টাকা সত্যিকার ইবো-ই বটে। এত বড় বিপদ থেকে বাঁচবার কোনও আশা আর নেই জেনেও এতটুকু অস্থির হয়নি। চোয়াল দুটো শুধু একটু শক্ত হয়েছে তার। সেই কঠিন মুখ নিয়েই জিজ্ঞেস করলে, দু নম্বর ইঞ্জিনে আগুন লাগল কী করে? কাল রাত্রেও তো আপনি আমি সব চেক করে গেছি।
আবার করা উচিত ছিল আজ সকালে, নিজেকেই ধিক্কার দিয়ে কোনওমতে প্লেনটা বাঁদিকে ঘুরিয়ে টাকাকে সাবধান করেছি, কোথায় আছড়ে পড়ব জানি না। সামনে ঝুঁকে পড়ে মাথা নিচু করে দুহাতে নিজের গোড়ালি দুটো শক্ত করে ধরে থাকো। কিছুতেই মাথা তুলো না।
পাহাড়টাকে এড়ানো গেছে, কিন্তু সামনে তো জঙ্গলের আর শেষ নেই। সেখানে ক্র্যাশল্যান্ড যাকে বলে সেই ঘাড়মুড় গুজেই বা পড়বার চেষ্টা করব কোথায়? এদিকে প্লেনের একটা ইঞ্জিন জ্বলতে জ্বলতে তো পড়েই গেছে খসে খসে। প্লেনটারও পড়তে আর দেরি নেই।
তা-ই পড়ল। শুধু অনেক কসরত করে আর ভাগ্যের জোরে ঘন একটা জঙ্গলের মাথায় প্লেনটাকে নামাতে পেরে পড়ার মারাত্মক ধাক্কাটা বাঁচাতে পারলাম।
জঙ্গলের মাথায় ডালপালায় লতাপাতায় জড়িয়ে প্লেনটা ভেঙেচুরে বেঁকে দুমড়ে থামল। নেহাত কেনির সঙ্গে আমার দেখা বরাতে আছে বলে প্রায় অক্ষত শরীরেই তা থেকে মাটিতে নামতে পারলাম।
আমি একা হলে সাতদিনেও সে-জঙ্গলের হদিস জেনে তা থেকে বার হতে পারতাম না। টাকা কিন্তু মাটিতে নেমে দুটো গাছ আর ঝোপ একটু লক্ষ করে দেখেই যেন কলকাতার রাস্তা দেখে পাড়া চেনার মতো বললে, এ তো কেনির টিনের খনির কাছেই এসে নেমেছি। দিন চারেক হাঁটলেই পৌছে যাব তার ডেরায়।
টাকা দিন চারেক হাঁটার কথাটা এমনভাবে বলল যেন সেটা নেহাত মর্নিং ওয়াক।
এত দুঃখেও হেসে বললাম, সামান্য দিন চারেক না হয় হাঁটব, কিন্তু তাতে লাগোস-এ পৌছতে তো পারব না। দুদিন বাদে নতুন আইনে তোমার জমিজমা যে বেহাত হয়ে যাবে।
টাকা যা জবাব দিলে তাতে তার ওপর ভক্তি-ভালবাসা আরও বাড়ল। হেসে সে বললে, হলে আর করছি কী! প্রাণটাই বেহাত হতে যাচ্ছিল যে!
এরপর আর বলবার কিছু থাকে না।
অন্তত চারদিনের হাঁটা পথ, আর জঙ্গলও বড় সোজা নয়। হাতি গণ্ডার সিংহ চিতা জিরাফ সারা আফ্রিকার সবচেয়ে ভয়ংকর বুনো মোষ—হরিণ শম্বর—কী সে জঙ্গলে নেই। ডাঙায় ওই আর জলে হিপোপটেমাস, কুমির। এছাড়া নানা জাতের বাঁদর সাপখোপ তো আছেই। কী ভাগ্যি প্লেনের ভেতর বন্দুকগুলো ছিল। টাকা জঙ্গলের মাথায় আবার উঠে সেগুলো পেড়ে নিয়ে এল।
তাই নিয়েই রওনা হলাম। টাকা বলেছিল চারদিনের রাস্তা। হিসেবটা আমাদের পাড়াগাঁয়ের ক্রোশের মতো বোধহয়! যতক্ষণ হয়রানিতে জিভ না বেরিয়ে পড়ে ততক্ষণ ক্রোশ আর শেষ হয় না।
টাকার চারদিনের রাস্তা পার হতে আমার চার হপ্তা লেগে যেত, যদিনা অভাবিত একটা ব্যাপার যেত ঘটে।
সকালবেলা উঠেই পাখিটাখি বা খরগোশ-টরগোশ পেলে মেরে তাই বনের কাঠকুটরো জ্বেলে ঝলসে নিয়ে খাওয়া সেরে আমরা রওনা দিই। দুপুরবেলা যেদিন যেমন জোটে তেমনই একটু ছায়া খুঁজে নিয়ে খানিক বিশ্রাম করি। তারপর আবার হাঁটা শুরু করি রোদের তেজ একটু কমলে। অন্ধকার নামবার আগেই থেমে পড়ে আবার সামান্য কিছু বনের ফল-পাকুড় আর ঝলসানো মাংস খেয়ে রাত্রের ডেরা বাঁধি মজবুত কোনও গাছের মাথায়!
