ম্যাককে দেখে খুশি যেমন হলাম তেমনই বেশ অবাকও। শীতকাল। নেহাত ফুটন্ত জলের ধারা তলা দিয়ে বইয়ে দেওয়ার দরুন নিউইয়র্কের রাস্তাগুলো গরম ও পরিষ্কার হলেও আর যেদিকে চাও তুষারে ঢাকা পড়ে যেন সাদা চিনির মোড়ক দেওয়া মনে হচ্ছে। এমন সময়ে এই নিউইয়র্কে ম্যাকের তো থাকবার কথা নয়। ম্যাক অর্থাৎ পিটার ম্যাকডোনাল্ড মার্কিন মাপকাঠিতে এমন কিছু ধনী নয়। মাত্র লাখখানেক ডলার তার বছরের আয়। সে আয় পৈতৃক যা সে পেয়েছে তা-ই থেকেই হয়। ব্যবসায় খাটিয়ে সে আয় বাড়াবার কোনও উৎসাহ তার নেই। যা আছে তাতেই খুশি থেকে সে নিজের নির্দোষ কটি শখ মেটায়। সে শখের মধ্যে প্রধান হল মাছ ধরা। নদী-পুকুরের নয়, একেবারে সমুদ্রের দামাল মাছ-টুনি, মার্লিন ইত্যাদি।
মাছ ধরবার জন্য তো বটেই, ছোট একটি বন্ধু বান্ধবের দল নিয়ে একান্ত নিরিবিলিতে কাটাবার জন্য, সে দুটি খুদে খুদে দ্বীপ কিনেই ফেলেছে একেবারে।
আমেরিকার ফ্লোরিডার তলা দিয়ে কিউবা,হিসপানিওলা, পুয়ের্তোরিকার সঙ্গে সার বেঁধে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-এর যে বড় ছোট থেকে নেহাত ফুটকির মতো সব দ্বীপের মিছিল একটু বাঁকা অর্ধচন্দ্রাকার রেখায় ট্রিনিডাড হয়ে দক্ষিণ আমেরিকার মাথা ছুঁই ছুঁই করছে, তারই মধ্যে কুমারী দ্বীপাবলি মানে ভার্জিন আইল্যান্ড একটা দ্বীপের জটলা। এ-জটলায় দ্বীপের সংখ্যা মোট শ-খানেক। তার মধ্যে সেন্ট টমাস, সেন্ট জন আর তাদের দক্ষিণের সেন্ট ক্রয় দ্বীপ তিনটিই যা একটু বড়সড়। তা-ও এ তিনটির কোনওটাই পঁচিশ মাইলের বেশি লম্বা নয়। তা থেকেই ভার্জিন আইল্যান্ড-এর বাকি দ্বীপগুলির বহর বোঝা যাবে। বেশির ভাগ দ্বীপই নীল সমুদ্রের অসীমতায় তিন-চার মাইলের মাটি-বালি পাথরের ফোঁটা মাত্র।
এমনই একজোড়া দ্বীপের ফোঁটা কিনে ফি বছর শীতকাল হলেই সবান্ধবে সেখানে মাছ ধরে, পানসি চালিয়ে আর যেন দুধে-ধধায়া বালির সমুদ্র-সৈকতে স্নান করে রোদ পুহিয়ে কাটানো ম্যাকের বাঁধা দস্তুর ছিল। এর নড়চড় এ পর্যন্ত হয়নি বলেই জানি।
ম্যাকের অতিথি হয়ে তার জোড়া দ্বীপে আমি বার-দুই শীতকালটা কাটিয়ে এসেছি। ম্যাক দ্বীপ দুটোর নাম দিয়েছিল কমা আর ড্যাশ। কমা আর ড্যাশের সঙ্গে আকারের একটু মিল থেকেই নামগুলো দেওয়া হয়েছিল। একটা দ্বীপ কমার মতো একটু বাঁকানো আর একটা ড্যাশের মতো লম্বা।
কমা আর ড্যাশ দুই দ্বীপের চারিধারের সমুদ্র সত্যই মাছ ধরার দিক দিয়ে স্বর্গ। কমা-ড্যাশে ম্যাকের নিমন্ত্রণ পাওয়াটা তাই আমেরিকার খানদানি মহলেও মস্ত সৌভাগ্য মনে করা হত। সমুদ্রের মাছ ধরা যাদের নেশা শীত এলে তাদের অনেকেই আশায় থাকত ম্যাকের নিমন্ত্রণের।
কিন্তু এবারে সে-দস্তুর এমন উলটে গেল কী করে? এই শীতের দিনে নিউইয়র্কের মতো হিমেল শহরের এক কোণে ম্যাক এমন ঘাপটি মেরে বসে আছে। কেন?
