কাউন্ট কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন। তাঁকে বাধা দিয়ে আবার বললাম, আপনি কথাটা বিশ্বাসই করতে পারছেন না জানি, কাউন্ট। কিন্তু সবাইকে নিজের মতো ভাববেন না। আপনার মতো মহৎ উদার ক-জন আছে যে, কোনও স্বার্থ ছাড়াই, শুধু ললাম্যানের একটা কে পেয়ে তাকে সাহায্য করবার জন্য নিজের বিশেষভাবে তৈরি ড়ুবুরি জাহাজটা নিয়েই ছুটে আসবেন। এইরকম ডোবা জাহাজের সন্ধানী ভাল লোক যেমন আছে তেমনই শয়তানও আছে অনেক। তাদেরই কেউ বন্ধু সেজে সাহায্য করার ছলে লোম্যানকে বন্দী করে রেখেছে বলে আমার বিশ্বাস।
আমার লম্বা বক্তৃতায় কাউন্ট যে ক্রমশই অস্থির হয়ে উঠছেন তা বুঝেই ইচ্ছে করে। বক্তৃতাটা বাড়িয়ে গেছি। এবার একটু থামতেই কাউন্ট অধৈর্যের স্বরে বলে উঠলেন, আপনার আমার অনুমান যদি ঠিক হয় তা হলে তো আর দেরি করা চলে না। জাহাজটার খোঁজ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করতে হয়। লোম্যানের জন্য অপেক্ষা না করে? আমি যেন মৃদু একটু আপত্তি তুললাম।
তার জন্য অপেক্ষা করতে গেলে তো সব কিছু খোয়াতে হতে পারে! কাউন্ট আমায় বোঝাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, যে-দুশমনের কথা ভাবছেন, সে তো জুলুম করে হদিস আদায় করে ইতিমধ্যে নিজের নামেই খোদ ব্রিটিশ সরকারের কাছে এ অঞ্চলে ডোবা সম্পদ খোঁজার লাইসেন্স আনিয়ে নিতে পারে। তখন লোম্যান তো পুরোপুরি ফাঁকি পড়বে।
ঠিক বলেছেন, আমি যেন তাঁর কথায় একেবারে জল বুঝে বললাম, আমাদের নিজেদেরও লাইসেন্স যখন নেই, তখন, এই বেলা সময় থাকতে ডোবা জাহাজ থেকে যা পারি সরিয়ে নিই। কী বলেন?
চোখে একটু সন্দেহের ছায়া থাকলেও কাউন্ট আমার কথায় যেন হাতে চাঁদ পেয়ে পাশে রাখা একটা ফোলিও জিপ টেনে খুলে ফেললেন।
তার ভেতর থেকেই লোম্যানের গোপন ম্যাপটা বার হল।
ম্যাপটা হাতে নিয়ে একটু চোখ বুলিয়ে বললাম, আপনার কোনও ভাবনা নেই। আধ ঘণ্টার মধ্যেই এ-ম্যাপের রহস্য ভেদ করে দিচ্ছি।
তা-ই করলাম। তারপর সেইদিন বিকালেই কাউন্ট কার্নেরার বিশেষ স্টিমার বাবুদার উত্তর-পশ্চিমে সমুদ্রের এক জায়গায় আমার নির্দেশে গিয়ে থামল।
কাউন্ট তো তখুনি ড়ুবুরি নামিয়ে ডোবা পোর্টো পেড্রোর সোনার তাল লুটতে উদগ্রীব। তাঁর উৎসাহে একটু বাধা দিয়ে বোঝালাম যে ম্যাপের হদিস মতে পোর্টো পেড্রোর ডোবা কঙ্কাল সত্যিই ওখানে আছে কি না আগে একবার নিজেদের দেখে আসা দরকার। তা না হলে সত্যিই ম্যাপের গুপ্ত সংকেত ধরতে পেরেছি কি না বুঝব কী করে! নিজেই তারপর চোখে ঠুলি-চশমা, মুখে অ্যাকোয়া লাংস মানে জলের নকল ফুসফুস আর হাতে পায়ে ফ্লিপার লাগিয়ে সমুদ্রে নামলাম শুধু একটা ছোট এয়ার-টাইট ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে।
ব্যাগটা কী জন্য? জিজ্ঞেস করেছিলেন কাউন্ট।
হেসে বলেছিলাম, সোনার নমুনা আনতে। সেনমুনা পরীক্ষা করে আপনাকে ফেরত দেব, ভাবনা নেই।
কাউন্ট আর আপত্তি করেননি।
সমুদ্রের জলে নেমে ড়ুবসাঁতারে পোর্টো পেড্রোর পচা, গলা সামুদ্রিক আগাছায় ঢাকা তিনশো বছরের পুরোনো কাঠামোটা খুঁজে বার করতে দেরি হয়নি। দেরি হয়েছে আর দুটো কাজে। তার মধ্যে একটা হল জলের নীচেই ড়ুবুরি জাহাজের পেছন দিকে গিয়ে তলায় কয়েকটি টোকা দেওয়া। সে টোকা দেওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ কোনও সাড়া না পেয়ে সত্যিই একটু ভয় পেয়েছিলাম। আমার অনুমান কি তাহলে সবই ভুল?
