বললাম, হ্যাঁ, কেরোজেন। আজ তোমার মতো মুখখুরা তো নয়ই, এ ব্যাপারে যারা ব্যাপারি তারা নাম জানলেও এ-জিনিসের কদর বোঝে না। কিন্তু একদিন—খুব বেশি কাল পরেও নয় সারা দুনিয়ায় কাড়াকাড়ি পড়ে যাবে এই মেটে পাথর শেলের বাঁজা ডাঙার জন্য। পৃথিবীর পেট্রল ফুরিয়ে আসতে খুব দেরি নেই। দেরি যদি একটু থাকে তাহলেও দুনিয়ার মোট পেট্রলের পুঁজি এক রকম জানা। পৃথিবীতে এখন তিন লক্ষ কোটি ব্যারেলের বেশি পেট্রল নেই বলে ধরা যেতে পারে। সেই জায়গায় ভাসাভাসা জরিপে এই মেটে পাথরের-শেল-র—যা সন্ধান পাওয়া গেছে, তা থেকে সমস্ত পৃথিবীর পেট্রলের পুঁজির তিন গুণেরও বেশি তেল পাওয়া যেতে পারে। শেল পাথরের রবারের ধরনের আঁট কেরোজেন শুধু সাড়ে আটশো থেকে নশো ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপে গলিয়ে তার গন্ধক আর নাইট্রোজেনের গাদ শোধন করবার ব্যবস্থা করা দরকার। তার কায়দা বার করা কিছু শক্ত নয়। এসব জটিল ব্যাপার তোমার ও নিরেট মাথায় ঢুকবে না, কেনি! শুধু এইটুকু জেনে রাখো যে, নাইজিরিয়ায় দুদিন বাদে যদি জাতে জাতে হানাহানির লঙ্কাকাণ্ড শুরু হয় তাহলে তোমার ওই ফাঁকি দিয়ে বাগানো দাবির ছেড়া কাগজের বেশি দাম থাকবে না। কিন্তু অমন বিশ-ত্রিশ বছর বাদেও নাইজিরিয়া ঠাণ্ডা হলে টাকার একেবারে নিজস্ব হোক, এদেশের মানুষের জন্য এসম্পদ মজুত থাকবে।
থাক, খুব হয়েছে। কেনি আবার গর্জন করে উঠল, এ-মেটে পাথরের ডাঙা তোর যখন এত পছন্দ তখন এখানেই তোর হাড়গুলো যাতে শুকোয় তার ব্যবস্থা করছি। বুনো মোষ শিকারের কথা তোকে দিয়েছিলাম। সেই শিকারের সুযোগই এবার পাবি। আজ সকালে একটা বুনো মোষকে মারতে গিয়ে হাত ফসকে গেছে। মোষটা আধা জখম হয়ে স্বয়ং যমের দূত হয়ে এখানেই আছে কোথাও লুকিয়ে। অনেকদিন সাধ ছিল খ্যাপা বুনো মোষের সঙ্গে একটা মর্কটের লড়াই দেখব। আজ সেই সুবিধেই হয়েছে। নে, নাম।
কেনি আমায় প্রচণ্ড একটা ঠেলা দিলে।
জিপ থেকে পাথুরে জমির ওপরেই পড়লাম। পড়েছি ডান হাতে বন্দুকটা ঠিকমতো সামলেই।
কেনি তখন মাটির ওপর থুবড়ে পড়া মুখটা সবে একটু হতভম্ব হয়ে তুলছে।
তার কাছে যেন মাপ চেয়ে বলেছি, কিছু মনে করো না, কেনি, তোমার মতো আমারও বহুদিনের একটা সাধ ছিল, সাদা একটা হিপ্পোর সঙ্গে বুনো মোষের লড়াই দেখব। তুমি সেই সাধটা আজ মেটালে।
টার্কা জিপ থেকে তখন নামতে যাচ্ছে। তাকে বারণ করে বললাম, না টাকা, নেমো না। এটা আমাদের নিজের নিজের মান রাখবার বাজি। কেনির বন্দুকটা বাইরে ফেলে দিয়ে তুমি জিপটা নিয়ে বনের ওই কিনারে গিয়ে অপেক্ষা করো। জঙ্গলের এধারে ওই ঝোপটার নড়া দেখে বুঝছি, আমাদের খেল শুরু হতে আর দেরি নেই। যাও তুমি।
থ্যাবড়ানো মুখ নিয়ে কেনি এবার প্রায় আঁতকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল।
না, না, জিপ নিয়ে যেয়ো না। তার প্রায় আর্ত চিৎকার শোনা গেল সঙ্গে সঙ্গে, ও খ্যাপা মোষের কাছে তাহলে আজ আর রক্ষা নেই!
