দ্বীপটা ব্রিটেনের অধীন। পঁচিশ মাইল দক্ষিণে আন্টিগুয়া দ্বীপটি থেকেই পরিচালিত হয়। নেহাত খুদে একটি ডাঙা। সর্বসাকুল্যে বাষট্টি বর্গমাইল। হাজার দুয়েক মাত্র মানুষের বাস। তারা বেশির ভাগ তুলোর চাষ আর ঘোড়া গোরু গাধা মিউল পালন করে। তাতেও দ্বীপটার কেমন নির্জন পোবন গোছের চেহারা একটু হয়েছে। পশ্চিমে প্রবালের বেড়ায় ঘেরা সুন্দর একটি নীল লেগুন। সে লেগুন-এ জেলেরা মাছ ধরে। আর তার তীরের উপবনে এখনও বুনো হরিণ একটা-আধটা দেখা যায়।
কিন্তু যা ভয় করেছিলাম তা-ই ঠিক। কেটায় কিছু গোলমাল আছে। কোথায় সে দ্বীপে লোম্যান?
এ দ্বীপটি প্রায় দুশো বছর ধরে কডরিংটন নামে এক পরিবারের দখলে ছিল। এখন অবশ্য এটা ব্রিটেনের খাস সরকারি সম্পত্তি। কডরিংটন পরিবারের এক বংশধর সেখানে নুন আর ফসফেট অফ লাইমের চালানি কারবার করেন। আগেকার পরিচয়ে তাঁরই অতিথি হয়েছিলাম।
তিনি তো লোম্যানের কেন্দ্র-এর কথা শুনে অবাক। বললেন, লোম্যান এখানে এলে আমি জানতে পারতাম না? আমাকে লুকিয়ে সে এখানে থাকবে কোথায়? আর কেন?
কেন, আর কোথায়, সেই রাত্রেই জানতে পারলাম। অতিথি হিসেবে বারবাড়ির একটি একানে বড় ঘর আমার থাকার জন্য বরাদ্দ ছিল। মাঝরাত্রে সবে একটু তন্দ্রা এসেছে এমন সময় দরজায় মৃদু একটা টোকার শব্দ শুনলাম! যেন খুব সন্তর্পণে কে আমায় ডাকছে। এ-দ্বীপে এমন গোপনে আমার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা কে করতে পারে ভেবে অবাক হয়ে পিস্তলটা বালিশের তলা থেকে বার করতে গিয়েও আর করলাম না। সেই ভুলেই অসন্দিগ্ধ ভাবে দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই পেটের ওপর একটা পিস্তলের খোঁচা টের পেলাম। সেই সঙ্গে চাপা গলায় হুকুম, গোলমাল না করে যেমন আছ চলে এসো।
তা-ই গেলাম। হেঁটে লেগুন পর্যন্ত, তারপর ছোট একটি মোটর বোটে লেগুনের প্রবল দেয়ালের ফাঁক দিয়ে পেরিয়ে ভোলা সমুদ্রের একটি মাঝারি মাপের স্টিমারে। স্টিমারটি যে সমুদ্রের তলায় ড়ুবুরি নামাবার জন্যই তৈরি তা চাঁদনি আলোর রাত্রে তার গড়ন দেখেই বুঝলাম।
স্টিমারের সবাই আমাকে প্রায় সমাদর করেই খাসকামরায় নিয়ে গিয়ে বসালো। তারপর যিনি হাসিমুখে এসে ঢুকলেন তিনি আমার অচেনা নন।
আপনি! কাউন্ট কার্নেরা।আমি যেন আকাশ থেকে পড়ে বললাম, আপনি ডাকছেন জানলে আমি তো নিজে থেকে ছুটে আসতাম। আমায় এমন করে পিস্তল উঁচিয়ে ধরে আনবার দরকার ছিল কি?
তাই এনেছে বুঝি?কাউন্ট যেমন অবাক তেমনই মর্মাহত।
আমার সামনেই তারপর বেয়াদপ অনুচরদের এই মারেন তো সেই মারেন।
তাদের গালাগাল দিয়ে বিদেয় করে নিরিবিলি কামরায় গলা নামিয়ে বললেন, এ রহস্যের মানেটা কী বলুন তো, দাস! লোম্যানের এরকম কেবলের মানে কী?
আপনাকেও কেবল করেছে বুঝি? ন্যাকা সেজে জিজ্ঞাসা করলাম, কী বলেছে তাতে?
