হেসে বললাম, ওখান থেকে কোনও সাহায্যের আশা নেই, কাউন্ট। একবার চোখে খুনে তিমির ঝাঁক দেখে কেউ ওরা আর সমুদ্রে নামবে না। আর যেভাবে আমি আপনাকে জড়িয়ে আছি তাতে গুলি চালানোও ওদের পক্ষে নিরাপদ নয়। সুতরাং এখনও যদি প্রাণে বাঁচতে চান, জলিবোট নামিয়ে তাতে লোম্যানকে তুলে দিয়ে জাহাজ নিয়ে সোজা অ্যান্টিগুয়া দ্বীপে গিয়ে ওদের অপেক্ষা করতে বলুন।
তা-ই শেষ পর্যন্ত করেছিল কাউন্ট কার্নেরা। পোর্টো পেড্রোর সোনাদানা আর সে শয়তানের হাতে পড়েনি।
হঠাৎ ঘনাদা কেদারা ছেড়ে উঠে পড়ে বাইরের দরজার দিকে পা বাড়ালেন। দরজার কাছে ফিরে দাঁড়িয়ে শিশিরের আনা নতুন অতিথির দিকে চেয়ে শুধু একবার বলে গেলেন, স্লামাৎ তিংগাল।
আমরা তখনও হতভম্ব! শিশিরের ডেকে আনা অতিথি ঘনাদার ছেড়ে যাওয়া আরাম কেদারায় যেন ভেঙে পড়ে বললেন, ছিঃ ছিঃ! আগে আমায় বলতে হয়!
কী বলতে হয়? আমরা একটু অপ্রসন্ন, ঘনাদা সত্যিকার ম্যালে ভাষায় কুল না পেয়ে অমন হুলোর ডাকের ছুতোয় পিছলে পালাবেন, তা কি জানি!
আরে না, না। ভদ্রলোক প্রতিবাদ করলেন জোরের সঙ্গে, জানেন না কী! উনি ম্যালে ভাষার জবাব চিনে ভাষায় দিয়ে আমায় লজ্জা দিয়ে গেলেন যে!
আমরা হাঁ হয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। তাহলে ও শেয়াল কুকুরের ঝগড়া যা শুনিয়েছিল তা ম্যালে আর চিনে ভাষার লড়াই?
আপনার ম্যালের জবাব ঘনাদা দিয়েছেন চীনে ভাষায়? জিজ্ঞেসই করলাম হতভম্ব হয়ে।
তাই তো দিলেন, করুণ মুখে স্বীকার করলেন তিনপুরুষ মালয়ে কাটানো শিশিরের মামাতো ভাইয়ের বন্ধু অভয় দাস।
ভাষার লড়াই অভয় দাস ব্যাখ্যাও করলেন! তারপর বললেন, আমি প্রথম বলেছিলাম, ক্লা মাহা মাল। সি আপানামা ইয়া কামু।তার মানে। গুড ইভনিং। আপনার নাম কী? তারপর ঘনাদা কাবু হয়েছেন মনে করে আবার বলেছিলাম– জাং-আন তা কুট সায়া বুকাহমু সূহ! ওর মানে হল, ভয় পাবেন না। আমি শত্রু নই। ভেবেছিলাম আপনাদের ঘনাদা বুঝি ওতেই একেবারে কাত। কাত তো নয়ই, আমার হাত-বোমার জবাবে এমন একটি আই-সি-বি-এম ছাড়লেন যে, আমিই আর হালে পানি পাই না। তিনি প্রথমে বললেন, নী-ঈ শের শে।ম্যালে নয়, ভাষাটা চোস্ত চিনে, আর তার মানে হল, তুমি কে? চিনে ভাষা আমি সামান্যই জানি। তাঁর প্রথম প্রশ্নের ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতে ঘনাদা আবার বললেন, দ্য-অং ঈ! দ্য-অং। ওয়-আ ঈ, আঃ উ ইয়াং হোত-আ।ওর বাংলা মানে, দাঁড়াও! দাঁড়াও! আগে আমার একটা দেশলাই দরকার।
ঘনাদা যখন শিশিরের হাত থেকে দেশলাই নিয়ে সিগারেট ধরাচ্ছেন তখন লেজ গুটিয়ে আমি পালাতে পারলে বাঁচি। তবু আপনাদের উসকানিতে নিরুপায় হয়ে ঘনাদার কাছে হার স্বীকার করলাম। বললাম, সায়া টিডা মং আর টি! মীন টা বিচারা প্লান্ প্লান্। অর্থাৎ, আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না। দয়া করে একটু আস্তে আস্তে বলুন। ঘনাদা তখন বললেন, চিং নী ইয়ুং দিয়ান তু ইয়াউ তু হোয়ে ঈ দা। ওয়া হোয়ে শোওয়া ইং গোয় হোয়া! ফা গোয়া হোয়া মিয়ান দিয়ান হোয়া রের ব্যন হোয়া… ওর মানে হল, বেশ! মাথা হেলিয়ে কিংবা নেড়ে হাঁ কি না জবাব দাও। আমি এসব ভাষা বলতে পারি ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, বমি, জাপানি…ঘনাদার তালিকা ওই জাপানি পর্যন্ত পৌঁছবার পর ঠিক মোক্ষম সময়ে ওই হুলোর ডাকই আমায় বাঁচিয়েছে!
