হাঁ, ভাল না তো লিবো কেনো! বনোয়ারি আমাদের সন্দেহের বিরুদ্ধে তার সাক্ষ্যপ্রমাণ পেশ করলে—বড়বাবু নিজে দেখিয়েছে না?
বড়বাবু মানে ঘনাদা দেখেছে! কখন দেখল! আমাদের সবিস্ময় উদগ্রীব প্রশ্ন এবার।
ওই হামি বাস-সে নামলাম। বনোয়ারি বিবরণ দিলে, আর বড়বাবু উখান দিয়ে যেতে যেতে হামাকে দেখলে। তারপর ডাক দিয়ে আমার মছলি সব ভাল করে দেখে তারিফ করলে। বড়বাবুর ফরমাস নিয়ে তো তারপর বিস্কুটপিসাই লা-তে গেলাম। তাই তো দের হয়ে গেল আসতে।
বনোয়ারি নিজের কাজে বেরিয়ে গেল।
আমরা নীরবে পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম কিছুক্ষণ।
তেলের গল্প আর তপসে মাছের মধ্যে কোনও নিগুঢ় সম্বন্ধ আছে কি!
ভাষা
ঠাৎ চমকে উঠলাম।
ভাল গান শুনে যদি বলি কানে যেন মধু ঢালছে তা হলে এই বিদঘুটে আওয়াজ কানে যেন পাঁচন ঢালছে ছাড়া আর কী বলা যায়!
মনে হল আকাশটাকে মিহি মোটা দাঁতওয়ালা করাতে কে যেন রসিয়ে রসিয়ে চিরছে।
এত কথা বলেও যার মহিমা ঠিক বোঝাতে পারছি না, তা হল সন্ধে রাত্রে কাছাকাছি কোথায় কাদের বাড়ির নিরিবিলি ছাদে কোনও শ্রীমান হুলোর কণ্ঠসংগীত। সারা পাড়াটার যেন কান কটকটিয়ে দিলে।
আর তার চেয়ে যা লোকসান করলে আমাদের। একেবারে যাকে বলে ঘাটের কাছে এনে ভরাড়ুবি।
অমন একটা পাকা চাল একেবারে মাত-এর মুখে দিলে কাঁচিয়ে!
আর স্রেফ ওই একটি হলো বেড়ালের মার্জারসংগীতের গিটকিরিতে।
হুলো বেড়ালটা অমন দুশমনি করে বাদ সেধে ঠিক ওই ক্ষণটিতে কালোয়াতি গলা সাধতে শুরু না করলে কী করতেন ঘনাদা?
ফাঁদ থেকে বেরুবার কোনও রাস্তা কি তাঁর ছিল?
আড্ডা-ঘরে শনিবারের রাত্রের খ্যাঁটের পর যা শুরু করেছিলাম তা আর মিনিট, দশেক চালাতে পারলেই আর দেখতে হত না।
ঘনাদাকে ল্যাজে গোবরে হয়ে রণে ভঙ্গ দিতে হত কিংবা সাদা নিশান ওড়াতে হত সন্ধির।
কারণ এবার তো আর এলেবেলেদের দিয়ে খেলানো নয়, একেবারে পেশাদারি পাকা ওস্তাদ আমদানি।
ঘনাদাকে ঘুণাক্ষরে জানতেও দিইনি যে অমন একটি বোমা তাঁর জন্য ঠিক সময় কষে নিয়ে সলতে ধরিয়ে জালিয়ে রেখেছি দোতলার আড্ডা-ঘরে। সুতরাং ঘনাদা তৈরি থাকবার সময়ই পাননি।
একেবারে যে অতর্কিতে আচমকা ল্যাংমারা, তা অস্বীকার করতে পারব না। সুতরাং ঠিক ধর্মযুদ্ধের কোঠায় পড়ে না। কিন্তু কুরুক্ষেত্রেই বা সত্যিকার মহাবীরদের ক-জনকে ধর্মযুদ্ধে কাবু করেছে পাণ্ডবেরা।
না, ঘনাদাকে জব্দ করতে যা আমরা করেছি আদালতে তার সপক্ষে সেই সেকালের মহাভারত পুরাণ থেকে শুরু করে হালের ভিয়েতনাম পর্যন্ত অনেক নজিরই দিতে পারি।
শুধু লজ্জার কথা এই যে জব্দ ঘনাদা হননি, হয়েছি আমরাই।
