টার্কার অনুমান নির্ভুল প্রমাণ করে মিনিট খানেকের মধ্যেই জিপটা ডাইনের একটা বড় গাছপালার জঙ্গল ঘুরে আমাদের কাছে এসে থামল।
জিপের হুইল ধরে আছে কেনি নিজে। পেছনে তার শিকারের লটবহর নিয়ে একজন এদেশি অনুচরর
আমাদের দেখে কেনি যেমন আহ্লাদে আটখানা তেমনই যেন একেবারে তাজ্জব! আরে, তোমাদের এখানে দেখব ভাবতেই পারিনি। এ-জঙ্গলে কী করছ? লাগোসে যাবার নাম করে তাহলে শিকার করতেই নেমেছ এখানে? তা প্লেনটা কোথায়?
প্লেনটা হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে এসেছি। বেশ দন্ত বিকশিত করেই বললাম তোমার কাছে কথাটা লুকিয়েছিলাম, কিন্তু ভাগ্যের এমন দয়া যে তোমার সঙ্গে শিকারের সাধটাও আশ্চর্যভাবে মিটিয়ে দিলে!
ঠিক! ঠিক! আমিও তো তা-ই ভাবছি! কেনি একেবারে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল, ভাগ্যই, নইলে হঠাৎ তোমাদের দেখাই পাইয়ে দেবে কেন? এসো, জিপে উঠে এসো। তোমার শিকারের শখটা মিটিয়ে দিই।
বন্দুক নিয়ে জিপে উঠে বসলাম। আমি সামনে কেনির ডাইনে, আর টাকা পেছনের সিটে।
আমরা ওঠবার পরই জিপ চালিয়ে দিয়ে কেনি বললে, বড় ভাল সময়ে তোমায় পেয়ে গেছি, দাস। জানো নিশ্চয়ই যে, পশ্চিম আফ্রিকার বুনো মোষের চেয়ে দুর্দান্ত জানোয়ার পৃথিবীতে নেই। এ বুনো মোষ যদি একবার খেপে তাহলে সিংহ হাতি গণ্ডার তার তুলনায় যেন পোষা জানোয়ার। এ অঞ্চলের সেই বিখ্যাত বুনো মোষের এক পালেরই সন্ধান পেয়েছি আজ সকালে। সেখানেই তোমায় নিয়ে যাচ্ছি।
সত্যিই তোমার বন্ধুপ্রীতির তুলনা নেই।আমি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললাম, কিন্তু তুমি হঠাৎ এ-সময়ে শিকারে বেরিয়েছ যে! লাগোসে তোমার একবার যাওয়ার কথা ছিল না?
কেনি তার জালার মতো মুখের ভাঁটার মতো লালচে চোখের দৃষ্টি যেন বল্লমের মতো একবার আমার দিকে ছুঁড়ে রসিয়ে রসিয়ে এবার বললে, ঠিক ধরেছ, দাস। তা লাগোসের কাজটা না সেরে কি এখানে এসেছি মনে করো? তোমরা যাবার পরই আমার প্লেনটা নিয়ে লাগোসে গেলাম। সেখানে কাজটা নিঝঞ্ঝাটে হয়ে গেল বলেই ফিরে এসে একটু ফুর্তি করতে শিকারে বেরিয়ে পড়লাম।
আমাদের প্লেনটার পাত্তা নেওয়ারও সেই সঙ্গে মতলব ছিল নিশ্চয়ই!আমি তার কেজো বুদ্ধির যেন তারিফ করে বললাম, প্লেনের খোঁজ আর শিকার—একসঙ্গে রথ দেখা আর কলা বেচা দুই-ই যাতে হয়ে যায়।
কী সাফ তোমার মাথা, দাস! কেনি প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বললে, আমার দেশের কাসল-এর হলঘরে হরিণ গণ্ডার বুনো মোষের মাথার সঙ্গে বাঁধিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে!
