আপনার মতো?
ম্যাক ও ডুগান দুজনেই অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়েছে।
তারপর ডুগান একটু বিরক্তির সঙ্গে বলেছে, ঠাট্টার ব্যাপার এটা নয়, দাস। লেখাটা আপনার মতো কী করে হতে পারে? আর তা-ই যদি হয় তা হলে আপনাকেই তো ভূত বলে বুঝতে হয়। রাত্রে ড্যাশ থেকে হাত বাড়িয়ে কমাতে আমার টেবিলের নোটবুকে হিজিবিজি কেটেছেন।
নোটবই-এর রহস্যের মীমাংসা হয়নি। ডুগান বেশ একটু বিমূঢ় বিচলিত হয়েই আমাদের সঙ্গে স্টেটস-এ ফিরে এসেছে।
ফেরবার পর ম্যাক তার আপদ চুকিয়ে ফেলবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। কমা আর ড্যাশ এখন যেন তার দু-চক্ষের বিষ। কোনও রকমে ও দুটো দ্বীপের মালিকানা থেকে মুক্ত না হতে পারলে যেন তার স্বস্তি নেই।
ডুগান বন্ধুকে শান্তি দেবার জন্য দ্বীপ দুটো বেফায়দা জেনেও কিনে নিতে রাজি হয়েছে। ঠিক হয়েছে, মাসখাকে বাদেই বিক্রিটা পাকাপাকি করা হবে।
আমি ও ডুগান নিউপোর্টে ম্যাকের নিজের বাড়িতেই এসে উঠেছিলাম। একদিন সেখান থেকে ডুগান তার নিজের কাজে নিউইয়র্কে চলে গিয়েছে। আমারও তার সঙ্গে যাবার কথা। তা কিন্তু আমি যাইনি! সকালে ডুগান বিদায় নিয়ে চলে যাবার পর দুপুরে লাঞ্চ খেতে বসে হঠাৎ বলেছি, আমায় কিছু টাকা ধার দিতে পারো, ম্যাক?
ধার! ম্যাক প্রথমটা আমার ধার চাওয়ায় একটু অবাক হলেও তারপর হেসে বলেছে, কত তোমার দরকার, আর কবে?
এই ধরো লাখ দেড়েক ডলার। আর চাই এখুনি।
এখুনি লাখ দেড়েক ডলার তুমি ধার চাইছ? ম্যাক হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছে, দিতে চাইলেও আমি লাখ দেড়েক ডলার পাব কোথা থেকে? আমার যা কিছু আয় সব বাবা যা কিনে রেখে গিয়েছিলেন, সেই সব রেল রোডের শেয়ার থেকে। তা বেচবার বা বন্ধক দেবার অধিকার আমার নেই।
বেশ, সেসব শেয়ার হুঁতে হবে না। আমি দাবি করেছি, আমায় ওকালতনামা দাও তোমার শেয়ার-টেয়ার না ছুঁয়ে লাখ দেড়েক টাকা তোলবার।
ম্যাক এবার সত্যি বেশ ফাঁপরে পড়েছে। একটু ইতস্তত করে বলেছে, সত্যি এত টাকা তোমার দরকার, দাস?
হেসে ফেলে বলেছি, দরকার সত্যিই আছে, তবে তার জন্য তোমায় বিব্রত হতে হবে না। আমায় শুধু একটা কথা দাও।
কী কথা? ম্যাক একটু যেন সভয়ে জিজ্ঞাসা করেছে।
না, এমন কিছু শক্ত কথা নয়, আমি তাকে আশ্বস্ত করেছি, শুধু কথা দাও যে অন্য কোথাও নয়, কমান্ড্যাশ বিক্রির দলিলটা ওই দ্বীপে গিয়েই পাকা করে লেখা হবে এক মাস বাদে।
এরকম অনুরোধের মানেটা বোঝবার বৃথা চেষ্টা করে ম্যাক শেষ পর্যন্ত খুশি হয়েই সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সেইদিন বিকেলেই নিউপোর্ট ছেড়ে আমি বেরিয়ে পড়েছি। মাসখানেক ধরে ঘোরাঘুরিটা একটু বেশিই করতে হয়েছে। শুধু আমেরিকার এধার-ওধার নয়। পাড়ি দিতে হয়েছে ইংল্যান্ড পর্যন্ত।
একমাস বাদে নির্দিষ্ট দিনে ঠিকই অবশ্য হাজির হয়েছি নিউপোর্টে ম্যাকের বাড়িতে। ডুগান আমার আগেই সেখানেই উপস্থিত।
সে হেসে আমায় জিজ্ঞেস করেছে, কমা-ড্যাশে গিয়েই দলিল লেখবার এ অদ্ভুত খেয়াল মাথায় এল কেন?
