ভয়ে ভয়ে বললাম, ককপিটে তারপর কী করলেন, ঘনাদা?
জবাব নেই ঘনাদার মুখ থেকে!
আয়েষা কি ফেটে গেল আকাশেই?
ঘনাদা একেবারে মৌনী।
তাহলে এত কষ্টের আয়োজন, এত ফন্দি-ফিকির সবই একটু কাশির আহাম্মকিতেই গেল ভেস্তে?
তাঁর মুখের দিকে এখনও ভরসা করে চোখ তুলিনি। কিন্তু আরামকেদারা থেকে নেমে মেঝের ওপর ছড়ানো তাঁর চরণযুগল তোতা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
চরণযুগল তো এখনও যথাস্থানেই আছে। শুধু আছে নয়, রীতিমতো ছন্দে ছন্দে নড়ছে বলা যায়। অর্থাৎ ঘনাদা আরামে তাঁর মৌরসি আসনে গা এলিয়ে দিয়ে পা নাচাচ্ছেন।
এটা খাপ্পা হওয়ার লক্ষণ তো নয়! তাহলে এতক্ষণে ওই পদযুগলকে তো আসর ঘরের দরজা পার হয়ে তেতলায় টঙের ঘরের দিকেই উঠতে দেখা যেত। ওই কাশির এপিডেমিকের পর ঘনাদা আর এক মুহূর্তও থাকলে এই বর্বরদের মাঝখানে?
তাহলে এ অভাবনীয় ব্যাপার সম্ভব হল কী করে?
সাহস করে এবার মুখ তুলে ঘনাদার দিকে তাকালাম। তাকিয়ে তাঁর একাগ্র ও উদগ্রীব দৃষ্টি অনুসরণ করে আসর-ঘরের দরজার দিকে চোখ গেল।
সেখানে বনোয়ারি একটা বিরাট ট্রে নিয়ে ঢুকছে। ট্রে-টা এমন বিরাট যে বনোয়ারিকে দুহাত ছড়িয়ে সেটা বাগিয়ে ধরতে হয়েছে।
ট্রে-র ওপর একটা খঞ্চিপাশের ঢাকনা।
সে-ঢাকার তলায় কী আছে আমরা অবশ্য জানি। কিন্তু বনোয়ারি দরজায় দেখা দেবার আগেই যে-রকম আগ্রহভরে ঘনাদা সেদিকে তাকিয়ে প্রায় বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে গিয়েছিলেন তাতে তিনিও সে খঞ্চিপোশর নীচে ট্রের ওপর সাজানো সব প্লেটে কী আছে যেন তখনই মনে মনে টের পেয়েছিলেন বলে সন্দেহ হয়।
টের পেলেন কীসে? শুধু গন্ধে?
আমাদের মতো সাধারণ নগণ্য মানুষের তুলনায় ঘ্রাণশক্তি তাঁর তাহলে সত্যিই অলৌকিক বলতে হয়। বনোয়ারি দরজা পেরিয়ে আসরের একেবারে মাঝখানে এসে দাঁড়াবার আগে শুধু নাসিকা মারফত আমরা কিছুই জানতে পারিনি। ঘরের মাঝখানে ট্রে-টা ঘনাদার সামনের নিচু টেবিলটায় রেখে বনোয়ারি ওপরের ঢাকনাটা সরাতে গন্ধটা অবশ্য উতলা করে তুলল।
উতলা করে তোলবার মতোই জিনিস। কলকাতার সেরা রেস্তোরাঁর সবচেয়ে বড় ওস্তাদ বাবুর্চির সোনা দিয়ে বাঁধানো হাতের কাজ। মুখে দিলে যেন আর এ-দুনিয়ায় নয়, বেহেস্তেই আছি মনে হবে।
এসব বিজ্ঞাপনের ভাষা অবশ্য গৌরের। ঘনাদাকে বেঁধে ফেলবার জন্য কদিন ধরে সে এসব পাঁয়তাড়া কষছে। আমাদের কাছে সকালে বিকালে সুবিধে পেলেই শনিবারের আসরে যে আজব খানা সে আমদানি করছে তার আগাম হ্যান্ডলি ছেড়েছে বলা যায়।
গদগদ হয়ে বলেছে, এ তো আর শুধু ফুটন্ত জলে চোবানো কি হাতখুন্তি নাড়া নয়, সারেঙ্গির ছড় চালানোর মতো এক একটি শিক ঘোরাবার সূক্ষ্ম কেরামতি।
