নিজেদের কানগুলোকেই যে বিশ্বাস করতে সাহস হচ্ছে না!
আওয়াজের ভাষা কিছু বোঝা যাচ্ছে কি? ঘৃণা, অবজ্ঞা, বিদ্বেষ—তা-ই কি ফুটে উঠেছে ও-পদধ্বনিতে?
এই বর্বরধামে নেহাত বাধ্য হয়ে একবার আসার গ্লানিতে পা যেন ভারী হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে কি?
এ-পায়ের আওয়াজের গতি কোন দিকে? আমাদের ঘরের বারান্দার সামনে দিয়ে অবজ্ঞাভরে এ-ধ্বনি তেতলার সিঁড়ির দিকেই উঠে যাবে নিশ্চয়। তারপর সেখান থেকে হাঁক শোনা যাবে, বনোয়ারি! মালগুলো নামিয়ে নিয়ে যাও।
বনোয়ারি এখনও অনুপস্থিত। তার বদলে আমাদেরই যেতে হবে মাল নামিয়ে সাহায্য করতে।
ঘনাদাকে ধরে রাখবার মতো কোনও কিছু উপায় কি তখন হতে পারে? কিন্তু উপায় ভাবার দরকার হল না। আমাদের স্তম্ভিত নির্বাক করে ঘনাদা বৈঠকের ঘরেই এসে ঢুকলেন। আষাঢ়ের মেঘ নয়, একেবারে শরতের আকাশের মতো প্রসন্ন মুখে।
আরামকেদারাটা খালিই ছিল। আয়েস করে তাতে নিজেকে এলিয়ে দিয়ে আপনা থেকেই বললেন, কেটা পাঠিয়ে এলাম।
কী কেবল, কেন, কাকে, কিছুই না বুঝলেও কৃতার্থ হয়ে আমরা বললাম, ও, পাঠিয়ে দিলেন বুঝি?
ঘনাদার প্রসারিত তর্জনী ও মধ্যম অঙ্গুলির মধ্যে শিশির ইতিমধ্যেই ভক্তিভরে একটি সিগারেট স্থাপন করে লাইটার জ্বেলে সেটি ধরিয়ে দিয়েছে।
ঘনাদা তাতেনা, রামটান নয়—নে আদর করে একটু আলতো টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, হ্যাঁ, তখন কথায় কথায় পুরোনো স্মৃতি সব মনে পড়ে গেল কি না! অনেকদিন খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। তাই শুভেচ্ছা জানিয়ে কেল করলাম, পিড়ি ছেচল্লিশ আশা করি এখনও অগাধ, তোমার পেছনে লাগবার মতো তেলও কারুর আর এখনও হয়নি।
ঘনাদা নিজেই এবার হায়না-বিনিন্দিত হাসি একটু হাসলেন। সেই সঙ্গে মাথামুণ্ড কিছুই না বুঝে আমরাও। গৌরের মুখখানা দেখেই শুধু মনে হল তেতো মুখ নিয়ে মিষ্টি খাবার ভান করছে।
কিন্তু ঘনাদার এত ধোঁয়ার মধ্যে নিজেকে রাখা তো চলবে না।
শিশিরই একটু ধোঁয়া সরাবার চেষ্টা করলে। ঘনাদার রসিকতাটার উহ্য মানে যেন দারুণ রসিয়ে বুঝে হাসতে হাসতে বললে, কে পেয়ে খুব অবাক হবে, কী বলেন? বুঝতেই পারবে না মানে!
অন্য দিন হলে কাঁচা চালাকি ঘনাদা বরদাস্ত করতেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু আজ যেন তিনি অন্য মানুষ!
শিশিরের এ বেয়াদবি অনায়াসে মাফ করে বললেন, না, না, মানে বুঝবে না। কেন? ম্যাক অর্থাৎ পিটার ম্যাকডোনাল্ডের চেয়ে ও ঠারে-ঠাট্টার মানে আর বেশি কে বুঝবে! তবে হ্যাঁ, অবাক একটু হবে এতদিন বাদে আমার কে পেয়ে। আমাকে কম খোঁজাখুঁজি তো করেনি বছর দশেক ধরে।
আপনাকে এত খোঁজাখুঁজি কেন? শিবু সরলভাবে জিজ্ঞাসা করলে, ওই যা নিয়ে ঠারে-ঠাট্টা করেছেন সেই তেল দেবার জন্য!
