না, ভাবনা কিছু নেই। শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভই এবার মহড়া নিয়েছে, আর শুধু ডেয়ারি নে, চাষবাসেরও দারুণ সুবিধে। জমি পড়ে আছে অঢেল, শুধু চষলেই হল!
জমি খুব সস্তা তাহলে! ঘনাদার গলায় বেশ ঔৎসুক্যই ফুটে উঠেছে যেন।
সস্তা, মানে জলের দর। শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু সানন্দে জানিয়েছে, জমি যে চষে তার।
আর ফসলও তাহলে তা-ই! ঘনাদা একটু বেয়াড়া বুঝেছেন কিনা ঠিক ধরা যায়নি, যে কেটে নেয় তারই।
ভুল যদি ঘনাদা কিছু বুঝে থাকেন তা সংশোধন করবার আর চেষ্টা করেনি কেউ।
গৌর তার বদলে নিজের উৎসাহটাই প্রকাশ করেছে, এরকম জায়গার কথা শুনলে এখুনি যেন চলে যেতে ইচ্ছে করে। মনে হয় কেন মিছে পড়ে আছি এই নোংরা ঘিঞ্জি খবরের কাগজের ভাষায়—সমস্যাসংকুল শহরে।
হ্যাঁ, ঘনাদা গৌরকে সমর্থন জানিয়েছেন, এই প্রবলেম সিটি থেকে যেতে হলে নেফাই একমাত্র জায়গা। বুনো আধবুনো গাউর আর গয়ালের পাল আছে, পারো তো। দুয়ে নাও, আর জমি আছে অঢেল, চযো। তুমি না পারো, ফসল না হয় আর কেউ কাটবে। আর যদি ওই গাউর গয়ালের পালই খেয়ে যায় তাহলেও লোকসান নেই। ওরা তো তোমাদের ডেয়ারির সব।
ঘনাদার কথাগুলো কি একটু বাঁকা?
অত খুঁত ধরলে চলে না। বাঁকা কথাকে সিধে ভাবলেই তো হয়। যার মাসতুতো ভাই তার হবু ডেয়ারির নমুনা হিসেবে ওই ঘি এনেছে সেই শিবুই এবার হাল ধরেছে আলোচনার।
যেন আশীর্বাদ চাইবার ভঙ্গিতে বলেছে, আপনি তাহলে ভরসা দিচ্ছেন, ঘনাদা? আপনার কাছে একটু সাহস পেলে এ মেস-টেস তুলে দিয়ে চোখ কান বুজে সবাই নেমে পড়ি। নেফার জমি তো খুব ভাল শুনেছি। মাটিতে সোনা ফলে, তাই না ঘনাদা?
সোনা ফলে কি না ফলে তা উনি কী করে বলবেন? হঠাৎ বেসুরো গেয়েছে শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভ। বেশ একটু নাক বেঁকিয়ে বলেছে, উনি কি মাটি চেনেন? ওঁর দৌড় তো এই বনমালি নস্করের গলি আর রাজত্ব ওই চিলেকোঠার ছাদটুকু। মাটির উনি কী জানেন?
আসর-ঘরে বসেই এ আলাপ হচ্ছিল তা বলা বাহুল্য! শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভর এই আচমকা ডিসিশন-এ সমস্ত ঘর একেবারে নিঃসাড় হয়ে গেছে। আমরা অপেক্ষা করছি রুদ্ধনিঃশ্বাসে।
একটু আধটু নড়ে চড়ে গেলেও লাইন যা পেতেছিলাম সমস্ত সাজানো ব্যাপারটা তার ওপর ঠিক মতোই গড়িয়ে যথাস্থানে এসে পৌঁছেছে।
ঘি দিয়ে যা শুরু ঘা দিয়ে তা শেষ। এই হল গৌরের নতুন শক-থেরাপি। এখন এসপার ওসপার একটা কিছু হবেই। ঘনাদার পিছলে পালানো আর চলবে না। কিন্তু শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু মাত্রাটা একটু বাড়িয়ে ফেলেছে কি? সলতে যদি ধরেও থাকে, বেশি হওয়ার ঝাপটায় আবার নিভে না যায়।
শিবু নিজেই তাই একে সামলাবার ব্যবস্থা করেছে। মাসতুতো ভাইয়ের ওপর যেন একটু রেগে বলেছে, তোর তো ল্যাকেসিস দরকার। মাদার টিংচার তিন ফোঁটা! কাক-কাঁকুড় জ্ঞান নেই তোর! ঘনাদা মাটি চেনেন না তো চিনিস তুই?