এমন সম্মানের জন্য মাথাটা নিজেই তোমায় উইল করে যেতাম কেনি, আমি একটু যেন আফশোসের সঙ্গে বললাম, কিন্তু দেশে তোমার কাসলটা যেন ডার্টমুরে বলে শুনেছি।
ডার্টমুর? খোঁচাটা চট করে ধরতে না পেরে কেনি একটু কুঁচকে বলল, ডার্টমুরে কেন হবে? আমাদের কাসল হল—এই কী বলে কেস্টে।
বাঃ! জেনে খুশি হলাম। আমি যেন মুগ্ধ হয়ে বললাম, ওদিকে কেন্টে না ঘেষ্টে তোমার কাল, আবার এখানে এই। বেনুয়ে নদীর ধারের সমস্ত সেরা চাষের জমিই তো এখন তোমার। টাকার সব জমিই তো নিজের নামে বন্দোবস্ত করে নিয়েছ?
তা না নিলে কি চুল ছাঁটতে লাগোসে গেছলাম? এবার ফ্র্যাঙ্ক কেনির শয়তানি হাসি আর থামতে চায় না খানিকক্ষণ।
ততক্ষণে নিদিকে বিরাট জঙ্গলে ঘেরা একটা বন্ধুর পাথুরে ডাঙার ওপর আমরা এসে পড়েছি।
পাকা হাতে এবড়ো-খেবড়ো জমির ওপর দিয়ে জিপ চালিয়ে জঙ্গলের এক ধারে এসে সে ইঞ্জিন বন্ধ করে হাসতে হাসতেই বললে, টাকার কী জমি নিজের নামে বন্দোবস্ত করেছি শোন তাহলে। ভাল চাষের জমি যেখানে যত ওর ছিল সব।
আর ওই মেটে পাথরের ডাঙা জমিগুলো? ভেতরের ধুকধুকনি মুখে ফুটতে না দিয়ে নেহাত নির্বিকার গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, সেগুলোও লিখিয়ে নিয়েছ?
সেগুলো লিখিয়ে নেব আমি কি এমন আহাম্মক! কেনি আবার পৈশাচিক হাসি হাসল, আসল শাঁসটা নিয়ে খোসাটা ফেলে রেখেছি তোর মতো উজবুক যার গুরু সেই ইবো ভূতটার জন্য।
কী ধন্যবাদ যে তোমায় দেব ভেবে পাচ্ছি না, কেনি। এতক্ষণে আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে পকেট থেকে সেই মাটির গুঁড়ো খানিকটা বার করে হাতের চেটোয় রেখে বললাম, এটা কী বোধহয় চেনো?
কী ওটা? কেনি সন্দিগ্ধভাবে চাইল, খানিকটা গুড়ো মাটি তো?
হ্যাঁ, গুড়ো মাটি!আমি স্বীকার করলাম, তবে একটু ভাল করে লক্ষ করে দেখো, সাধারণ মাটি নয়, শেল যাকে বলে সেই মেটে পাথরের গুড়ো।
তুই আর আমায় শেল চেনাসনি, সুটকো মর্কট। কেনি এবার জিভ থেকে ভদ্রতার শেষ রাশটুকু খুলে নিয়ে হিংস্র উল্লাসের সঙ্গে বলল, চাষের জমি যা বাগিয়ে নিয়েছি তার পাড় দিয়ে মাইলের পর মাইল তো এই শেল-এর বাঁজা ডাঙা পড়ে আছে এখানে। দুনিয়ার কোনও কাজে লাগে না। না লাগে চাষবাসে, না করা যায় অন্য কিছু, তাই দিয়েছি সব ওই টাকাকে ছেড়ে।
হ্যাঁ, দিয়েছ! নিজের মুগুর মেরেছ নিজের কপালে। আমি এবার বিধিয়ে বিধিয়ে বললাম, একটা জলা জমির লোভে কুবেরের রাজত্ব হেলায় পায়ে ঠেলেছ।
কী আছে তোর ওই শেল-এর বাঁজা ডাঙায়? বিদ্রুপ করলেও একটু সন্দেহ ফুটে উঠল কেনির গলায়, সোনা রুপো হিরে মানিক?
যা আছে, গম্ভীর হয়ে বললাম, তা সোনাদানা হিরে মানিকের খনির চেয়ে অনেক দামি। আছে কেরোজেন।
কেরোজেন!আমি যেন তাকে ঠারে গাল পাড়ছি এমন ভাবে কেনি আমার দিকে চাইল।