না, তেল দেবার জন্য নয়।ঘনাদা শিবুর মতো সরলভাবে কথাটা নিয়ে বললেন, খুজছে কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ করবার জন্য। ম্যাকের বড় ইচ্ছে কুলোর কাছে তার একটা দ্বীপ আমায় দেয়। দেবার জন্য ঝুললাঝুলি করেছে। তাই তো পালিয়ে এসেছিলাম কিছু না বলে। আর আজকের কেল্ল-এও ঠিকানা জানাইনি।
একটা দ্বীপ আপনাকে একজন দিতে চায় আর আপনি তা নিতে চান না বলে ঠিকানা লুকিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন! পরম বিস্ময়ের ভান করে বললাম, কী রকম দ্বীপ সেটা? কত বড়?
তা নেহাতই ছোট।ঘনাদা যেন সত্যের খাতিরে জানালেন, লম্বায় মাইল চার আর চওড়ায় বড় জোড় মাইল দুই হবে।
এই মাত্র! শিবু অবজ্ঞাভরে হাসল, ওরকম দ্বীপ না নিয়ে ভালই করেছেন। সমুদ্রে ওই একটা পাথর কি বালির ফুটকি দিয়ে আবার কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ!
হ্যাঁ, দ্বীপটা পাথুরে বালির ফুটকিই বটে, ঘনাদা শিবুর মূঢ়তায় চোখে ক্ষমার দৃষ্টি এনে বললেন, কিন্তু ওইটি আর ওপাশের প্রায় ওরই যেন যমজ আরেকটি দ্বীপের লোভে এমন চক্রান্ত একজন করেছিল, শয়তানির দিক দিয়ে যার তুলনা মেলা ভার।
কেন? গৌর এতক্ষণে হাওয়া বুঝে মুখ খুললে, ওই একরত্তি দুটো দ্বীপে ছিল কী?
ছিল পাহাড়ি ঢিপির গায়ে গোরু ছাগলের কাছে উপাদেয় গিনি ঘাসের জঙ্গল, কিছু আধবুনো গোরু ছাগল আর দু-দ্বীপের চারিধারের সমুদ্রে প্রচুর নানা জাতের মাছ, যা শিকারের শখের দরুনই ম্যাক দ্বীপ দুটো কিনে প্রতি বছর শীতের দিনে বন্ধুবান্ধব নিয়ে এসে মাসখানেক কাটিয়ে যেত।
ঘনাদা দ্বীপের বর্ণনা একটু বিশদ করে একটা প্রশ্নের জন্যই আমাদের দিকে। তাকালেন, বুঝলাম। তাঁকে হতাশ করলাম না।
এই দ্বীপের জন্য শয়তানি চক্রান্ত! জিজ্ঞাসা করলাম যথারীতি চক্ষু বিস্ফারিত করে, কেন বলুন তো?
কেন, তা বোঝা দূরে থাক, চক্রান্তটাই গোড়াতে কেউ ধরতে পারেনি। ঘনাদা এবার গল্পের রাশ ছাড়লেন, নিউইয়র্কের ইয়াটস ক্লাবে সেদিন একটা পার্টিতে যেতে হয়েছিল।
এত হা-হুতাশের পর বরাত একটু ফিরতে না ফিরতেই বুঝি আবার সব ভেস্তে যায়। নিউইয়র্ক ইয়াটস ক্লাব শুনেই আমাদের গলায় একটা খুকখুকে কাশি এমন চাড়া দিয়ে উঠল যে চাপাই দুষ্কর। ওই ক্লাবটির বাছবিচার এমন কড়া বলে শুনেছি যে গণ্যমান্যরাও নিমন্ত্রণ পেলে ধন্য হন। আর ঘনাদা যেন রাসের মেলায় যাচ্ছেন এমনইভাবে তুড়ি দিয়েই তার পার্টিতে চলে গেলেন!
আমাদের গলাগুলো যত অবাধ্যই হোক, ঘনাদা এখন একেবারে হাঁচিকাশি-ফ! সবকিছু অগ্রাহ্য করেই বলে চললেন, পার্টিতে হঠাৎ ম্যাকের সঙ্গে দেখা। একটি কোণে বেশ দশাসই চেহারার জয়টাকের মতো গোল, আর টোম্যাটোর মতো লালমুখো একটি লোকের সঙ্গে যেন লুকিয়ে বসে আছে।
