শিশির যেন একটু ধোঁকায় পড়ে জিজ্ঞাসা করছে, বদলাবার দরকার নেই নাকি? আপনি তা হলে দেখুন না একটু চোখে!
সেই লোভে লোভেই আড্ডা-ঘরে তুলে এনে তাঁর মৌরসি কেদারাটিতে ঘনাদাকে বসিয়ে শিশির নিজের কামরায় গেছে সিগারেটের টিন আনতে।
সিগারেটের টিন সে এনেছে ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে ঘনাদাকে কুপোকাত করবার সেই জ্যান্ত বোমাটি।
সিগারেটের টিনটা খুলে শিশির বিনীতভাবে ঘনাদার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ঘনাদা তা থেকে সিগারেট তুলতে গিয়েও থমকে থেমে গেছেন। তাঁর দৃষ্টি শিশিরের সঙ্গে যে-মূর্তিটা বিনা নোটিশে এ ঘরে এসে হাজির, তার দিকে।
শুধু ঘনাদারই নয়, আমাদেরও যেন চমকে লোকটির দিকে তাকিয়ে তাজ্জব হতে হয়েছে।
প্যান্ট শার্ট পরা ছোটখাটো রোগা-পটকা একটি মানুষ। কিন্তু চেহারা দেখে নয়, তার মুখের বুলিতেই আমরা যেন হতভম্ব।
শিশিরের পিছু পিছু ঘরে ঢুকেই ঘনাদাকে দেখে যা বলেছে তাতে দিশাহারা হবারই কথা। বলেছে, স্লা মাহাটু মালম সি আপানামা ইয়া কামু?
হ্যাঁ, এই লোকটির কথাই আপনাকে বলব ভেবেছিলাম, শিশির যেন নেহাত তুচ্ছ একটা খবর দিয়েছে, ক-দিন ধরে রোজ বিকেলে এসে কিচিরমিচির করে কী যেন বলে! ইংরাজি বাংলা হিন্দি ওড়িয়া কোনও ভাষা বলেই ওকে কিছু বোঝাতে পারিনি। কিচিরমিচিরের ভেতর আপনার নামটা যেন দু-একবার শুনে ওকে আজ ধরে রেখেছি আপনার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেব বলে।
ঘনাদার হাতটা তখনও থমকে আছে টিনটার ওপর। চোখ দুটো যেন আরও কোঁচকানো।
আমাদের নতুন অতিথি হাসিমুখে ঘনাদার দিকে ফিরে আবার বলেছে, জাং-আন তা কুট সায়া বুকাহমু সুহ!
ঘনাদা সিগারেটটা এবার তুলে নিয়েছেন টিন থেকে। তারপর যা একটি প্যাঁচ ছাড়বার চেষ্টা করেছেন তাতে প্রথমটা একটু ভাবনাই হয়েছে, সব আয়োজন বুঝি গোড়াতেই ভেস্তে যায় এই ভয়ে।
আমাদের নতুন অতিথির কিচিরমিচিরের ঠেলায় দিশাহারা হয়েই বোধ হয় ঘনাদা হঠাৎ গলায় ঢেউখেলানো সুর তুলে আমাদের ভড়কে দিতে চেয়েছেন।
পালটা জবাবে তিনি ছেড়েছেন, নী-ঈ শের শে!
ঢেউ খেলানো সুরে ওই প্রলাপটুকু ছেড়ে, একটু থেমে, তিনি আবার বলেছেন, দ্য-অং ঈ! দ্য-অং? ওয়-আ ঈ, আঃ উ ইয়াং হোঅ-আ?
