পাঁচজনের কুমন্ত্রণা! ঘনাদার গলায় গভীর আফশোস ফুটে উঠেছে, কালাদের অত ভাল হবার কথায় যাদের বুক জ্বলে, তারা নিজেদের ভেতর খাওয়া-খাইয়ি করলেও কালাদের মধ্যে ভাঙন ধরাবার বেলা একজোট। নাইজিরিয়ার বড় বড় জাত বলতে চারটে হাউসা, ইবো, ইয়োরুবা আর ফুলানি। এই চার জাতকে এক করে ফেডারেল মানে সংযুক্ত নাইজিরিয়া। কিন্তু যুক্ত হওয়া মানে তো গলায় দড়ি বেঁধে দেওয়া নয়। বুদ্ধিতে ক্ষমতায় উৎসাহে উদ্যমে সবচেয়ে যারা আগুয়ান, সেই ইবোরা সংযুক্ত হওয়া মানে গলায় সেই ফাঁস লাগানোই দেখেছে! ইববাদের বিরুদ্ধে সারা নাইজিরিয়ায় নিধন যজ্ঞ শুরু হবার পর লেফটেন্যান্ট কর্নেল চুকুয়েমেকা ওদুমেগুয়ু ওজুকুয়ু তাই নিরুপায় হয়ে দুনিয়ার যেখানে যে আছে সমস্ত ইবোকে বিয়াফ্রা-য় ডেকে পাঠিয়ে মরণপণ লড়ছেন। বিয়াফ্রা র এ নেতার নাম শুনে আজেবাজে হেঁজিপেজি ভাবে না যেন কেউ। ওজুকুয়ু উজবুক-টুজবুকের মাসতুতো ভাই নয়।
শিবু একটু ঢোঁক গিলেছে মাত্র। ঘনাদা কিন্তু কোনও দিকে চাননি। শুধু যেন দম নেবার জন্যই একটু থেমে আবার তিনি শুরু করেছেন, ওজুকুয়ুর কাছে বিলেতের সাহেবরাও ইংরেজি বক্তৃতার দু-একটা কায়দা কানুন শিখতে পারে। প্রথমে ইংল্যান্ডে সারের এপসম স্কুলে, তারপর অক্সফোর্ডের লিংকন কলেজে পড়েছেন। রাগবি খেলেছেন কলেজের হয়ে আর একশো পনেরো ফুট সাড়ে আট ইঞ্চি লোহার চাকতি ছুঁড়ে স্কুলে যে-রেকর্ড রেখেছেন আজও তা কেউ ভাঙতে পারেনি সেখানে।
এই ওজুকুয়ু যখন নাইজিরিয়ার বন্দর-রাজধানী লাগোস-এর স্কুলে পড়ে, তখন অবশ্য ওই সোনার দেশের এই পরিণামের ভয়ই করেছিলাম।
বলেছিলাম সে কথা ফ্র্যাঙ্ক কেনিকে। বলেছিলাম, কাজটা ভাল করছ না, কেনি। এই যে জাতের অভিমান আর ধর্মের গোঁড়ামিকে খুঁচিয়ে হাউসা-ফুলানি আর ইবো-ইয়োরুবাদের মধ্যে ঈর্ষা-হিংসা আকছা-আকছির বিষ ছড়াচ্ছে, তাতে তোমাদেরই শুধু পোয়াবারোর দান পড়বে তা ভেবো না। এ-দেশের জমিজায়গা সব গ্রাস করে টিনের খনি চালিয়ে যে বাদশাহির মজা লুটছ, ওদের মধ্যে রক্তারক্তি বাধলে সেসবও লোপাট হয়ে যাবে!
