তাতে হাল না ছেড়ে দিয়ে ডুগান নিজের খরচাতেই আবার অন্য একদল বৈজ্ঞানিককে সেখানে পাঠাতে চেয়েছে, কিন্তু ম্যাক তাতে উৎসাহ দেখায়নি।
নিজেও সে কমা-ড্যাশের জন্য কিছু করতে নারাজ। বন্ধু নিজের পয়সা এ ব্যাপারে নষ্ট করবে তা-ও সে চায় না।
ডুগানের স্বভাবে কিন্তু টেকসাসের গোঁ। এ রহস্যভেদের জেদ চেপে গেছে তার মাথায়। ম্যাক যখন দ্বীপ দুটোকে অভিশপ্ত আর ডাহা লোকসান বলেই মনে করে, ডুগান সেগুলো কিনেই নিতে চেয়েছে ম্যাকের কাছ থেকে।
কিনতে হবে না, অমনিই তোমায় দিয়ে দিচ্ছি,বলেছে ম্যাক। কিন্তু ডুগান তাতে রাজি হয়নি। দ্বীপ দুটির দুর্ভাগ্যের দরুন কম দামে কিনতেও আপত্তি করেছে। কিনতে হলে সেন্যায্য দামে কিনবে এইটেই ঠিক হয়ে আছে। এখন শুধু পাকাপাকি সই-সাবুদটুকুই বাকি।
ডুগানের কাছে সব শুনে তাকে ধন্যবাদই দিয়েছি। বলেছি, ম্যাক যা নিয়ে গুমরে মরছে সেই দ্বীপ দুটো তার হাত থেকে সরিয়ে নেওয়া সত্যিই বন্ধুর কাজ।
দ্বীপ দুটোর এ-অবস্থা কবে থেকে শুরু হয়েছে জানতে চেয়েছি তারপর।
ডুগান একটু ভেবে নিয়ে বলেছে, ঠিক চার বছরই হল। তার আগের বছরই ম্যাকের অতিথি হয়ে আমি কমা-ড্যাশে গিয়েছিলাম। তখন এ-দুর্ভাগ্যের কিছুমাত্র আভাসও পাওয়া যায়নি। সত্যিই এ যেন কোনও অপদেবতার অভিশাপ বলে ভাবতে ইচ্ছে করে এক-এক সময়ে।
অপদেবতার কথাটা মিথ্যে না-ও হতে পারে, গম্ভীরভাবে বলেছি।
সে কী! দুগান বিস্মিত কণ্ঠে বলেছে, আপনি এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন?
দেবতায় বিশ্বাস করলে, অপদেবতাতেও করতে হয়। এবার হেসেই বলেছি, সরেজমিনে তাই একটু তদারক করে আসতে চাই।
এবার ডুগান হেসে ফেলে বলেছে, আপনার কি মাথা খারাপ, দাস? আপনি এ-ব্যাপারে অপদেবতার হাত আছে মনে করেন? আর সে-দ্বীপে গেলে অপদেবতাকে ধরতে পারবেন এমন আপনার আশা?
হেসে আমি বলেছি, আশা করতে ক্ষতি কী!
তারপর সত্যিই একদিন সকলের অনিচ্ছা অমত অগ্রাহ্য করে কমা-ড্যাশের জোড়া দ্বীপে গিয়ে উপস্থিত হয়েছি। একরকম জোরজুলুম করে ম্যাক আর ডুগানকেও বাধ্য করেছি সঙ্গে আসতে।
কমা-ড্যাশ দুটি দ্বীপের মাঝখানের ব্যবধান মাত্র এক মাইলের। সমুদ্রের একটা খাঁড়িই যেন দুটো দ্বীপের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে। নিজেদের মোটর বোটে ওই খাঁড়িটুকু পার হওয়া সোজা বলে ম্যাক আর ডুগানের সঙ্গে কমা দ্বীপের স্থায়ী আস্তানায় না থেকে ড্যাশে একটা তাঁবু ফেলে নিজের থাকবার ব্যবস্থা করেছি।
মাছ পাখি ছেড়ে যাবার ওই অভিশাপটুকু না থাকলে দ্বীপ দুটি সত্যিই বড় সুন্দর বলা যেত।
অভিশাপের দরুন শুধু যে মাছ পাখিরাই লোপাট হয়েছে তা নয়, দ্বীপের বাতাসটাও মনে হয়েছে কেমন যেন বিষাক্ত।
ডুগানকে সে কথা বলায় সে আমার মস্তিষ্কের সুস্থতাতেই একটু যেন সন্দেহ করে বলেছে, বিষাক্ত মনে হচ্ছে কী থেকে?
