সবে সেদিন সকালবেলা সেই ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী আধারটি এনে স্নানের ঘরে রেখে সে বাইরে শুকোতে দেওয়া পরিষ্কার কাচা ভোয়ালেটা আনতে গেছল।
এরই মধ্যে স্নানের ঘরে ঢুকে কে দরজা বন্ধ করেছে। কে ঢুকেছে, কে? আর কে, স্বয়ং ঘনাদা।
এত সাত সকালে তাঁর স্নানের কী এমন গরজ পড়ল? নীচে আমাদের পাঁচকঠাকুর রামভুজের কাছে রান্না প্রায় শেষ হবার খবর না নিয়ে তিনি তো স্নান করতে নামেন না।
তা ঠিক, তবে আজ তাঁর জরুরি দরকার পড়েছে।
আচ্ছা তা-ই মানা গেল। কিন্তু অন্যদিন যেখানে পাঁচ মিনিটে তাঁর স্নান সারা হয়ে যায়, সেখানে আজ প্রায় পুরো একটি ঘন্টা লাগাবার মানে কী?
তাও ঘণ্টা পার করছেন করুন, কিন্তু দরজা খুলে বার হবার সঙ্গে সঙ্গে একী সৌরভে দশদিক আমোদিত!
এ তো সেই ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণীই মনে হচ্ছে।
গৌর ব্যস্ত হয়ে স্নানের ঘরে ঢুকেছে।
তারপর বনমালি নস্কর লেন থেকে বোধহয় উত্তরে বরানগর আর দক্ষিণে বড়িশা পর্যন্ত তার আর্তনাদ শোনা গেছে।
কী ব্যাপার, কী! এক ঘনাদা বাদে আমরা যে যেখানে ছিলাম শশব্যস্ত হয়ে ছুটে গেছি। এই বুকফাটা চিৎকার গৌর ছাড়ল কোন দারুণ দুঃখে।
আর কোন দুঃখে! সেই ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণীর শোকেই এ হাহাকার।
কী হল সেই ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণীর?
ঘনাদা পরমানন্দে তার সদ্ব্যবহার করেছেন। তা করেছেন বেশ করেছেন। কিন্তু স্নানের ঘরের মেঝেতে ব্যবহারের পর অবশিষ্টটুকু এমনই করে ছড়িয়ে নষ্ট করতে হয়?
সব কিছুতেই তো পরস্মৈপদী, তবু পরের জিনিস ব্যবহার করতে একটু সাবধান হতে নেই? আর জিনিস বলে জিনিস। ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী।
গৌর আর এক মুহূর্ত স্নানের ঘরে দাঁড়ায়নি।
সে যে আর আমাদের গৌর নয়, বিগড়ি হাঁসে যে আমাদের অরুচি ধরিয়ে গেছে সেই দ্বিতীয় বাপি দত্ত হয়ে সিঁড়ি কাঁপিয়ে তেতলায় উঠেছে। আমরাও তার পিছু পিছু তাকে অনুনয় বিনয় করেছি রোখবার চেষ্টায়।
শোন, গৌর শোন!
অত অস্থির হোসনি! গৌরকে প্রায় শারীরিক বলে থামাতে হয়েছে।
অস্থির হব না? গৌর দোতলার বারান্দার কাছে ফিরে দাঁড়িয়ে খিঁচিয়ে উঠেছে, কত বড় অন্যায় উনি করেছেন তা বুঝেছ?
