হ্যাঁ, ভাষাই ভেবেছিলাম! ঘনাদা আমার মুখের কথার ওপর যেন থাবড়া দিয়ে বললেন, আর ও-ভাষা ব্যবহার করার মতো কে এই শহরে আসতে পারে ভেবেই অবাক হচ্ছিলাম। তারপর অবশ্য নিজের ভুলটা বুঝলাম। ওটা সে-ভাষা নয়, শুধু হুলোরই ডাক!
তখনও সাবধান হয়ে ঘনাদাকে আবার চেপে ধরার সময় ছিল। কিন্তু তা আর পারলাম কই!
হঠাৎ বেঁফাস কথা শিশিরের মুখ দিয়ে বাঁকা সুরে বেরিয়ে গেল, ওরকম ভাষাও তা হলে আছে! কাদের?
আর ঘনাদাকে পায় কে! লোহার শিকল দিয়েও তখন আর তাঁকে ধরে রাখবার নয়।
শিশিরের ওই শেষ প্রশ্নের জবাবে গম্ভীর মুখে তিনি বললন, অর্সিন্যস অর্কা-র!
আর অর্সিন্যস অকা শুনে আমাদের হাঁ মুখ বোজবার আগেই ঘনাদা শুরু করে দিলেন,সে দিন ওই ভাষা শুধু আমাকেই প্রাণে বাঁচায়নি,দুনিয়ার সবচেয়ে উঁচা খুনে এক ঠগবাজের হাত থেকে নিশো বছর আগেকার এক ডোবা জাহাজের অমূল্য সব সম্পদ রক্ষা করেছে।
সে খুনে ঠগবাজের নাম হল কাউন্ট কার্নেরা। তার আসল পরিচয় কিন্তু তখন খুব কম লোকই জানত। ইউরোপের নানা মিউজিয়মে কাউন্ট কার্নেরা নামে একজন বদান্য শিল্প-প্রেমিকের নাম কিছু কিছু মূল্যবান শিল্প নিদর্শনের সঙ্গে জড়িত দেখা যায়। কোথাও দামি একটি আধুনিক ভাস্কর্য, কোথাও অতি প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য ধাতুর পাত্র, কোথাও গ্রিক ভাষার প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, কোথাও বা ভারতীয় বিরল প্রাচীন বিগ্রহ দান করে নানা মিউজিয়মকে তিনি কৃতজ্ঞ করে রেখেছেন।
তখন কিছুদিনের জন্য আমেরিকার একেবারে পশ্চিম উপকূলে ব্রেমারটন শহরে গ্ৰেহাম বলে এক স্যামন মাছধরা সামুদ্রিক জেলেদের সর্দারের অতিথি হয়ে আছি। হঠাৎ সেইখানেই এক দিন একটি কেবল পৌছোল। সাংকেতিক লিপিতে পাঠানো অবশ্য। তারটা অনুবাদ করে যা জানলাম তা অপ্রত্যাশিত। তারটি এই—স্পেনের তিনশো বছর আগেকার ড়ুবো জাহাজের ঐশ্বর্য উদ্ধার করবার উৎসাহ যদি থাকে তা হলে এখুনি বাবুদা চলে এসো।–লোম্যান।
এ-কে পেয়ে সত্যি একটু অবাক হলাম।
সাংকেতিক লিপিতেই তার পাঠানো হয়েছে সত্যি, কিন্তু এরকম একটা খবর কোনও গোপন কোডে পাঠানোও তো নিরাপদ একেবারে নয়। এ ধরনের গুপ্ত খবর জানবার জন্য একটা আন্তর্জাতিক গুণ্ডার দল তো যে-কোনও শয়তানি করতে প্রস্তুত।
লোম্যান একদিকে ছিটগ্রস্ত হলেও এ রকম আহাম্মক নয় বলেই জানি! একেবারে জায়গার নাম জানিয়ে কেবল করা তার পক্ষে অস্বাভাবিক।
তবে জীবনের শ্রেষ্ঠ বছরগুলো ড়ুবো জাহাজের ঐশ্বর্য উদ্ধারের নেশায় এক রকম বৃথাই নষ্ট করে হয়তো তার মাথার সামান্য ছিট এখন সত্যিকার গোলমাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, কাণ্ডজ্ঞান হয়ে গেছে ঝাপসা।