ফ্র্যাঙ্ক কেনি হেসে আমার পিঠটা তার মুষলের মতো হাত দিয়ে চাপড়ে বলেছে, কী যে বলো, দাস? আমি এদের মধ্যে হিংসের বিষ ছড়াব। তুমি তো দেখেছ, টাকা আমার কী রকম প্রাণের দোস্ত।
হ্যাঁ, তা দেখেছি, স্বীকার করেও আমার সন্দেহটা জানিয়েছি, তোমার মতো খাস ধলা ইংরেজ বেনিয়া সরল প্রাণে কোনও মতলব না নিয়ে কালা কারুর সঙ্গে দোস্তি করছে, এটা বিশ্বাস করতে মন চায় না।
তোমার বড় ছোট মন, দাস! ফ্র্যাঙ্ক আমার ঘাড়ে গদার মতো তার ডান হাতখানা চালিয়ে একটা আদরের রন্দা দিয়ে বলেছে, তুমি বাঙালি তো! আমার এক মাসতুতো ভাই সুবনসিরিতে মিশনারি হয়ে গেছে। সে বলে–
নাইজিরিয়ার টিনের খনির মালিক ফ্র্যাঙ্ক কেনির মিশনারি মাসতুতো ভাই কী বলে তা শোনাতে গিয়ে হঠাৎ থেমে ঘনাদা শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভুর দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, সুবনসিরি কোথায় বুঝেছেন তো?
শিবুর মাসতুতো ভাই একটু কেমন আমতা আমতা করেছে, হ্যাঁ, সুবনসিরি মনে হচ্ছে যেন…
সুবনসিরির নামটাই ভুলে গেলেন? ঘনাদা যেন বড় দুঃখ পেয়েছেন, তা সুবনসিরির কথা মনে না থাকুক, ডাফলা আপাতানিদের তো ভাল করেই চেনেন?
হ্যাঁ…তা..এক রকম। শিশুর মাসতুতো ভাইকে বেশ একটু বিপন্ন মনে হয়েছে।
ওই এক রকম চিনলেই হল।ঘনাদা যেন ম সন্তুষ্ট হয়েছেন শিবুর মাসতুতো ভাইয়ের জবাবে, ওদের এক রকমের বেশি দুরকম চিনতে যাওয়া সুবিধের নয়। তারপর যা বলছিলাম, ফ্র্যাঙ্ক কেনি তার মাসতুতো ভাই যে মিশনারি হত, সুবনসিরিতে আছে তার মতামতটা আমায় শুনিয়ে দিয়েছিল। সেই মিশনারি ভাই নাকি বলে, বাঙালি, অসমিয়া আর ওড়িয়া এদের সঙ্গে আলাপ করবে প্রতিটি কথা সাতপুরু ছাঁকনিতে হেঁকে!
নইলে এরা আঁতের আসল কথা বড় চট করে ধরে ফেলে, না?আমি রদ্দা-খাওয়া ঘাড়টায় হাত বুলোতে বুলোতে যথাসাধ্য হেসে বলছি কেনিকে, কিন্তু তোমাদের ওই সূয্যিঠাকুরের ভাদ্দর বউয়ের দেশ থেকে খ্রিস্ট ভজাতে, কলোনি বসাতে বা ব্যবসা করতে যারা বিদেশে যায়, তারা মুখে-এক মনে-আর রাখে না—এমন দুর্নাম তো অতি বড় শত্রুও দেবে না।
তোমার এই ঠোঁটকাটা রসিকতার জন্য তোমায় এত ভালবাসি, দাস! ফ্রাঙ্ক কেনি বদন বিগড়ে দেবার মতো একটি আদরের থাপ্পড় আমার গালে মেরে তার ভালবাসার পরিচয় দিয়ে বলেছে, তুমি এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছ বলে কী খারাপই লাগছে কী বলব?
খারাপ আমারও লাগছে, আন্তরিক সত্য কথাটা জানিয়েছি কেনিকে, ভালবাসাটা এক তরফাই থেকে গেল, যাচ্ছি এই দুঃখ নিয়ে। কিন্তু কাল আমার না গেলেই নয়।
কেন বলো তো? কেনি যেন সত্যিকার আগ্রহ দেখিয়েছে, কালই যেতে হবে এমন কী তাড়া?
তাড়া আমার নিজের জন্য নয় আমি কেনির জানা খবরটাই যেন নতুন করে জানিয়েছি, তাড়া টাকার জন্য। বেনুয়ে নদীর ধারের সব সোনা ফলানো চাষের জমি থেকে শুরু করে এ-গোটা অঞ্চলটাই পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে ওর পাওয়া তো জানো। এখন নতুন আইনে সেগুলোর মাপ চৌহদ্দি আবার লিখিয়ে রেজেস্টারি করিয়ে না নিলে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। টাকা তো ব্যাপারটা গ্রাহ্যই করেনি। আমিই লাগোস থেকে সেদিন সব জেনে এসে ওকে তাড়া দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