ঘনাদার তারপর শিশিরের হাত থেকে দেশলাইটা প্রায় টেনে নিয়ে যতক্ষণ সিগারেট ধরিয়েছেন ততক্ষণে আমাদের নতুন অতিথির মুখের দিকে চেয়ে আমরা একটু প্রমাদ গনেছি সত্যিই।
আমাদের নতুন অতিথিকে একটু ভ্যাবাচাকাই মনে হয়েছে।
এত শেখানো পড়ানো সত্ত্বেও ঘনাদার এই সস্তা প্যাঁচেই ভদ্রলোক কাবু হবেন নাকি? তা হলেই তো সব ভণ্ডুল।
ভদ্রলোক আসলে বাঙালি, নাম অভয় দাস, কিন্তু তিন পুরুষ মালয়ে কাটিয়ে পুরো না হন, প্রায় বারো আনাই ম্যালে হয়ে গেছেন। বাংলা জানেন না এমন নয়, কিন্তু ম্যালেটাই মাতৃভাষা বলা উচিত। শিশিরের মামাতো ভাইয়ের বন্ধু। কী একটা ব্যবসার কাজে মাসখানেকের জন্য ভারতবর্ষে এসেছেন। মামার বাড়ি গিয়ে ভদ্রলোকের পরিচয় পেয়েই শিশিরের মাথায় আজকের ফন্দিটা এসেছে। তারপর সবাই মিলে সেটা চেঁছে ছুলে পালিশ করে ভদ্রলোককে ভাল করে তালিম দিয়ে আজকের আসরে এনে হাজির করেছি।
এত কাণ্ডের পর ঘনাদার এই সামান্য চালাকির কাছে হার মানা তো কিছুতেই উচিত নয়।
অভয় দাসের খাঁটি ম্যালে বুকনির মাথামুণ্ডু না বুঝে মরিয়া হয়েই ঘনাদা যে আবোল-তাবোল সুর ধরেছেন সে বিষয়ে আমাদের তখন কোনও সন্দেহই নেই। ঘনাদার এই ধাপ্পায় আর খানিকক্ষণ অটল থাকলেই তাঁকে নির্ঘাত জব্দ হতে হবে।
অভয় দাস আর একটু যদি ধৈর্য ধরে থাকেন!
অভয় দাস আমাদের মুখ রক্ষা করলেন। প্রথমটা কেমন ফ্যাকাশে মেরে গেলেও আমাদের মুখে চকিতে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে জোর পেয়ে, ঘনাদার সিগারেট ধরানো শেষ হতে না হতেই তিনি আবার শুরু করলেন, সায়া টিডা মং আর টি। মীন টা বিচারা প্লান্ প্লান্।
ঘনাদার কাত হতে আর বেশি দেরি নেই তা তাঁর পরের সুর ভোলা থেকেই যেন বোঝা গেল। তিনি মান বাঁচাবার শেষ চেষ্টাতেই যে একটা লম্বা কাঁদুনে সুর ছাড়লেন, চিংনী ইয়ং দিয়ান ত ইয়াউ তো হোয়ে ঈ দা। ওয়া হোয়ে শোওয়া ইং গোয় হোয়া । ফা গোয়া হোয়া মিয়ান দিয়ান হোয়া রের ব্যন হোয়া..
এই হোয়ার মাঝেই হঠাৎ চমকে উঠলাম সেই শ্রীমান হুলোর নেপথ্যে সংগীত লহরিতে।
ঘনাদাও যেন স্তম্ভিত হয়ে থেমে গিয়ে কান খাড়া করেছেন।
সে কান খাড়া করার ভেতরের চালাকিটুকু তখন সত্যিই ধরতে পারিনি।
ঘনাদার ফাঁকা আওয়াজ যে বেফজুল হয়েছে তা বোঝাতে শেষ কিস্তি ঠেলবার জন্য অভয় দাসকে চোখের ইশারা করলাম।
অভয় দাস সোৎসাহে তাঁর পরের খেপের গোলাবর্ষণ করতে যাচ্ছেন হঠাৎ ঘনাদা ভ্রুকুটি করে হাত তুলে আঁকে থামালেন!
হল কী? কুটির সম্মান রেখেও না বলে পারলাম না, ও তো কোথায় কোন হুলো চেঁচাচ্ছে!
হ্যাঁ, তা-ই? ঘনাদা যেন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে স্বীকার করলেন।
কৌতুকের সঙ্গে কৌতূহলও একটু আর না মিশে পারে! শিবু জিজ্ঞাসা করলে, আপনি কী ভেবেছিলেন?
কেউ আলাপ করছে ভাবলেন বোধ হয়! গৌর যেন সরল মনে মন্তব্য করলে।
ওটাও কারুর ভাষা ভেবেছিলেন নাকি! আমি বিমূঢ় বিস্ময় প্রকাশ করে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ঘনাদা তার সুযোগ দিলেন না। আমার অসাবধানে এগিয়ে দেওয়া কথার ছুতোটুকু ধরেই আমাদের ফাঁকটুকু কেটে পিছলে বেরিয়ে গেলেন।