কিন্তু কী মোলায়েম ভাবেই না নিঃশব্দে জালটি ঘনাদার চারিধারে গুটিয়ে এনেছিলাম।
অত্যন্ত বেয়াড়া দিনকাল। কনট্রোল করলেও যা, ছাড়লেও তা-ই বাজারে কোনও কিছুই মনের মতো পাওয়ার জো নেই খোলাখুলি ভাবে।
তবু সেদিন শিশির তক্তাঘাটের ভরসায় না থেকে সন্ধ্যার আগের ট্রেনেই গঙ্গার বদলে রূপনারায়ণের জোড়া ইলিশ নিয়ে ফিরে এসেছে।
ঘনাদাকে অবশ্য শুধু জোড়া ইলিশের খবরটাই জাঁক করে জানানো হয়েছে তাদের জাতকুল গোপন করে।
রাত্রের ভোজটা একরকম ভালই হয়েছে। ভাজা থেকে ইলিশ ভাতে পর্যন্ত ঘনাদা বেশ তারিয়েই খেয়েছেন মনে হয়েছে, ঝালটা খাবার সময় একটিবার যে খিচটুকু দেখা দেবার উপক্রম হয়েছিল আর গৌরের বোকামিতে যা প্রায় মারাত্মক হতে চলেছিল আমরা সবাই কোনও রকমে তাপ্লি দিয়ে সে-বিপদ কাটিয়েছি।
ঝালের ইলিশটা কাঁটা বেছে মুখে তুলতে তুলতে ঘনাদা যেন চোখ দুটো ছোেট। করে ফেলেছিলেন।
তারপর ঈষৎ সন্দিগ্ধ ভাবে বলেছিলেন, ইলিশটা কোথাকার হে?
কেন? কেন? গঙ্গার! আমরা সমস্বরে জানিয়েছিলাম।
উহুঁ! ভুরু কুঁচকে ছিলেন ঘনাদা, ঠিক গঙ্গার বলে তো মনে হচ্ছে না।
টেমস কি সেন নদীর হবে তা হলে! গৌর বেয়াড়া রসিকতা করে ফেলেছিল।
ঘনাদার মুখে ঘনঘটা শুরু হবার আগেই আমরা যেন ব্যস্ত হয়ে গৌরকে ধমক দিয়ে বলেছিলাম, ঠাট্টার কথা নয়, মাছটা তেমন টাটকা মনে হচ্ছে না, না ঘনাদা?
আমাদের বেশ একটু থ করে দিয়ে ঘনাদা বলেছিলেন, না, টাটকা হবে না কেন! তবে গঙ্গার বদলে যেন রূপনারায়ণের তার পাচ্ছি।
গৌর আবার কী বলতে যাচ্ছিল। তাকে সে সুযোগ না দিয়ে আমরা ঘনাদাকে সমর্থন জানিয়ে বলেছি, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আনাড়ি পেয়ে তক্তাঘাটের নামে আমাদের কোলাঘাটই চালিয়ে দিয়েছে হয়তো।
বানচাল হতে হতে সামলে নিয়ে তারপর ঘনাদাকে এতটুকু সন্দেহ করবার সুযোগ দিয়ে টার্কিশ সিগারেটের লোভে লোভে দোতলার আজ্ঞা-ঘরে এনে তুলেছি।
শিশির খাবার সময়েই টোপটি ফেলেছিল। ঘনাদা ঝোল ঝাল ছাড়িয়ে ডিমের অম্বলটা পর্যন্ত পৌঁছেছেন, তখন হঠাৎ যেন একটা কথা মনে পড়ায় লজ্জিত হবার সুরে বলেছিল, বড় কিন্তু ভুল হয়ে গেছে—ছি! ছি! টিনটা বদলে আনতেই মনে নেই।
ঘনাদা শুধু মুখ তুলে চেয়েছেন। তাঁর হয়ে আমরাই জিজ্ঞাসা করেছি, কীসের টিন?
কীসের আবার। শিশির নিজেই এবার যেন বিরক্ত হয়ে বলেছে, সিগারেটের টিন। কাল দোকানে গেছলাম। কী এক টার্কিশ সিগারেটের টিন দিয়েছে না জানিয়ে। আজ বদলে আনতে ভুলে গেছি।
টার্কিশ সিগারেটের টিন বদলে আনবে? ঘনাদার গলার অনুকম্পা মেশানো ব্যঙ্গের সুরেই আমরা খুশি হয়ে উঠেছি।