ভাগ্যক্রমে দিন দুয়েকের মধ্যে বড় কোনও বেয়াড়া জানোয়ারের সঙ্গে মোলাকাত হয়নি।
টাকার কোনও পরোয়াই নেই। কিন্তু হকের সম্পত্তি থেকে তার ফাঁকি পড়া নিয়ে আমার ভেতরের জ্বালাটা আর যেতে চায় না। প্লেনে কেন আগুন লেগেছিল বুঝতে আমার বাকি নেই। আমাদের মারতেই কেনি চেয়েছিল। কিন্তু প্রাণে মরি না মরি তার যা মতলব তা হাসিল হয়ে গেছে। টাকা সময়মতো গিয়ে না পৌঁছোবার দরুন তার বাজেয়াপ্ত দাবি নিজের প্লেনে লাগোস গিয়ে কেনি নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছে। নিশ্চয়ই।
বনের পথ ভেঙে চলি বটে, কিন্তু কেনির শয়তানিটা মনে হলেই মেজাজ একেবারে গরম হয়ে ওঠে। এমন সময় তিনদিনের দিন সকালে ভাগ্যই যেন আমার বন্দুকের গুলিতে এক কুদুর ভবযন্ত্রণা শেষ করালে। কুদু হচ্ছে আফ্রিকার একটা অমূল্য শিকার। পাঁচটা সিংহ সাতটা হাতি কি গণ্ডার মেরে যা না হয় তার চেয়ে বেশি গর্ব হয় শিকারির একটা নিখুঁত ছন্দে মেলানো জোড়া শিং-এর কুদু মেরে। কুদু তো হরিণ নয়, জঙ্গলের এক দৈবী মায়া। এই আছে এই নেই, কখন কী মূর্তি ধরে দেখা দেবে কেউ যেন জানে না।
সময় আর অবস্থা অন্য রকম হলে এই কুদু মারা নিয়ে একটা উৎসব পড়ে যেত। আপাতত কোনও রকমে শুধু হিসেবেই খুশি থাকবার জন্য তার শিং জোড়া মাপতে গিয়ে হঠাৎ কুদুটার পায়ের খুরের দিকে নজর গেল। খুরের ফাঁকে যে ঝরো মাটি
লেগে আছে সেটা যেন কী রকম!
শিং মাপা ভুলে গিয়ে খুরের সেই মাটি কুরে কুরে নিয়ে পকেটের ভেতরে রাখলাম।
কী করছেন, কী? টাকা অবাক, পকেটে মাটি রাখছেন কেন?
কেন রাখছি? ধর্মের কল হয়তো বাতাসে নড়েছে এই মাটিই তার ইশারা বলে।
হেঁয়ালিটা বুঝুক না বুঝুক, টাকা তা নিয়ে প্রশ্ন আর কিছু করল না।
বাতাসে ধর্মের কল নড়ার আরও একটা প্রমাণ অত তাড়াতাড়ি তারপর পাব ভাবতে পারিনি।
তখনও আমার হিসেবে অন্তত দিন চারেকের হাঁটা পথ বাকি। যন্ত্রের মতো পা চালাচ্ছি। হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনে চমকে উঠলাম।
টার্কার কান আমার চেয়েও সাফ। উত্তেজিত হয়ে বললে, এ তো জিপের আওয়াজ শুনছি। জিপ নিয়ে এখানে কেনি ছাড়া আর কে আসতে পারে?
