এরপর তিক্ত মন্তব্যটুকুও নিশ্চয় থাকবে—অর্বাচীন অপদার্থ কয়েকটি কাণ্ডজ্ঞানহীন যুবকের অবিমৃষ্যকারিতাতেই শ্রীঘনশ্যাম দাস এ বাসস্থান ও তার সঙ্গে জড়িত দুর্জন সংসর্গ বর্জন করতে বাধ্য হন।
শুধু ইতিহাসে কেন?
রাস্তার ধারে বাহাত্তর নম্বরে ঢোকবার দরজাতেই একটা শিলালিপি মানে প্রস্তরফলকও কি থাকবে না?
তাতে কী লেখা থাকবে? ও কী হরফে?
তর্কটা তুমুল হয়ে উঠেছে প্রথমে শুধু হরফ নিয়েই।
ভেতরের রাগ দুঃখ হতাশার জন্য উত্তেজিত আঘাত প্রতিঘাতগুলোও একটু বেশি কড়া হয়ে গেছে।
প্রথমত শিলালিপিতে কোন হরফের লেখা থাকবে সে বিষয়ে কিছুতেই একমত হওয়া যায়নি।
শিশির বলেছে, হরফ আবার কী হবে? সোজা বাংলা।
কখনও না, প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়েছি আমি, বাংলা কখনও শিলালিপি হয়! মন্দির-টন্দিরের উঠোনে চাতালে মার্বেল পাথরের নাম লেখা যেমন টালি বসানো থাকে এ কি তেমনই খেলো ব্যাপার নাকি?
তা হলে কী হরফে লেখা থাকবে শুনি! শিশিরের বেশ বাঁকা জিজ্ঞাসা, মিশরীয় না সুমেরীয়?
মিশরীয় সুমেরীয় হবে কেন? আমি ভাবালু গলায় দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছি, থাকবে দেবনাগরীতে, রাষ্ট্রভাষার যা হরফ, তাইতে।
রাষ্ট্রভাষার হরফে থাকবে! শিবু তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে, তা হলে বিকল্পে ইংরেজির রোমান হরফেই বা থাকবে না কেন! অন্য বারোটা ভাষার হরফের দাবিও মানতে হবে।
তার চেয়ে সব গোল তো অনায়াসেই চুকিয়ে দেওয়া যায়। আমি এই গুরুতর পরিস্থিতিতে ঝগড়াঝাটি মিটিয়ে ফেলার চেষ্টাই করেছি, হরফ হবে অশোকের অনুশাসনের, অর্থাৎ ব্রাহ্মীলিপিতে।
ব্রাহ্মীলিপিতে! শিবু মানতে চায়নি এ-সহজ মীমাংসা, ও-লিপি কে পড়বে শুনি?
তার জন্যই তো বললাম, শিলালিপির অক্ষর হবে বাংলা, শিশির আবার তার দাবি জোরদার করবার সুবিধে পেয়েছে, সবাই গড়গড় করে যাতে পড়তে পারে।
কিন্তু পড়বেটা কী? আমার অমন ভাল পরামর্শটা নাকচ করায় একটু ক্ষুণ্ণ না হয়ে পারিনি, শিলালিপিতে কী লেখা থাকবে তা জানো?।
তা আর জানি না! শিশির মুরুব্বিয়ানার ভঙ্গিতে বলেছে, লেখা থাকবে, শ্রীঘনশ্যাম দাস, তার নীচে ব্র্যাকেটে, ঘনাদা। তার তলায় দু-লাইন থাকবে পর পর। প্রথম লাইন থাকবে, এখানে ছিলেন, নীচের লাইনে থাকবে, এখন নেই।
শুধু এই? শিবুর গলায় দুঃখ আর রাগ একসঙ্গে উথলে উঠেছে, কেন তিনি নেই, তার কিছু থাকবে না! আর অত সংক্ষেপেই বা সারা হবে কার খাতির রাখতে?
শিবু একটু থেমে, মুখ ভেংচেই আবার বলেছে, এখানে ছিলেন। এখন নেই। শুধু ওইটুকু কেন? বেশ সবিস্তারে সমস্ত ভাবীকালে পৃথিবীর উনিশশো সাতষট্টির হতাশ বেদনা পৌঁছে দিতে হবে না?
