এ হেন অমূল্য জিনিস নষ্ট হওয়ায় রাগে দুঃখে গৌর প্রায় ক্ষিপ্ত হয়েই ঘনাদার দরজায় গিয়ে হাজির হয়েছে তখন। সঙ্গে সঙ্গে আমরা। আমাদের কাউকেই কিন্তু চৌকাঠটাও পার হতে হয়নি।
ঘনাদার সাজগোজ এরই মধ্যে হয়ে গেছে। তাঁর খুদে প্লাস্টিকের চিরুনিতে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে তিনি বলেছেন, এসো! এসো! আমি-ই তোমাদের ডাকব ভাবছিলাম।
আমাদেরই ডাকবেন ভাবছিলেন! আমাদের কাকে? গৌরের গলা শুনেই তার মেজাজ বুঝতে দেরি হবার কথা নয়। কথাগুলো যেন গায়ে ছ্যাঁকা দিচ্ছে।
ঘনাদা কিন্তু কিছু যেন টেরই পাননি। প্রসন্ন মুখে বলেছেন, হ্যাঁ, বাথরুমে ওই বিতিকিচ্ছি তেলটা কে রেখেছে তা-ই জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম।
তা-ই জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলেন? ওটা আপনার কাছে বিতিকিচ্ছি তেল? গৌর প্রায় তোতলা হয়ে গেছে।
বিতিকিচ্ছি আর কাকে বলে! ঘনাদা ঘেন্নায় নাক কুঁচকেছেন, গন্ধটা দেখোনা! এখনও যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছে। মাথায় ভাল তেলের গন্ধ নিজে ছাড়া
আর কেউ পাবে কেন?
যুক্তিটা অস্বীকার করবার নয়, গৌর তাই আরও চটে উঠে বলেছে, তা ওই বিতিকিচ্ছি তেল আপনার মাখবার কী দরকার ছিল, আর…
ঠিক বলেছ। গৌরকে সমর্থন করেই ঘনাদা অত্যন্ত চিন্তিত মুখে বলেছেন, পরীক্ষা করতে মাথায় একটু দেওয়া খুব ভুল হয়েছে। যা চটচট করছে, ভয় হচ্ছে শেষে টাক না পড়তে শুরু করে।
ওই তেল মেখে আপনার মাথায় টাক পড়বে! গৌরের ফেটে পড়তে আর দেরি নেই।
ওরকম আজেবাজে তেল মাখলে পড়ে যে? ঘনাদা দুঃখের মধ্যে যেন সান্ত্বনা খুঁজে পেয়ে বলেছেন, তবে অন্য কারুর আর টাক পড়বার ভয় নেই।
কেন? এবার আমাদেরই জিজ্ঞাসা করতে হয়েছে সবিস্ময়ে।
বেকায়দায় হাত লেগে শিশিটা শেষকালে পড়ে গেছে!ঘনাদা যেন শুভ সংবাদ শুনিয়েছেন সব তেল গড়িয়ে পড়ে গিয়ে আপদ চুকে গেছে।
আপদ চুকে গেছে! এইবার গৌর বিস্ফোরিত হয়েছে, কী আপদ আপনি। চুকিয়েছেন জানেন? আপদ যাকে বলছেন জানেন তার নাম? জানেন ওই একটি শিশি মাথার তেল জোগাড় করতে কী তপস্যা আমায় করতে হয়েছে…
কখনও হুংকারে কখনও হাহাকারে গৌর কী যে তখন বলে গেছে ভাল করে শুনিওনি। কোনওরকমে গৌরকে থামিয়ে ঘর থেকে বার করে নিয়ে গিয়ে ভরাড়ুৰি আমরা বাঁচাতে চেয়েছি। কখনও ধমকে কখনও অনুরোধে গৌরকে টেনে বাইরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে বলেছি, তুই কি সত্যি পাগল হয়ে গেলি একটা তেলের শোকে! তোর ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী গেছে, তার বদলে বৃহৎ টাকান্তক গজসিংহ পেয়ে যাবি। ঘনাদাই সে তেল তোকে পাইয়ে দেবেন! ।
না। সন্ত্রস্ত হয়ে আমরা ফিরে তাকিয়ে দেখেছি। মেঘের গর্জন নয়, ঘনাদারই গলা থেকে বেরুচ্ছে—তেল আমি কাউকে দিই না। তেল বেশি হলে বার করে দিই দাওয়াই দিয়ে। সেবার যেমন বার করে দিয়েছিলাম কুলোর কাছে। দশ হাজার টন তেল!
