প্যালেডিয়ম আর অসমিয়ম হল প্ল্যাটিনমের মিশ্র ধাতু। কয়েকটি কাজে এ ধাতুর জুড়ি নেই। প্যালেডিয়ম গলে ১৫৫° সেন্টিগ্রেডে। খাদ্য হিসেবে গ্লিসেরাইডস তৈরির ব্যাপারে প্যালেডিয়ম কি প্ল্যাটিনমের চেয়ে সেরা ক্যাটালিস্ট নেই! শুধু অত্যন্ত দামি বলেই এ-ধাতুর বদলে আপনাদের নিকেল ধাতু ব্যবহার করতে হয়। প্যালেডিয়ম এখানে অঢেল দেখে আপনার লোভের জিভ লকলক করে উঠেছে। জোড়া দ্বীপ হাত করবার অদ্ভুত ফন্দিও আপনি করেছেন। ছোট এই দুটি সমুদ্রের ফুটকির মতো দ্বীপ। উত্তর বিষুব সমুদ্রস্রোত এই দ্বীপ দুটির প্রায় মাথার কাছ দিয়েই ঘুরে যায়। আপনি সস্তা পেট্রোলের গাদ কিনে জোড়া দ্বীপের পুবের দিকে কাছাকাছি কোথাও ঢালাবার ব্যবস্থা করেছেন গোপনে। সে-তেল সমুদ্রের জলের ওপর নোংরা সরের মতো ভেসে এসে এই দ্বীপ দুটিকে ঘিরে জমতে শুরু করেছে। তেলের সরের তলায় প্রথমে সমুদ্রের আণুবীক্ষণিক প্ল্যাঙ্কটন বাঁচতে পারেনি অক্সিজেনের অভাবে।
প্ল্যাঙ্কটন যাদের আহার সেই ছোট মাছ পোকা গোছের সামুদ্রিক প্রাণী তারপর মরেছে। তারপর ধাপে ধাপে এই মৃত্যুর ঢেউ বিরাট সব জলচরদের স্তর পর্যন্ত পৌছেছে। খাবারের অভাবের দরুন মাছেরা এ-তল্লাটই ছেড়ে দিয়েছে। মাছেদের সঙ্গে মাছ যাদের আহার সেই পাখিরাও বন্ধ করেছে এ-দ্বীপে আসা।
মাছ ধরার নেশাতেই ম্যাক এ জোড়া দ্বীপ কিনেছিল! মনমরা হয়ে দ্বীপ দুটো অভিশপ্ত মনে করে বেচে দেবার কথাই সে ভেবেছে এবার। তার মনে এ-ভাবনা অবশ্য আপনিই কায়দা করে ঢুকিয়েছেন। বৈজ্ঞানিকদের নিয়ে এসে এখানকার রহস্যভেদের চেষ্টা করার নামে প্যালেডিয়ম-এর পুঁজি এখানে কত তা-ও একবার পরীক্ষা করিয়ে নিয়ে গেছেন। কিন্তু এত শয়তানি প্যাঁচ সব এক ফেনাই ভেস্তে দিলে।
কী সে ফেনা? ডালা ভাঙা বাক্সের ভেতর থেকে ওঠবার বিফল চেষ্টার সঙ্গে ডুগানের গলা থেকে যেন আক্রোশ আর কাকুতি এক সঙ্গে মিশে বার হল!
ও-ফেনা কী জানেন না! যেন অবাক হয়ে বললাম, ও, আপনি তো খনিজতাত্ত্বিক, কেমিস্ট তো নন। তবু জানেন হয়তো যে, অবাধ বেপরোয়া জাহাজ চালিয়ে আর কলকারখানার নোংরা কেরানি নির্বিচারে ঢেলে সমুদ্রটাকে ডাস্টবিন করে তোলার দরুন, দুনিয়ার সমস্ত সাগর এমন নোংরা তেলা হয়ে উঠেছে যে, এ-তেল যেভাবে তোক তুলে সমুদ্র আবার নির্মল করবার ব্যবস্থা না করলে সেখানকার প্রাণিজগতেরই বিপদ ঘনাবে। সে বিপদ ঠেকাতে বিজ্ঞানীরা যেসব উপায় বার করেছেন, তার একটি হল ওই ফেনা! ও-ফেনাকে কুচোনো পলিউরেথিন বলতে পারেন!