টাকা তখন আমার নির্দেশ মতো কেনির বন্দুকটা ফেলে দিয়ে জিপ চালিয়ে দিয়েছে।
কেনি পাগলের মতো তার পেছনে ছুটে যাবার চেষ্টা করছিল। তাকে এক হাতে টেনে ধরে ঘাড়ে একটা আদরের রন্দা দিয়ে বললাম, তোমার সাহস দেখে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি, কেনি।
কেনি মাটির ওপর তখন বসে পড়েছে উবু হয়ে। ঘাড়টা পেছন থেকে ধরে তাকে টেনে তুলে গালে একটা থাপ্পড় দিয়ে প্রশংসা জানিয়ে বললাম, আর কী তোমার দয়ার শরীর! নিজে জিপে উঠে পালিয়ে শুধু আমাকে জখম খ্যাপা মোষের মওড়া নেবার সুযোগ দিতে চাও। কিন্তু আর তোমায় সুযোগ দিতে হবে না। ফিরে দেখো, আমাদের নিয়তি নিজেই ছুটে আসছে।
কেনি আঁতকে ফিরে তাকাল। সাক্ষাৎ যমরাজের বাহনের মতো ঝোপের আড়াল থেকে ফ্রন্টিয়ার মেল ট্রেনের ইঞ্জিনের মতো ছুটে বেরিয়ে মোযটা তখন স্বয়ং শয়তানের হাতে আঁকা সেকেন্ড ব্র্যাকেটের মতো শিং সাজানো মাথাটা একটু নুইয়ে হঠাৎ একটু থমকে থেমেছে মাত্র হাত কয়েক দূরে।
একবার সেদিকে চেয়েই তার নিজের ইষ্টনাম হেঁকে কেনি পেছনে ফিরে দে ছুট!
ছুটো না। ছুটো না, কেনি! ছুটলেই সর্বনাশ! তার পেছনে চিৎকার করলাম। কিন্তু কে কার কথা শোনে!
খ্যাপা মোযটা মাথা নুইয়ে আই-সি-বি-এম-এর মতো তখন তাকে তাড়া করেছে।
ঘনাদা থামলেন। তারপর? তারপর? শিবুর মাসতুতো ভাইয়ের ব্যাকুল গলাই শুধু শোনা গেল, কী হল ওই ফ্র্যাঙ্ক কেনির?
কী হল, তা আবার বলতে হবে? শিশির সিগারেটের টিনটা ঘনাদার সামনে খুলে ধরে প্রায় ঘনাদার মতোই বাঁকা হাসি হাসবার চেষ্টা করলে।
না, না, মাথাটা তেমন সবল নয়। ওকে বুঝিয়ে বলাই দরকার। ঘনাদাই করুণা করলেন, মোষের শিংজোড়া টাকাকেই দিয়ে এসেছি।
তার মানে আপনি কেনিকে বাঁচাতে ওই খ্যাপা মোষকে মারলেন? বিস্ফারিত চোখে জিজ্ঞাসা করলে শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু।
মারব কেন? ঘনাদা যেন অবাক হয়ে বললেন, খ্যাপা মোষটা তার শিংজোড়া পায়ের কাছে খুলে রেখে প্রণামী দিয়ে গেল। আপনাদের নেফার ডেয়ারির ওই গয়াল-গাউররা তা দেয় না?
যাঃ, কী যে বলেন! শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু এবার লজ্জিত।
ভুল বললাম বুঝি! ঘনাদাও লজ্জিত হলেন, হ্যাঁ, ভুলের কথায় মনে পড়ল, আপনাদের নেফার ডেয়ারির গাউর-গয়ালরাও এখন বনস্পতি মেশানো দুধ দিচ্ছে দেখছি। এই যে রসিদটা দেখুন না!
