লাগোস থেকে প্লেনটা সেইজন্যই নিয়ে এসে রেখেছ বুঝি!তার মাথায় সবে যেন ব্যাপারটা ঢুকেছে এমন ভাব দেখিয়ে কেনি টাকার জন্যই যেন চিন্তিত হয়ে পড়েছে, জমিজমা তো পাবে। কিন্তু এসব ফুলানিদের এলাকা তা জানো তো?ইবো হয়ে টাকা এখানে কতদিন আর টিকতে পারবে তা-ই ভাবছি।
তা ফুলানিদের কানে কু-মন্তর দিয়ে ফুসলে যে রকম খেপাবার ব্যবস্থা করছ, আমি যেন কেনির কেরামতিতে মুগ্ধ হয়ে বলেছি, তাতে টাকার মতো ইববাদের সত্যিই হয়তো বেশি দিন এখানে থাকা চলবে না। কিন্তু কালা ইবোরা গেলে তোমার মতো ধলা হিল্লোদেরও পাততাড়ি গুটোতে হবে তা মনে রেখো।
হিপোপটেমাসের দেশে সেই জানোয়ারের সঙ্গেই বপুর পরিধিতে পাল্লা দেওয়া তার চেহারাটার কথা ইঙ্গিত করলে কেনি ভেতরে ভেতরে একেবারে খেপে যায়। বাইরে কিন্তু একেবারে যেন গলে গিয়েছে আমার বন্ধুত্বের পরিচয়ে!
যদি বা ভুলে যেতাম, ঠিক সময়ে মনে করিয়ে দেবার জন্যে ধন্যবাদ, বন্ধু! বলে বেড়াল হয়ে ইঁদুরছানার মতো আমার গলাটা তার থাবায় ধরে ঘরের মেঝেতে দুবার আছড়ে ফেলে কেনি তার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে।
কৃতজ্ঞতা জানানোটা শরীরের ওপর দিয়েই সে শেষ করেছে ভেবেছিলাম। সেইটেই ভুল।
ভুলটা টের পেলাম পরের দিন টাকাকে নিয়ে প্লেন ছাড়বার পরই।
প্লেনটা কেনির টিনের খনির ল্যান্ডিং ফিল্ডেই ছিল। কেনির নিজের একটা ছোট প্লেন আছে। হ্যাঙ্গারও আছে তার। আমারটা সে হ্যাঙ্গারে ধরে না বলেই বাইরে রাখা ছিল।
প্লেন ছাড়বার সময় কোনও গোলমালই হয়নি। ওই ভোরেই কেনি তার একজন মেকানিক নিয়ে আমাদের বিদায় দিতে এসেছিল। তাকে যে-চোখেই দেখি তার এই বিবেচনাটুকুতে খুশি না হয়ে পারিনি। ভেবেছিলাম, ছাড়বার আগে প্লেনের খুঁটিনাটি কিছু তদারকির জন্য নিজে থেকে মেকানিক নিয়ে এসেছে। প্লেনে ওঠবার আগে টাকার তো বটেই, আমারও হাতটা ধরে নেড়ে কেনি প্রায় ধরা গলায় বললে, আর কবে দেখা হবে কে জানে, দাস! দুনিয়ায় কিছুরই ঠিক নেই। সত্যি তোমার অভাবটা টের পাব।
পাওয়াই তো উচিত! আমিও গদগদ স্বরে বললাম, হাউসা, ফুলানি, ইবো আর ইয়োরুবানাইজিরিয়ার এই প্রধান চার জাতের মশলা এক সঙ্গে মেশালে জমবার সিমেন্ট, না ফাটবার বারুদ হবে তা-ই বোঝবার তথ্য জোগাড় করতে অন্য দিক সেরে এখানে টাকার খোঁজেই এসেছিলাম। টাকার বাবা ছিলেন অসামান্য কৃতী পুরুষ। বিলেত থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এসে এদেশের সেই প্রথম ঘুমভাঙার যুগে ইবো হয়ে ফুলানিদের মাঝখানে তাদেরই নিজের করে নিয়ে নানা রকম উন্নতির ব্যবস্থা করে গেছেন। টাকার কাছে তার বাবার অভিজ্ঞতা ও মতামতটা জানবার জন্যই এখানে এসেছিলাম। এসে তোমার সঙ্গে এমন বন্ধুত্ব হয়ে গেল যা ভোলবার নয়। তোমার অভাবটা আমাকেও বেশ কষ্ট দেবে।