বলেছে, এই বার্বদা দ্বীপে আসতে! কাউন্ট কার্নেরা যেন বিমূঢ়ের মতো জানালেন, শুধু তাই নয়, যে ডোবা জাহাজের খোঁজ পেয়েছে, কোথায় তা আছে তার হদিস দেওয়া মানচিত্রও পাঠিয়ে দিয়েছে।
তাই নাকি!আমি একেবারে আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠলাম, তা হলে আর দেরি কীসের? ড়ুবুরি জাহাজ তো নিয়েই এসেছেন, কাজ শুরু করে দিন।
হ্যাঁ, তা তো দেওয়াই যায়। তবে মুশকিল হয়েছে এই যে ম্যাপটাও সাংকেতিক ভাবে অকা। গুপ্ত হদিস না জানলে ও-ম্যাপ দেখে ডোবা জাহাজের অবস্থান সঠিক জানা যাবে না। বাবুদার চারিদিকের সমস্ত সমুদ্রের তলা তো আর খুঁজে বেড়াতে পারি না।
তা পারেন না বটে! আমি যেন কাউন্ট কার্নেরার মনের কথাটা এতক্ষণে বুঝে বললাম, তাই আমাকে ডেকে আনানো! কেমন? লোম্যানের গোপন কোড আর যদি কেউ জানে তো আমারই জানা সম্ভব! তা ঠিকই তো করেছেন! নিয়ে আসুন লোমানের ম্যাপ। ওর গুপ্ত সংকেত বার করে দিচ্ছি এখুনি।
কাউন্ট কার্নেরাকে এবার সত্যই একটু হতভম্ব হতে হল। আমার মুখে এ ধরনের কথা তিনি আশাই করতে পারেননি। একটু সন্দিগ্ধ ভাবে আমাকে লক্ষ করে বললেন, আমার ভয় হচ্ছিল, লোম্যান নিজে উপস্থিত না থাকলে হয়তো আপনি এ সাংকেতিক ম্যাপের অর্থ বলতে চাইবেন না।
কেন চাইব না! আমি যেন অবাক হলাম, লোম্যান থাকলে সে-ই তো ম্যাপের মানে বলে দিত। আমাকে দরকারই হত না। কিন্তু লোম্যান-ই বা গেল কোথায় বলুন তো! আপনাকে আমাকে এরকম কে করার পর নিজে গা-ঢাকা দিয়ে আছে কেন?
তাই তো বুঝতে পারছি না!কাউন্ট কার্নেরা যেন ভাবনায়-ঘুম-হচ্ছে-না এমন মুখ করবার চেষ্টা করে বললেন, তাঁর তো আমাদের আগেই এখানে পৌছোবার কথা।
আচ্ছা! যেন হঠাৎ একটা দুর্ভাবনা আমার মাথায় এল, লোম্যান কোনও দুশমনের হাতে পড়েনি তো?
কী রকম? প্রায় চমকে উঠলেও কাউন্ট সেটা গোপন করে যেন না বোঝার ভান করলেন।
এই ধরুন,আমিও ধৈর্য ধরে বোঝানো শুরু করলাম, লোম্যান যে সারা জীবনের চেষ্টার পর এবার পোর্টো পেড্রোর সত্যিই সন্ধান পেয়েছে, এ খবর যদি…
আমাকে কিন্তু কথা শেষ করতে দিলেন না কাউন্ট কার্নেরা। কথার মাঝখানেই বাধা দিয়ে বললেন, পোর্টো পেড্রো? লোম্যানের এ ম্যাপে যে জাহাজের হদিস আছে। তা পোর্টো পেড্রো বলে আপনার অনুমান?
চেষ্টা করা সত্ত্বেও কাউন্ট তাঁর উত্তেজনাটা তখন আর লুকোতে পারছেন না।
আমি একটু যেন উদাসীন ভাবে বললাম, অনুমান কেন হবে। আমি জানি পোর্টো পেড্রোর সন্ধানই ও পেয়েছে এতদিনে। ১৬৬৮ সালে তখনকার দিনের হিসেবেও দু কোটি টাকার সোনায় বোঝাই হয়ে জাহাজটি মধ্য আমেরিকা থেকে স্পেনে যাবার পথে ড়ুবে যায়। কোনও জলদস্যুর হাতে যে সে জাহাজ পড়েনি সেটা ঠিক। পড়লে তারা বড়াই করেই তা জানিয়ে যেত। জাহাজটা ড়ুবেই গেছে কোথাও। ইংরেজ ফরাসি ও সাধারণ বোম্বেটেদের এড়াবার জন্যই স্পেনের এইসব জাহাজ তখন সিধে পথ ছেড়ে আঁকাবাঁকা পথে স্পেনে পাড়ি দিত। বোম্বেটেদের হাতে না পড়লেও পোর্টো পেড্রো কোথায় যে ড়ুবে যায়, এতকাল ধরে দেশবিদেশের বহু লোক বৃথাই সন্ধান করে ফিরেছে। সন্ধানটা দক্ষিণ বাহামার দ্বীপগুলিরই ভেতর বেশির ভাগ চালানো হয়েছে, কারণ নব আবিষ্কৃত মধ্য আমেরিকা থেকে লুট করা সোনাদানা নিয়ে স্পেনের জাহাজ এই সব পথেই লুকিয়ে দেশে ফেরবার চেষ্টা করত। মাত্র কয়েক বছর হল আমার পরামর্শে দক্ষিণ বাহামা ছেড়ে ঘোট অ্যান্টিলিজের লিওয়ার্ড দ্বীপগুলিতে লোম্যান সন্ধান চালাতে শুরু করে। সে যে পোটো পেড্রোরই সন্ধান পেয়েছে এ বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই। আর তার সে আবিষ্কারের খবর ঘুণাক্ষরে কোনওরকমে জেনে, জুলুম জবরদস্তিতেও তার হদিস আদায় করতে, কোনও দুশমনই সম্ভবত তাঁকে ধরে রেখেছে।