কী করে! প্রশ্নটা শিশিরের অবশ্য। সুরটা একটু বাঁকা।
শিবু গ্রাহ্য না করে বলেছে, এই এমনই ভাবে : প্রথমেই থাকবে একটা সম্বোধন—হে ভাবীকালের সুখী নাগরিক! এখানে একটু দাঁড়াও।
তার বদলে যা থেকে টুকলিফাই করছিস সেই আসল কবিতাটাই দিতে আপত্তি কীসের? একটু স্পষ্ট কথা না শুনিয়ে পারিনি, লিখলেই তো হয়, দাঁড়াও পথিকবর জন্ম যদি তব বঙ্গে।
ধরা পড়েও শিবু ভড়কায়নি, বলেছে, ওকবিতার লাইনে যে আর এখন কুলোয় । শুধু বঙ্গ তো নয়, এখন যে সম্বোধনটা বিশ্বে ছড়ানো। তাই লেখা থাকবে, হে ভাবীকালের সুখী নাগরিক! এখানে একটু দাঁড়াও। দাঁড়ালে বাতাসে একটা দীর্ঘশ্বাস নিশ্চয় শুনতে পাবে, একটু কান পাতলে পৃথিবীর বুকেরই যেন হতাশ ধুকধুকুনি।
আর সেই সঙ্গে ক-টা আহাম্মকের গা-জ্বালানো বকবকানি!
অ্যাঁ!
আমাদের সকলের চমকিত দৃষ্টি এক জায়গাতেই গিয়ে স্থির হল। শ্রীমান গৌর সেখানে গোমড়া মুখ করে বসে আছে। এই খেঁকিয়ে ওঠা মন্তব্য তো তারই। কিন্তু তা-ও কি সম্ভব?
বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের সঙ্গে যৎসামান্য পরিচয় যাদের আছে, তারাও অবাক হয়েছে নিশ্চয়। এতক্ষণের আলোচনায় গৌরের নাম একবারও উল্লেখ করা হয়নি দেখে গৌর এ সমাবেশে অনুপস্থিত বলে ধরে নেওয়াই তাদের পক্ষে স্বাভাবিক। আসরে থেকেও গৌর একেবারে নীরব, এমন ব্যাপার বিশ্বাস করা একটু শক্ত।
কিন্তু সেই অবিশ্বাস্য ব্যাপারই ঘটেছে। আর তার কারণ আছে সবিশেষে।
কারণটা সত্যিই গুরুতর।
আর গুরুতর বলেই গৌর একেবারে মরমে মরে গিয়ে আমাদের এত হুঙ্কার হাহাকারে মধ্যে এতক্ষণে একবার টু শব্দটি করেনি।
শেষটা অসহ্য হওয়াতেই বোধ হয় একটিবার শুধু চিড়বিড়িয়ে উঠেছে।
ওই একবার খেকিয়ে ওঠার পরেই সে কিন্তু আবার ঠাণ্ডা।
তা ঠাণ্ডা হবে না তো গরম হবে কোন মুখে!
সব নষ্টের মূল যে ওই গৌর! ওর বেয়াড়া বেয়াদপির জন্যই তো আজ বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের এমন বারোটা বাজতে চলেছে।
ওর পক্ষেও একটু বলবার কথা আছে বটে। ওর মেজাজ বিগড়ে যাবার কারণ একেবারে ছিল না তা নয়। দিনের পর দিন সত্যিই কম কষ্ট তো গৌর করেনি, ওই একটি সাত রাজার ধন মহামূল্য জিনিস জোগাড় করতে।
কার কাছে যেন প্রথমে সেই অসাধারণ কবিরাজের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করেছিল যিনি ধন্বন্তরী হয়েও এ-যুগে এই কলকাতা শহরে একেবারে অজ্ঞাতবাস করছেন।
গোটা একটা বিকেল হাঁটাহাঁটি করে ট্যাংরা না তিলজলার কোথায় একটা নাম-ভুলে যাওয়া গলির মধ্যে সেই কবিরাজকে খুঁজে বার করেছে। তারপর ট্যাঁক থেকে থেকে বেশ কিছু খসিয়ে কবিরাজকে দিয়ে শুধু তারই জন্য বিশেষ করে সেই অব্যর্থ মহৌষধটি তৈরি করিয়েছে, যার নাম ইন্দ্রলুপ্ত নিবারণী।
