কী করে? হ্যাঁ, ভাল তো! গোছের কিছু লৌকিকতার জবাব দিয়ে তাকে সরে পড়বার চেষ্টা করতে হয়। কিন্তু কমলি ছাড়বে কেন? বেয়াড়া প্রশ্নগুলো শুরু হয় এবারই।
এখানে রাস্তায় বসে কী কিনছিলি? এখানে তো পাড়াগাঁ মফঃস্বলের যাত্রী মেয়েছেলেরা ঠাকুর দেখে ফেরবার সময় ফিতেটা, মাথার কাঁটাটা, সস্তা আয়নাটা কিনে নিয়ে যায়। তোর সে সব দরকার না কি?
বিদ্রূপটা বেমালুম হজম করে, না, মানে,—এই বলে আমতা আমতা করে আবোল-তাবোল একটা কিছু বলে গৌর সরে পড়তে দেরি করে না।
শিবু কি গৌরের যেমন, আমাদের অবস্থা কি তার চেয়ে ভাল কিছু? মোটেই না।
বৈঠকখানা বা কালিঘাটের বদলে ব্যাঁটরা কি বেলেঘাটায় শিশির বা আমার সমান অপ্রস্তুত চেহারা।
শহর থেকে শহরতলির অমন সব বেয়াড়া বেপোট জায়গায় অসময়ে ঘুরে ফিরে আমরা খুঁজছি কী?
ঠিক জানি না।
কিন্তু কেন যে আমাদের এই দিশাহারা হয়ে ঘোরা-ফেরা তা বলতে পারি।
গোড়ায় যা দিয়ে শুরু করেছি, খ্যাপার মতো এ টহলদারি শুধু সেই ঘিলু ঘোলানো যুক্তির জাঁতাকল এড়াবার জন্য। কী আমরা চাই তা ঠিক জানি না, তবে জাঁতাকলের ঝাপটায় পড়া যাতে ঠেকানো যায়, তার জন্য যতটা সম্ভব সাজসরঞ্জাম নিয়ে তৈরি হয়ে থাকতে চাই।