তা না হলে এরকম একটা দাঁওয়ের হদিস সত্যিই পেলে লোম্যানের তো সশরীরে আমার কাছে ছুটে আসার কথা। বিশ্বাস করে এরকম খবর চিঠিতে বা তারে বেতারে সে কিছুতেই জানাবে না।
লোম্যানের এই সাংঘাতিক নেশার সঙ্গে তাল দিতে অনেক বার অনেক জায়গাতেই বুনো হাঁসের পেছনে ছোটায় তার সঙ্গী হয়েছি। বেশির ভাগই ভুয়ো খবর পেয়ে তোড়জোড় আর হয়রানিই সার হয়েছে! ডোবা জাহাজের সন্ধান মিলেছে ঠিকই, কিন্তু ক-টা পচা তক্তা আর মরচে ধরা নাট বল্ট বা শিকলি ছাড়া তা থেকে উদ্ধার করবার কিছু পাইনি।
লোম্যান আমাদের তুলনায় মুখে রুপোর চামচে নিয়েই জন্মেছিল। তার বাবা। টেকসাসের তেলের খনির যে সম্পত্তি তার জন্য রেখে দিয়ে গেছলেন, এমন আজগুবি নেশা না ধরলে, তা দিয়ে ইউরোপ আমেরিকাতে হেসে খেলে পায়ের ওপর পা দিয়ে সে কাটিয়ে দিতে পারত। কিন্তু এই ভোবা জাহাজের ঐশ্বর্য উদ্ধারের নেশায় লোম্যান তার প্রায় সব কিছুই ধীরে ধীরে খুইয়েছে। বড় আর ছোট অ্যান্টিলিজ-এর দ্বীপগুলির মাঝে ক্যারিবিয়ান সমুদ্রে ভোবা জাহাজ থেকে ওঠার বদলে তার সমস্ত পয়সাকড়ি ড়ুবেছে বলা যায়।
ওই ক্যারিবিয়ানই আমেরিকা প্রথমে আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে অন্তত তিনশো বছর ধরে দুর্দান্ত সব বোম্বেটেদের লীলাভূমি ছিল। ইংরেজ পর্তুগিজ স্প্যানিশ ফ্রেঞ্চ ডাচ ইটালিয়ান পশ্চিম দুনিয়ার যত দুশমন সব দল বেঁধে তখন তাদের বোম্বেটে জাহাজ নিয়ে ওই অঞ্চল লুটে বেড়িয়েছে। তাদের সে লুটের জাহাজও কখনও কখনও বেকায়দায় পড়ে ড়ুবে গেছে রাজার ঐশ্বর্য বুকে নিয়ে।
সেসব ডোবা জাহাজের একটার সন্ধান পেয়ে তার ঐশ্বর্যের ভান্ডারের নাগাল পেলে মার্কিন ধনকুবেরদের ওপরও টেক্কা দেওয়া যায়।
অনেকের ওরকম ভাগ্য সত্যিই হয়েছে। কিন্তু লোম্যান অভাগাদের একজন। সম্পদের চেয়ে এরকম একটা অজানা ড়ুবো জাহাজ খুঁজে বার করার বাহাদুরি তার কাছে বড় বলেই ভাগ্য যেন তাকে নিয়ে নির্মম ঠাট্টাই করে এসেছে এ পর্যন্ত।
লোম্যানের এ নেশা ছাড়াবার চেষ্টা করেছিলাম প্রথম প্রথম তারপর এই নেশাই তার জীবন জেনে নিরস্ত হয়েছি।
বহুদিন তার অবশ্য কোনও খোঁজ খবর পাইনি।
হঠাৎ এ কে পেয়ে একটু ধোঁকা লাগলেও বাবুদা দ্বীপে রওনা না হয়ে পারলাম না।
তার আগে একদিন শুধু গেছলাম ভ্যানকুভারের সরকারি অ্যাকোয়ারিয়মের কিউরেটরের সঙ্গে দেখা করে একটা জিনিস ধার নিতে।
কোথায় ব্রেমারটন আর কোথায় বাবুদা দ্বীপ! স্টেটসের উত্তর-পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরের কুল থেকে একেবারে মহাদেশ পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্বের অ্যাটলান্টিক সমুদ্রে ছোট অ্যান্টিলিজ দ্বীপপুঞ্জের একটি বালির দানার মতো দ্বীপ।