অ্যাঁ! আমাদের সকলের মুখই হাঁ।
সেই সঙ্গে বুকের ভেতরকার ভয়ের গুড়গুড়ানিটা আশার কাঁপুনি দুলুনি হবার উপক্রম।
এ তো গুঁড়ো করতে করতে মাথা বাঁচিয়ে পায়ের কাছে সোনার চুড়ো ভেঙে পড়া।
যে যার জায়গা নিয়ে বসে পড়লেই হয়।
কিন্তু সে আশায় ছাই পড়েছে।
এরকম একটা কিছু হবে জেনেই কি না বলতে পারি না, ঘনাদা আগে থেকেই সেজেগুজে ছিলেন। শেষ ধাঁধাটি ছেড়ে চিরুনিটা পকেটে আর দেয়ালের পাশ থেকে ছড়িটা হাতে নিয়ে তিনি কোনও দিকে না চেয়ে খটখট করে বেরিয়ে গেছেন।
আমরা হতাশ হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে, এবার গায়ের সমস্ত ঝাল ঝেড়েছি গৌরের ওপর!
সে অবশ্য নিজেই তখন থেকে অনুতাপে আধ-পোড়া।
নেহাত দিতে হয়, তাই দুপুরে ক-গ্রাস মুখে দিয়ে সবাই বসবার ঘরে এসে জমায়েত হয়ে সেই থেকে হা-হুতাশ করছি।
এবারে ফাঁড়া কাটবার কোনও উপায়ই যে নেই সে বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহ। ভেবেচিন্তে কেউ একটা আজগুবি ফন্দিও বাতলাতে পারেনি।
বাতলালেই বা হবে কী? ঘনাদা-ই নেই, তা ফন্দি খাটাব কার ওপর?
ঘনাদা সেই যে বেরিয়েছেন আর ফিরবেন বলেই মনে হয় না। সত্যিকার অগস্ত্যযাত্রাই হয়তো করেছেন। সেই সেবারে এভারেস্টের চুড়োয় টুপি নিয়ে টিটকিরির পর যেমন তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন।
সেবার তবু শেষ পর্যন্ত অনেক দিন বাদে আমাদের মনে মনে নাকমলা কানমলা খাইয়ে ফিরে এসেছিলেন। তার কোনও আশাই নেই এবার।
অথচ আজ মাসের দ্বিতীয় শনিবার ছুটির দিনে সন্ধে থেকে আসর জমাবার কী চুটিয়ে বন্দোবস্তই না করা গেছল?
বিকেল থেকে ভাজাভুজি ডালমুট পাঁপরের ব্যবস্থা তো করাই হয়েছে, তার ওপর বনোয়ারিকে যে ধান্দায় পাঠানো হয়েছে তা সফল হলে, মোক্ষম একটি টোপ ঘনাদার সামনে ধরা হবে বলে ঠিক হয়ে আছে।
টোপটি হল ঘনাদার পরম লোভনীয় তপসে মাছ। এই দর্মল্যের বাজারেও কদিন ধরে বৌবাজার শিয়ালদা শ্যামবাজার ঘোরাঘুরি করেছি। মনের মতো তপসে কোথাও পাওয়া যায়নি।
তপসে যা উঠেছে তা বাজার পর্যন্ত পৌঁছোতেই পারছে না হয়তো, কিংবা ঘেরাও-র ভয়ে ইলিশের সঙ্গে যুক্তি করে তারাও কলকাতার গঙ্গা বয়কট করেছে।
বনোয়ারিকে তাই কলকাতা ছাড়িয়ে একেবারে রায়গঞ্জে পাঠিয়ে দিয়েছি সকালেই। সেখান থেকে কলকাতার কাড়াকাড়ির আগেই যদি আনতে পারে।
কিন্তু এখন আনলেই বা আর লাভ কী! সে তপসে আর আমাদের মুখে রুচবে।
কিন্তু ও কী?
আমরা সবাই উৎকর্ণ হয়ে উঠি একসঙ্গে। নীচের সিড়িতে কার যেন পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না? আওয়াজ কি আমাদের চেনা?
