তার মুখের চেহারা দেখে আশ্বাস দিয়ে বলেছি, দেবে, দেবে, নিশ্চিন্ত থাকো। কারণ তোমার জোড়া দ্বীপের ভেতরকার মাটি সব পি. ডি. ৪৬ আর ১০৬.৭। কিছু ও.এস. ৭৬ আর ১৯০.৮-ও আছে।
ম্যাক হতাশ ভাবে আমার দিকে তাকাতে আবার বলেছি, আজ নয়, কাল সকালে সব ভাল করে বুঝিয়ে দেব।
পরের দিন সকালে ম্যাককে সব বুঝিয়ে বলার সুযোগ পাবার আগে সেই রাত্রেই একটা বিশ্রী ব্যাপার ঘটেছে।
অন্যবারের মতো এবারেও আমি আর সকলের সঙ্গে কমা দ্বীপে না থেকে একলা ড্যাশে তাঁবু ফেলে থাকবার ব্যবস্থা করেছি।
ঘর অন্ধকার না হলে আমার ঘুম আসে না। সে-রাত্রে কিন্তু হ্যাসাক বাতিটা জ্বেলেই রেখেছিলাম। রাত দুটো নাগাদ হাতের মোটা ব্র্যাডশটা মুড়ে ক্যাম্পখাট থেকে নেমে তাঁবুর দরজার পর্দাটা সরিয়ে বললাম, আসুন, মি. ডুগান, আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন? ডুগান ভুরুটা একটু কুঁচকে সামনে পেতে রাখা তাঁবুর স্টিলের ফোল্ডিং চেয়ারটা সরিয়ে কাঠের একটা শক্ত বাক্সের ওপর সাবধানে দেহভার নামিয়ে বললে, কেন বলুন তো?
বাঃ, আপনার বন্ধুকে বাঁচাবার জন্য আমায় ধন্যবাদ দিতে না এসে আপনি পারেন! আমার গলায় সরল উচ্ছ্বাস ফুটিয়ে বললাম, তবে আপনি সাঁতরেই আসবেন ভেবেছিলাম।
যেমন আপনি সে রাত্রে গেছলেন! ডুগানের টোম্যাটোর মতো রাঙা মুখ বিটের মতো আধা বেগনি হয়ে উঠল।
হ্যাঁ, মোটর বোটটার আওয়াজ যে বড় বিশ্রী, আমি অস্বস্তির সঙ্গে বললাম, এসব কাজ যত চুপিচুপি সারা যায় ততই ভাল নয় কি! আমার বেলা দেখুন, কখন খাঁড়ি পার হয়েছি, কখন আপনার ঘরে ঢুকে নোটবই খুলে ওসব লিখেছি, আপনি টেরও পাননি। অথচ পাড়ে লাগাবার আগেই মোটর বন্ধ করা সত্ত্বেও আপনি যে আসছেন তা আমি টের পেয়েছি।
টের পেয়েও কিছু সুবিধে হবে কি?
কাঠের বাক্সটার কাছেই আমি দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ এক ঝটকায় আমার হাত থেকে ব্র্যাডশটা ছিনিয়ে নিয়ে ডুগান আবার মোলায়েম গলায় জিজ্ঞাসা করলে, জেগে থাকবার জন্য এই বই পড়ছিলেন বুঝি? কিন্তু এ তো উপন্যাস-টুপন্যাস নয়, রেলের টাইম টেবল দেখছি। তাও আমেরিকার নয়, বিলেতের।
হ্যাঁ, বিলেতের ব্র্যাডশ, আমি সবিনয়ে স্বীকার করলাম, এখান থেকে বিলেতে গিয়ে কিছুদিন ঘুরতে হবে কিনা। তাই ওখানকার ট্রেন-ফ্রেনের খোঁজখবর নিচ্ছিলাম।
ওখানকার খোঁজখবরের আর আপনার দরকার হবে না। মুখের ভাবটা যতদর সম্ভব মধুর করে মোটা ব্র্যাডশটা অবলীলাক্রমে দু-হাতে ছিঁড়ে ফেলে ডুগান ঘেঁড়া খণ্ড দুটো আমার হাতে দিয়ে বললে, বিলেতে যাওয়াই যখন আপনার হচ্ছে না, তখন ও-ব্র্যাডশ ছিঁড়ে ফেলাই ভাল।
হ্যাঁ, তা ঠিকই বলেছেন! একটা ঘেঁড়া খণ্ডের ওপর আর একটা খণ্ড রেখে দু হাতের এক মোচড়েই ছিঁড়ে চার খণ্ড করে ফেলে দিয়ে বললাম, তা ছাড়া আজকাল প্লেন থাকতে ট্রেনে ওঠারই তো মানে হয় না।