না, ঠিকই বলেছে তোমাদের শম্ভুবাবু। ঘনাদা উদার এবং কিছুটা উদাস ভাবে নিজের অক্ষমতা স্বীকার করেছেন, মাটি আমি সত্যি চিনি না। নেহাত কুদুটার শিং দুটো মাপতে গিয়ে খুরের ঝুরো মাটি একটু চোখে পড়েছিল আর তার আগে প্লেনটা কাদুনা থেকে উঠতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে কোনও রকমে বেঁচে গিয়েছিল তাই, নইলে টাকা-কে ভুল জমি কিনিয়ে প্রায় তো ডোবাতেই বসেছিলাম।
আপনি আবার জমি কেনাবেচার কাজও করতেন নাকি? জমির দালাল ছিলেন বুঝি? শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু একটু যেন বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে বাহাত্তর নম্বরের হালচাল না বুঝে। আমরা একটু শঙ্কিত হয়েছি।
তা একরকম বলতে পারো, ঘনাদা কিন্তু অম্লানবদনে মেনে নিয়েছেন, জমির দালাল না হোক জাতের কুলুজিকার খানিকটা তো বটেই। আমার কথায় কান দিলে হাউসা, ইয়োরুবা, ফুলানি আর ইবো-তে মিলে এমন লঙ্কাকাণ্ড শুরু হয়, না বিয়াফ্রায় দিনে হাজারটা বাচ্চা না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরে!
বিয়াফ্রা শুনেই আমাদের কান খাড়া হয়ে উঠেছে।
আবার কিন্তু বেয়াদবি করেছে শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু। এ মাসতুতো ভাইটিকে আমদানি করা কতটা সুবুদ্ধির কাজ হয়েছে সন্দেহ জাগতে শুরু করেছে এবার। গোড়ায় একটু সুবিধে হলেও শেষটা তারই উৎপাতে যজ্ঞ নষ্ট না হয়।
হাউসা-ইয়োরুবা শুনেই শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু টিপ্পনি কেটে বাহাদুরির চেষ্টা করেছে, ওই কী সব কিষ্কিন্ধের নাম বললেন, ওদের নিয়ে আপনিই লঙ্কা জ্বালিয়ে এসেছেন বুঝি? তাই ওই দুর্ভিক্ষ লেগেছে।
ভেরেট্রাম অ্যালবাম!
ঘনাদা সহিষ্ণুতার অবতার হয়ে তাঁর দৃষ্টিটা পাতকীর দিকে একটু ফেরাবার আগেই শিবু তার মাসতুতো ভাইকে প্রায় গর্জন করে থামিয়েছে, হ্যাঁ, নির্ঘাৎ ভেরেট্রাম অ্যালবাম—দুশো। সমস্ত লক্ষণ একেবারে হুবহু মিলে যাচ্ছে কখনও সত্য কথা বলে না। নিজে কী বলছে তা নিজে জানে না। নিজেকে একজন কেওকেটা মনে করে। যা এখুনি গিয়ে মোড়ের হোমিওপ্যাথিক দোকান থেকে কিনে খা। ভেরেট্রাম অ্যালবাম বললে না যদি বোঝে তো হেলেবোরাস অ্যালবাম চাইবি।
শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভু হকচকিয়ে তখনকার মতো একটু চুপ।
সেই ফাঁকে প্রায় কৃতাঞ্জলি হয়ে জিজ্ঞাসা করেছি, আফ্রিকার নাইজিরিয়ার কথা বলছেন, না ঘনাদা? বিয়াফ্রার সঙ্গে ফেডারেল নাইজিরিয়ার তো মরণপণ লড়াই চলছে। ইস, আপনার কথায় তখন যদি কান দিত! কেন দিলে না বলুন তো?