কিন্তু ভুল যে নয় তার প্রমাণ পেয়েছিলাম ভেতর থেকে টোকার জবাব আসায়।
সাধারণ জাহাজ হলে নাগাল পেতাম না। কিন্তু ড়ুবুরি নামাবার কাজের জন্য বিশেষভাবে তৈরি বলে এ-জাহাজের পেছন দিকে একটা পাল্লা দেওয়া জানালা গোছের আছে! সেইখান দিয়েই ড়ুবুরিরা নামে ওঠে—আর সমুদ্রের তলায় খুঁজে যা পায় সেইসব জিনিস তোলে।
সেই কাটা জানালার পাল্লা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে খুব বেগ পেতে হল না। ড়ুবুরির সাজ নিয়ে তারপর প্রায় ডাঙায় ওঠা মাছের মতোই শুয়ে শুয়ে কেতরে কেতরে একটা বিশেষ কেবিনে গিয়ে পৌছলাম।
কাউন্ট কার্নেরার এ-জাহাজে মাঝিমাল্লা আর ড়ুবুরির সংখ্যা খুব বেশি নয়। পাহারা দেবার কোনও দরকার নেই জেনে সবাই তখন ওপরের ডেকে আমার ভোবা জাহাজের খবর নিয়ে ফিরে ভেসে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছে।
জাহাজের ধারে শেষ পর্যন্ত আবার ভেসে উঠলাম ঠিকই, কিন্তু ধৈর্য হারিয়ে কাউন্ট কার্নেরা আমার খোঁজে অন্য ড়ুবুরি নামাবার ব্যবস্থা প্রায় যখন করতে যাচ্ছেন তার আগে নয়।
আমায় ভেসে উঠতে দেখেই জাহাজ থেকে কাছি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেকাছি ধরে ওঠবার শক্তিটুকু যেন নেই এমনিভাবেই কোনওমতে জাহাজের ডেক পর্যন্ত উঠে চিৎপাত হয়ে পড়লাম।
মুখ দিয়ে তখন আর কথা বার হচ্ছে না। কাউন্ট কার্নেরার কাছে তখন আমি সোনার তালের মতোই দামি। তাঁর হুকুমে লোকজন আমায় ধরাধরি করে কাউন্টের খাস কামরাতেই নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলে। গরম গরম খাবার-দাবার এল আমায় চাঙ্গা করতে।
চাঙ্গা হলাম ঠিক সময় বুঝে প্রায় শেষ রাত্রে। ভোর হতে আর তখন ঘণ্টা দুয়েক বাকি।
কাউন্ট আমার মুখের ওপর ঝুঁকে আছেন।
তাঁকে আশ্বস্ত করে জানালাম, পোর্টো পেড্রোর সন্ধান ঠিকই পাওয়া গেছে। আমার ফিরতে দেরি হওয়ার যে-অজুহাত দিলাম, চোখ একটু কপালে উঠলেও, কাউন্টকে তা হজম করতে হল। বললাম তিনশো বছরের পুরোনো জাহাজের ভাঙা কঙ্কাল শুধু যত অক্টোপাসের বাসা। তারা যেন যখের ধনের মতো ডোবা জাহাজের সোনা আগলে আছে। সেই একটা অক্টোপাসের নাগপাশ ছাড়িয়ে আসতে গিয়েই এই দশা হয়েছে।