তার কাছে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে সেই কথাই জিজ্ঞাসা করলাম। একটু ঠাট্টার সুরে বললাম, তোমার কি রোদে অরুচি ধরেছে, ম্যাক, না হঠাৎ মাছে অ্যালার্জি? কমা-ড্যাশ ছেড়ে দিয়ে এই ডিসেম্বর মাসে তুমি নিউইয়র্কে বসে আছ!
ম্যাক কোনও জবাব দিলে না। যেন না জেনে তার পায়ের কড়া মাড়িয়ে ফেলেছি এমন যন্ত্রণা-মাখানো দৃষ্টিতে আমার দিকে একবার তাকিয়ে মুখটা ফিরিয়ে নিলো।
তার বদলে ম্যাকের সঙ্গীই জবাব দিলেন। ভদ্রলোকের সঙ্গে ম্যাক গোড়াতেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। নাম ফ্রাঙ্ক ডুগান। টেকসাস-এর লোক, কোটিপতি। তবে পেট্রোলের দৌলতে নয়, কী সব ফ্যাক্টরি আছে, আর সব অন্য রাসায়নিক নিয়েও কারবার।
ডুগান সহানুভূতির স্বরে বললেন, ও-দুটো নাম ওর কাছে করবেন না। ওর বুকের ঘা তাতে খুঁচিয়ে তোলা হয়!
সত্যিই অবাক হয়ে একবার ম্যাক আর একবার ডুগানের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। তারা আমায় নিয়ে ঠাট্টা করছে নাকি! ডুগানকে জানি না। কিন্তু ম্যাক তো আমার সঙ্গে ঠাট্টা করবার পাত্র নয়।
ব্যাপারটা যে ঠাট্টা নয়, অত্যন্ত শোচনীয় ট্রাজেডি—দু-একদিনের মধ্যেই ডুগানের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলাম।
ম্যাক এ-বিষয়ে কোনও কথা বলতেই চায় না। ডুগান বন্ধুর দুর্ভাগ্যে মর্মাহত হলেও আমার পেড়াপীড়িতে কমা-ড্যাশের করুণ ট্র্যাজেডিটা আমায় জানাল।
ট্র্যাজেডিটা করুশ সন্দেহ নেই, কিন্তু একেবারে রহস্যময়।
যে জোড়া দ্বীপে মাছ ধরে সত্যি অরুচি ধরে যেত সেখানে একটি চুনো মাছও আর পাওয়া যায় না গত দু-বছর ধরে। সমুদ্রের জলে মাছ নেই, দ্বীপ দুটিতে উড়ো পাখিও আর বসে না। সত্যিই যেন কোনও শাপমন্যি দ্বীপ দুটোতে লেগেছে।
ডুগান বন্ধুকে অনেক করে বোঝাবার চেষ্টা করেছে যে ব্যাপারটার মানে বুঝতে পারা যাক বা না যাক এ দুর্ভাগ্য হয়তো সাময়িক। যেমন হঠাৎ আপনা থেকে ব্যাপারটা ঘটেছে, তেমনই আপনা থেকেই হয়তো আগের সুদিন ফিরে আসবে।
কিন্তু ম্যাককে এ-আশ্বাসে চাঙ্গা করা যায়নি। কমা-ড্যাশ যে তার বুকের দুটি ফুসফুস। তাদের এই দুর্দশায় সে একেবারে ভেঙে পড়েছে।
বিজ্ঞানের দিক দিয়ে কমা-ড্যাশের রহস্যের কোনও হদিস পাওয়া যায় কি না দেখবার জন্য ডুগান জোর করে নিজের একদল বৈজ্ঞানিককে সেখানে নিয়ে গেছে।
তারা নানারকম জমকালো দাঁতভাঙা বিজ্ঞানের বুকনি ছেড়েছে। কিন্তু রহস্যের কোনও কিনারা করতে পারেনি।