এল, ওখানকার অপদেবতা তাড়াবার শেষ সুযোগ নেবার জন্য।
অপদেবতা তাড়াবার আশা এখনও করেন? ডুগান আমার পাগলামিতে কৌতুক বোধ করে জিজ্ঞাসা করলে, কীসে অপদেবতা তাড়াবেন? মন্ত্রে?
না, ফেনা দিয়ে!
আমার সত্যিই মাথা খারাপ হয়েছে ধরে নিয়ে হাসি চেপে ডুগান সেখান থেকে সরে গেছে তারপর।
ম্যাকের সুলুপে কমা ও ড্যাশে পৌছোবার আগে সুলুপের মাঝি-মাল্লারা পর্যন্ত চঞ্চল হয়ে উঠেছে একটা ব্যাপারে।
ম্যাক হতভম্ব আর ডুগান তো রীতিমতো উত্তেজিত।
দুরবিন ছাড়া খালি চোখেই দুটি স্টিমার দ্বীপের ধারে তখন দেখা যাচ্ছে।
ও স্টিমার কাদের? জিজ্ঞাসা করেছে ম্যাক।
কার হুকুমে দ্বীপে ওরা স্টিমার বেঁধেছে? ডুগান জানতে চেয়েছে।
হুকুমটা ধরুন আমার? হেসে বলেছি, আর স্টিমার দুটোর একটা এসেছে ফেনা ছড়াতে আর একটা মাটি খুঁড়তে।
ফেনা ছড়াতে আর মাটি খুঁড়তে? তার মানে? ডুগানের গলার স্বরে মনে হয়েছে আমার বাতুলতা এবার তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে।
তাকে শান্ত করবার জন্য বলেছি, চটবেন না, মি. ডুগান। আপনার একটা উপকারই করেছি এসব ব্যবস্থায়। বন্ধুকে শান্তি দেবার জন্য দুটো রদ্দি দ্বীপ কিনে আপনাকে আর স্বার্থত্যাগ করতে হবে না।
তাই নাকি! ডুগানকে অত্যন্ত খুশিই দেখিয়েছে, কিন্তু কেনার দরকার আর নেই কেন? ওই ফেনা ছড়ানো আর মাটি খোঁড়ার দরুন?
হ্যাঁ, মি. ডুগান, বিনীত ভাবে বলেছি, ওই ফেনা ছড়িয়েই জোড়া দ্বীপের অপদেবতাকে তাড়ানো হয়েছে। এখানকার সমুদ্রে আবার এখন মাছের গুতোগুতি। তবে অপদেবতা বেশ একটু না খসিয়ে বিদেয় হয়নি। ফেনা ছড়িয়ে তাকে তাড়াবার খরচ হল লাখ দেড়েক ডলার।
লাখ দেড়েক ডলার! এতক্ষণে ম্যাকের প্রায় আর্তনাদ শোনা গেছে, এত টাকা যেখান থেকেই জোগাড় করে থাকো, আমি শোধ করে দেব কোথা থেকে?
তোমায় শোধ দিতে হবে না,ম্যাককে শান্ত করে বলেছি, তোমার জোড়া দ্বীপে মাটি খোঁড়ার ইজারা যারা নিচ্ছে তারাই ও-দেনা চুকিয়ে দিয়ে আরও লাখ দুয়েক ডলার তোমায় বায়না দেবে।
মাটি খোঁড়ার ইজারা নেবার জন্য তারা লাখ দেড়েকের ওপর আরও দু-লক্ষ ডলার দেবে! ম্যাক এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যেন আমার মতো বদ্ধ উন্মাদকে আর একমূহূর্তও ছাড়া থাকতে দেওয়া উচিত নয়।