বিশেষ করে হাত-পা যাদের ভাঙা দোমড়ানো তাদের। ডুগান স্টিলের ফোন্ডিং চেয়ারের একটা রড মোমের বাতির মতো বাঁকিয়ে দুমড়ে দিয়ে আমার দিকে ছুঁড়ে দিলে।
সেটা ধরে টেনে টেনে আবার সোজা করে পাশে নামিয়ে রেখে বললাম, তাই হুঁশিয়ার থাকাই ভাল, হাত-পা যাতে আস্ত থাকে। সবাই তো আর দোমড়ানোকে সোজা করতে পারে না।
হঠাৎ বাঘের মতো থাবা বাড়িয়ে আমার টুটিটা যেন লোহার রেঞ্চে চেপে ধরে ডুগান বললে, তোর বেয়াদবি অনেক দূর পর্যন্ত সহ্য করে করেছি, কেলে উচ্চিংড়ে! গলার নলি চিপটে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মরবার আগে কটা কথা পরকালের খোরাক হিসেবে শুনে যা। এত বুদ্ধি খাটিয়ে এত কষ্টে আর চেষ্টায় যা করে তুলেছিস সব আমি ভেস্তে দেব। খানিক বাদে মোটর বোটের ওপরে গিয়ে, নেমে তোর লাশটা বোটের ভেতর রেখে সেটা আবার সমুদ্রমুখখা করে স্টার্ট দিয়ে ছেড়ে দেব। যদি আগেই না ডোবে তো অথৈ ক্যারিবিয়ান সমুদ্রে কোথায় যে সে মোটর বোট তেল ফুরোলে গিয়ে পৌছোবে কেউ জানে না। সকলের কাছে রটিয়ে দেব, তুই আমাদের টাকা চুরি করে মোটর বোটে পালিয়েছিস। অজ্ঞান হতে আর তোর বাকি নেই বুঝতে পারছি, তাই দু কথায় সারটুকু শোনাচ্ছি! তোকে সরাবার পর এ-জোড়া দ্বীপ ওই হাঁদারাম ম্যাকের কাছে ধাপ্পা দিয়ে না পারলে জবরদস্তি করে আমি বাগাবই। ও পি. ডি. ৪৬ আমার আবিষ্কার। আমিই ওর মালিক!
এবার তা হলে গলাটা ছাড়ুন।
ডুগানের চোখ-মুখের ভাবটা সত্যি তখন দেখবার মতো। এতক্ষণ ধরে বজ্রের মতো মুঠোয় নলিটা চেপে ধরে রাখবার পর নিতান্ত সহজ গলায় আমায় কথা বলতে শুনে সে একেবারে থ।
ক্ষণেকের জন্য হাতটা তার আপনা থেকেই শিথিল হয়েছিল। না হলেও ক্ষতি ছিল না অবশ্য। গলাটা এক ঘাড়-নাড়ায় ছাড়িয়ে নিয়ে তার মাথায় একটা থাবড়া দিলাম। কাঠের বাক্সের শক্ত মজবুত ডালাটা ভেঙে তার ভেতরে সে অর্ধেকটা সেঁদিয়ে যেতে যেন লজ্জিত হয়ে বললাম, ছি ছি কাঠটা অত হালকা তা বুঝতেই পারিনি!
হাত বাড়িয়ে তাকে তুলতে গিয়ে আবার হাতটা সরিয়ে নিয়েই তারপর বললাম, থাক, যেমন আছেন তেমনিই থাকুন। আমার গলাটার দিকে অমন করুণ চোখে চাইবেন না। ওটা রক্ত-মাংসের তৈরি, শুধু যোগের ব্যায়ামে একটু বেশি মজবুত। এ-গলা টিপে কিছু করা যায় না। এখন আসল কথাগুলো শুনুন। এ জোড়া দ্বীপ প্রায় কুবেরের ভাণ্ডার বুঝে তা হাত করবার যে শয়তানি ফন্দি আপনি এঁটেছিলেন তা সত্যিই তারিফ করবার মতো। পাঁচ বছর আগে আপনি ম্যাকের অতিথি হয়ে কমা-ড্যাশে মাছ ধরতে আসেন! আপনি নিজে একজন খনিজতাত্ত্বিক। আপনার গ্লিসেরাইডস-এর কারখানা আছে। আপনি একটু ঘুরে-ফিরেই বুঝেছেন এ দুই দ্বীপে অমূল্য কিছু আছে। এখানকার মাটি খুঁড়ে নমুনা নিয়ে আপনি পরীক্ষা করিয়ে জেনেছেন যে, এখানে অঢেল পি. ডি. অর্থাৎ প্যালেডিয়ম আছে যার অ্যাটমিক নম্বর ৪৬ আর অ্যাটমিক ওজন ১০৬.৭। তা ছাড়া ও. এস. মানে অসমিয়মও আছে কিছু পরিমাণ যার অ্যাটমিক নম্বর ৭৬ আর ওজন ১৯০.৮।