আজবখানাটা যে কী, রসিকজনের কাছে তা বোধহয় আর ব্যাখ্যা করে বলতে হবে না।
হ্যাঁ, উপাদেয় জিনিসটি হল কলকাতার একেবারে সেরা রসুইখানার শিককাবাব। ঘনাদাকে কিন্তু সে কথা জানানো হয়নি। তা সত্ত্বেও চোখে দেখার আগে শুধু গন্ধেই মোহিত হয়ে তিনি যদি আমাদের অমন একটা বেয়াদবি আশাতীত ভাবে মাপ করে ফেলেন তাহলে সেটা আমাদের নেহাত ভাগ্য বলেই ধরা উচিত।
খটকা অবশ্য মনের ভেতর একটু থেকে যায়। শিককাবাব বা আর কোনও আহামরি খাবারই হোক এসব ঘুষ তাঁর বাঁধা বরাদ্দ। তার জন্য এমন দয়ার অবতার হতে তাঁকে বড় দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না।
কিন্তু খটকাটাকে আমল দেবার দরকারটা কী? ঘনাদা যে বেমালুম সব কিছু ভুলে গিয়ে তাঁর ডবল সাইজের প্লেটে ফালি করা কোল বালিশের মতো দুটি বড় বড়
কাবাবে মনোনিবেশ করেছেন এতেই কৃতার্থ হয়ে খুশি থাকলেই তো হয়।
ঘনাদা যতক্ষণ শিককাবাবে তন্ময় হয়ে আছেন ততক্ষণ এ-বৈঠকের ভূমিকাটা সেরে ফেলা যেতে পারে। ঘনাদাকে এ শনিবারে মুখ খোলাবার জন্য যে সব আয়োজন হয়েছে তার একটা হল এই শিককাবাব।
এর ওপর শিশিরের সিগারেটের টিন তো আছেই—তা ছাড়া আর একটা মোক্ষম ঘুষ বা প্রণামী যা দেওয়া হয়েছে তা একটু অভাবিত নিশ্চয়। তাই দিয়েই শেষ মাত-এর চালের রাস্তা গৌর আগে থাকতে করে রেখেছে।
ঘনাদা নিজেই একটু যেন চমকে গেছেন প্রথমে।
আর যা-ই হোক, তাঁকে এক ভাঁড় ঘি কেউ উপহার দিতে পারে, এটা তিনি কল্পনাই করতে পারেননি বোধ হয়।
এটা কী হে? ঘনাদা একবার ভাঁড়টা আর একবার যে সেটা তাঁর পায়ের কাছে নামিয়ে দিয়েছে তার দিকে সমান সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়েছেন।
দাতা অবশ্য তার অচেনা।
তার পরিচয়টা গৌরই উচ্ছ্বসিত হয়ে এবার দিয়েছে, এ হল শম্ভু, মানে শিবুর মাসতুতো ভাই, ঘনাদা। আপনাকে ওর ডেয়ারির ঘি একটু চাখতে দিতে এসেছে।
চাখবার পক্ষে যথেষ্ট কিনা ঘনাদা সেইভাবে একবার কাগজ দিয়ে মুখ বাঁধা ভাঁড়টার দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, শিবুর মাসতুতো ভাইয়ের ডেয়ারি আছে বুঝি?
না, ডেয়ারি ঠিক নেই, গৌরকে যেন সত্য স্বীকার করতে হয়েছে, তবে যেখানে ও ডেয়ারি করবে ভাবছে সেখানকার ঘির একটু নমুনা এনেছে আমাদের জন্য।
জায়গাটা কোথায়? ঘনাদা মৃদু একটু কৌতূহল দেখিয়েছেন।
বেশিদূর নয়, নেফার কাছে, গৌর খুশি করবার মতো খবরটা দিয়েছে, ডেয়ারি করার দারুণ সুবিধে। গোরুর পাল সেখানে ছাড়াই থাকে। বনে নিজেরা চরে খায়, গোয়ালেরও দরকার হয় না। শুধু ধরে দুয়ে নিলেই হল।
বাঃ! শুধু ধরে দুয়ে নিলেই হল? ঘনাদা রীতিমতো উৎসাহিত হয়ে উঠেছেন মনে হয়েছে, তাহলে ডেয়ারির আর ভাবনাটা কী?