আহা তা তো বুঝছিই! আমরা প্রায় একবাক্যে বলেছি, কিন্তু তোর সেই ধন্বন্তরী কবিরাজ তো তোকে তাঁর শেষ কীর্তি গছিয়েই ফেরারি হননি। তাঁকে দিয়ে আর একটা তৈরি করে নিলেই হবে।
তৈরি করে নিলেই হবে! তার পরম ভক্তিভাজন কবিরাজকে মুখ ফসকে একটু তুচ্ছ করায় দ্বিগুণ চটে গৌর বলেছে, এ তোমার অ্যালোপ্যাথি পেটেন্ট ওষুধ পেয়েছ! গলাকাটা দাম দিলে যখন খুশি কিনতে পারো। এ-জিনিসের এমন সব অনুপান আছে যা বছরের সব সময়ে পাওয়াই যায় না।
বলতে গিয়ে যেন নতুন করে শোক উথলে উঠেছে গৌরের, আর সেই সঙ্গে রাগ।
এবার আর তাকে রোখা যায়নি।
গৌর আর তার পিছু পিছু আমরা তেতলার টঙের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াবার পর যা হয়েছে তা শোনবার আগে গৌরের রাগের রহস্যটা একটু বোধ হয় খোলসা করে দেওয়া উচিত।
ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণীই যে সবকিছুর মূল তা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বোঝা গেছে। এখন এই বস্তুটি কী জানলেই সব ধাঁধা আপনা থেকেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।
ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী শুনে ভড়কে যাওয়ার কথা। গৌর প্রথম আমাদেরও বেশ ভড়কে দিয়েছিল।
গৌরের জন্য আমরা সবাই তখন রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছি। কলির চরক না সুশ্রুত কাকে খুঁজে বার করে ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণীর মতো দাওয়াই আনবার মতো কী হয়েছে গৌরের?
লিগের গোড়ায় মোহনবাগানের একটু বরাত ভাল থাকার দরুন বাইরে থেকে তো চেকনাই-ই দেখা গেছে তার চেহারায়।
তা সত্ত্বেও কী যে হয়েছে ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী নামটার অর্থ জানবার পর বোঝ গেছল।
ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী হল স্রেফ টাকের ওষুধ, মানে টাকপড়া বন্ধ করার ভরসা দেওয়া কবিরাজি মাথার তেল।
কিন্তু তোর টাকের ওষুধ কী দরকার? জিজ্ঞেস করেছিলাম আমরা, মাথায় তো পরচুলা নয় ওগুলো।
টাক নেই, কিন্তু হতে কতক্ষণ! গৌর তার যুক্তি দেখিয়েছিল, প্রত্যেক দিন চুল আঁচড়াতে কতগুলো করে চুল উঠছে জানিস?
জানব না কেন, শিবু তাচ্ছিল্যভরে বলেছিল, ও তো সকলেরই ওঠে! বিশেষ বর্ষাকালে।
হ্যাঁ, ওঠে। গৌর মুখটা করুণ করে বলেছিল, কিন্তু কেউ তবু সাবধান কি হয়? তাই জন্যই তো দুনিয়ায় টাক এত বেড়ে যাচ্ছে। কবিরাজমশাই বলেছেন, স্নানের পর মাথা আঁচড়াবার সময় চিরুনিতে রোজ কতগুলো করে চুল ওঠে গুণতে। তুই তাই গুণিস নাকি? আমরা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
তা না গুণলে চলবে কেন। গৌর কর্তব্যনিষ্ঠা দেখিয়েছিল, এই আজই তো উঠেছে সতেরোটা। কাল উঠেছিল বারোটা। কবিরাজমশাই তাই বলেছেন— এরকমভাবে গুণলেই বোঝা যাবে মাথার চুল শেষ হতে আর কতদিন।
কিন্তু চুল উঠছে যেমন, তেমনই গজাচ্ছেও তো! আমরা তাকে আশ্বাস দেবার চেষ্টা করেছিলাম।
কিন্তু ফল কিছু হয়নি।
এ তো আর গাছের পাতা নয়,দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে কবিরাজমশাই-এর যুক্তিটাই গৌর আমাদের শোনাচ্ছে মনে হয়েছিল, যে যত ঝরবে তত গজাবে। মানুষের মাথায় যত ঝরে তত আর ঝরে না যদি না ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণীর মতো তেল থাকে সার দিতে।
একথা শোনবার পর গৌরকে কোনও যুক্তি শোনানো বৃথা বুঝেই সে চেষ্টা আর করিনি।
কিন্তু এই ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী অমন বিপদ ঘনিয়ে তুলবে আমাদের ভাগ্যে তা-ও পারিনি ভাবতে।