মনে হচ্ছে সমুদ্রের সেই ফুসফুস তাজা করা নিঃশ্বাসের হাওয়া যেন পাচ্ছি না। বলে।
আপনার হাঁপানি-টাপানি নেই তো? এবার ঠাট্টা করেছে ডুগান।
আমার হাঁপানি থাকলেও ম্যাকের তো নেই! হেসে বলেছি, তাকেই জিজ্ঞাসা করা যাক।
তাকে জিজ্ঞাসা করে কিন্তু লাভ হয়নি কিছু। ম্যাক সেই বিরল মানুষের একজন যাদের নাকের গন্ধের গ্ল্যান্ডগুলো অসাড়। বিশুদ্ধ বা বিষাক্ত তার নাকে সব হাওয়াই সমান।
অপদেবতাকে চোখে না দেখা যাক, কমা-ড্যাশ ছেড়ে ফেরবার আগের দিন তার উপদ্রবের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সেদিন সকালে মোটর বোটে ড্যাশ থেকে কমাতে ফিরে আসবার পর থেকেই। লক্ষ করেছি যে ডুগান কী যেন একটা ব্যাপারে দারুণ উত্তেজিত।
মোটর বোটটা রাত্রে আমায় ড্যাশে পৌঁছে দিয়ে আবার কমাতেই রোজ ফিরে যায়। আগের দিন রাত্রে বোট যে চালায় সেই ম্যানুয়েল বোটটা ফেরত এনেছিল কি
বারবার খোঁজ নিয়েছে ডুগান।
ম্যাকই শেষ পর্যন্ত ডুগানকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে আগের রাত্রে মোটর বোটটা ফেরার সময় তারা সমুদ্রের তীরেই বসেছিল দুজনে। দুজনেই তখন মোটর বোটটাকে নোঙর ফেলে তীরে বাঁধা পর্যন্ত লক্ষ করেছে।
মোটর বোটটার ফেরা সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হবার পর ডগান আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠেছে যেন। আমাদের সঙ্গে অনুচর এসেছে মাত্র পাঁচজন। তাদের প্রত্যেককে রাত্রে কোথায় কে ছিল জেরা করেছে অনেকবার।
ব্যাপারটা কী বলুন তো, ডুগান? শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞাসা না করে পারিনি, আপনাকে কামড়াচ্ছে কীসে?
কীসে কামড়াচ্ছে, দেখবেন! ডুগান এবার তার নোটবইটা প্যান্টের পকেট থেকে বার করে আমাদের সামনে এক জায়গায় খুলে ধরেছে।
ম্যাক সেটা দেখে একটু হেসে ফেলে বলেছে, এ তো শুধু হিজিবিজি কাটা দেখছি!
শুধু হিজিবিজি! ডুগান ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
হিজিবিজির সঙ্গে দু-একটা লেখাও রয়েছে। আমি খাতাটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে বলেছি, কী যেন পি.ডি. ৪৬ তারপর ১০৬.৭ বার কয়েক লেখা, আর-এক জায়গায় আবার ও. এস. ৭৬ তার সঙ্গে ১৯০.৮! তা নোটবই-এ এসব লেখার মানে কী? লিখেছেই বা কে?
আমিও তো তা-ই জানতে চাই। ডুগান অত্যন্ত অস্থির ভাবে বলেছে, আমার নোটবই রাত্রে ঘরের মধ্যে টেবিলের ওপর রাখা ছিল। তাতে এ সব লেখা কার পক্ষে সম্ভব? কেনই বা সে লিখেছে?
এ তো ভৌতিক ব্যাপার মনে হচ্ছে?আমি চিন্তিত হয়ে বলেছি, সবচেয়ে মজার কথা হাতের লেখা প্রায় হুবহু আমার মতো।