বিলেতের একটি কোম্পানি অনেক দিনের গবেষণায় ওটি উদ্ভাবন করে পরীক্ষা চালাচ্ছে। এরই জন্য বিলেত ছুটতে হয়েছিল। তেলের ওপর ছড়ালে তেল শুষে নিয়ে ওই ফেনা দেখতে দেখতে কালো হয়ে ওঠে। তখন ও তেল-শোষা কালো ফেনা অনায়াসে জলের ওপর দিয়ে টেনে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে কোথাও জমা করা যায়। ও-ফেনা নিংড়ে আবার তেল বার করে নেওয়াও শক্ত নয়। সমুদ্রের জল তেল কাটিয়ে নির্মল করবার আরও এক জিনিস আছে। এটি আমেরিকায় উদ্ভাবিত। নাম হল পলি কমপ্লেক্স এ জলে ভাসা তেলের ওপর ছড়ালে তা তেলকে সূক্ষ্মভাগে ভাগ করে তার সঙ্গে মিশে গিয়ে জীবাণুদের এমন সুখাদ্য হয় যে আলো হাওয়ায় তেল উবে যেতে দু মিনিটও লাগে না। তেল তোলার এ ব্যবস্থায় খরচা একটু বেশি, পলিউরেথিনে খরচ কম। তাতেও একশো টন তেল শুষতে তেরোশো ডলার খরচ পড়ে। এ জোড়া দ্বীপের অভিশাপ কাটাবার খরচ ওই হিসেব অনুসারেই ধরেছি।
একটু চুপ করে থেকে আবার বলেছি, ভাবছি আপনার মতলব আপনারই ওপর খাটাই। শুধু আপনি আমার লাশটা বোটে ভাসাবেন ঠিক করেছিলেন আর আমি আপনাকে জ্যান্তই বোটটা চালাবার সুযোগ দেব। আমি এখন সাঁতার কমা দ্বীপে চলে যাচ্ছি। মোটর বোটটা এখানে রইল। বাক্সের গর্ত থেকে উঠতে আপনার একটু দেরি হবে মনে হচ্ছে। তা হোক, ওঠবামাত্র মোটর বোটে গিয়ে স্টার্ট দিয়ে রওনা হবেন। এখান থেকে সেন্ট টমাস দ্বীপ খুব দূর নয়। বোট চালাবার যেটুকু অভিজ্ঞতা আছে তা-ই দিয়েই সেখানে পৌঁছে বলবেন ঝড়ে পড়ে মোটর বোটে আপনার দিক ভুল হয়ে গেছে। সেন্ট টমাস থেকে আমেরিকায় ফিরে যাবেন, কিন্তু খবরদার কোনও দিন আর ম্যাকের ধারে কাছে আসবেন না।
ডুগানকে বাক্সের মধ্যেই রেখে তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেলাম। ডুগানের সঙ্গে আর দেখা হয়নি! সে আর ম্যাকের ধার মাড়ায়নি বলেই জানি।
ঘনাদা কথাটা শেষ করেই উঠে নিজের টঙের ঘরে চলে গেলেন। শিশিরের কাছে। একটা সিগারেট চেয়ে প্যাকেটটাও নিয়ে যেতে ভুলে গেলেন এই প্রথম।
ঘনাদা চলে যাবার পর আমাদের কিছুক্ষণ আচ্ছন্ন গোছের অবস্থা। বিশেষ করে গৌরের অত বড় বেয়াদবি মাফ করে ঘনাদার অমন খোলসা মন নিয়ে ফিরে আসা, আর যা নিয়ে তাঁর মানে ঘা সেই তেলের ওপরই গল্পের আসর জমিয়ে যাওয়ার আশাতীত উদারতায় তখন আমরা কৃতজ্ঞতায় গদগদ। তারই মধ্যে বনোয়ারিকে যেন দেখতে পাওয়া গেল বারান্দা দিয়ে যেতে।
ব্যস্ত হয়ে হাঁক দিয়ে তাকে ডাকলাম। ঘরে এসে দাঁড়াবার পর উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কী রে, কখন এলি? তপসে মাছ পাসনি বুঝি?
বনোয়ারির মুখে গর্বের হাসি দেখা গেল, পাইয়েছে না কী রকম? হামি গিয়েছে আর মাছ মিলবে নাই!
পেয়েছিস তা হলে। আমাদের দন্তও বিকশিত হয়। তারপর একটু সন্দেহের সুর বাজল কণ্ঠে, হ্যাঁ রে, ভাল তাজা তপসে তো?