অভয় দাস থামলেন। আমাদের সকলের চোখ তখন ছানাবড়া। অভয় দাস যা বললেন ম্যালে চিনে তরজার তা-ই কি সঠিক ব্যাখ্যা? না ওই আরামকেদারার গুণেই ঘনাদার ওপরেও টেক্কা দেওয়া হল?
ম্যালে আর চিনে কারুর জানা থাকলে বিচার করুন।
আমরা হাঁ করে এবার ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। বলেন কী ইনি! ঘনাদার উপযুক্ত জুড়িদার জুটল নাকি এতদিনে!
ভদ্রলোক আমাদের দৃষ্টি গ্রাহ্য না করে ক্লান্তভাবে বললেন, একটা সিগারেট খাওয়াতে পারেন?
না। শিশিরের স্পষ্ট জবাব শোনা গেল। টিন এখন তেতলায়।
মাটি
আয়েষা হঠাৎ যন্ত্রণায় থরথর করে কেঁপে উঠল।
কে যেন প্রচণ্ড এক বোমা ছুঁড়ে মেরেছে তার গায়ে। বোমা অবশ্য কেউ মারেনি। নিজে থেকেই কোথাও কিছু ফেটেছে। তারই চাপা আওয়াজটা আমরা ককপিটে বসেই পেলাম।
হ্যাঁ, আয়েষা কোনও মেয়ে-টেয়ে নয়, একটা মাঝারি মাপের জোড়া ইঞ্জিনের ব্রিস্টল পার্সিউস।
জায়গাটা হল উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার আকাশ আর প্লেন চালাচ্ছি আমি!…
ব্যস, ওই পর্যন্তই। তারপর খক্ খক্ খুক খুক কী যে কাশির হিড়িক পড়ল, বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনে যেন কাশ রোগের এপিডেমিক লেগেছে। শিবুর মাসতুতো ভাই শম্ভুর গলার খুকখুকুনিটাই কাশি বলে চালানো একটু শক্ত!
কী হচ্ছে কী সব? শিবু কড়া গলায় ধমক দিয়ে তার নতুন ঘাঁটা হোমিওপ্যাথিক বিদ্যে জাহির করলে, অত যদি কাশি হয়েছে তো এক ফোঁটা ইপিকাক থার্টি খেতে পারো না? তা না হয়, সকাল বিকেলে দুবার গার্গল…
গার্গল কথাটাই গলা দিয়ে বার হবার সময় অমন সুড়সুড়ি লাগবে শিবুও বোধহয় ভাবতে পারেনি। নিজেই সে কেশে খুন তারপর।
রীতিমতো রাগ দেখাতে হল এবার। বললাম, কী সব তোদের আক্কেল। কাশবার আর সময় পেলি না! ওদিকে আফ্রিকার ওপর ঘনাদা জখম প্লেনে আটকা পড়েছেন—সে খেয়াল আছে?
সেই খেয়ালটা হতেই যেন ধন্বন্তরীর ওষুধ পড়ে সব কাশি থেমে গেল।
ঘনাদার অবস্থাটা কিন্তু এখন কী।
চেয়ে দেখতে ভরসা হয় না। মনে হয় বিস্ফোরণটা বুঝি তাঁর দুচোখেই দেখতে পাব।