আচ্ছা! আচ্ছা! আর দেরি করে লাভ নেই। উঠে পড়ো এবার প্লেনে,কেনি তাড়া দিলে।
তার এই অধৈর্যটা আগেই একটু লক্ষ করেছি বলে আমার বিদায় ভাষণটা ইচ্ছে। করে একটু লম্বা করেছিলাম। তখন কেনির অধৈর্যে একটু অবাক হয়েছিলাম মাত্র। তার অর্থটা বুঝলাম খানিক বাদেই, আয়েষা যখন যন্ত্রণায় হঠাৎ থরথর করে কেঁপে উঠল।
তারপর ঘনাদার এ বিবরণ আমাদের কাশির এপিডেমিকে কোথায় থেমে ডবল শিককাবারের প্লেট শেষ হবার অপেক্ষায় আছে তা আগেই জানানো হয়েছে।
ঘনাদার কাবাব সাঁটাবার ধরন দেখে তাঁর মেজাজ সম্বন্ধে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত একেবারে নিশ্চিন্ত হতে পারিনি।
নিশ্চিন্ত হলাম জোড়া কাবাবের সদগতি করে তাঁর প্লেটের মতো চাঁছাপোঁছা । পরিষ্কার মুখ নিয়ে তিনি যখন শিশিরের দিকে মধ্যমা আর তর্জনী ফাঁক করে হাত বাড়ালেন।
শিশির তার যথাকৰ্তব্য পালন করবার পর দুটি রামটান দিয়ে খুদে গোছের পারমাণবিক বিস্ফোরণেরই যেন ধোঁয়ার কুণ্ডলি ছাড়তে ছাড়তে আমাদের দিকে কৃপা কটাক্ষ করলেন ঘনাদা।
আমাদের মানে শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভুর দিকেই দৃষ্টিটা তাঁর বিশেষভাবে নিবদ্ধ। চোখে একটু ঝিলিক নিয়ে তাকেই জিজ্ঞাসা করেছেন, প্লেনটা তখনও আকাশে, না?
মাসতুতো ভাই শম্ভুর জিভের ডগায় যদি বা কিছু জুতসই জবাব এসে থাকে শিবুর কটমটে চোখের দিকে তাকিয়ে সেটা সে এক ঢোঁকে গিলে ফেলেছে। ভেরেট্রাম অ্যালবামের ধাক্কাই সে তখনও ভাল করে সামলাতে পারেনি।
ঘনাদার স্মরণশক্তি উসকে দেবার ভলান্টিয়ারের অবশ্য অভাব হয়নি।
তিন দিক থেকে তিনজন আমরা এগিয়ে এসেছি: আয়েষা তখন যন্ত্রণায় থরথর করে কাঁপছে, ঘনাদা!
কোথায় কী যেন ফেটেছে!
আপনি তখন ককপিটে বসে প্লেন চালাচ্ছেন।
চালাবার আর তখন কিছু নেই, ঘনাদা যেন সেদিনের কথা স্মরণ করে একটু শিউরে উঠলেন, চোখটা তখন আপনা থেকে চলে গেছে অলটিমিটারে। মাত্র সাতশো ফুট উঠেছি, কিন্তু সাতশো ফুটে কী হবে? সামনের যে পাহাড়টা ঝড়ের মতো ছুটে আসছে সেটা নেহাত ছোট হলেও অন্তত হাজার তিনেক ফুট! সাতশো থেকে হাজার তিনেক পর্যন্ত উঠব কী করে এই জখম প্লেন নিয়ে?
কথাটা ভাবতে ভাৰতেই সামনের যন্ত্রের প্যানেলে একটা লাল বাতি দপ দপ করতে লাগল। সেই সঙ্গে আগুন লাগার হুশিয়ারি ঘণ্টা। ডানদিকের ইঞ্জিনে আগুন ধরে গেছে। প্লেন আকাশে আর তোলা তো দূরের কথা, সোজা রাখাই দায়। যে-কোনও মুহূর্তে পাক খেতে খেতে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে নীচের পাহাড়ে জঙ্গলের ওপর।
