ঘটেছে নিশ্চয়, শিবু জোর দিয়ে বললে, আর যা ঘটে তার সব কি আমাদের জানা সম্ভব? আমাদের পৃথিবীর সৌরমণ্ডল যে গ্যালাক্সির ছায়াপথে আমরা আছি, আমরা তার কী দীনহীন একটা সদস্য তা জানো? জানো আমাদের এই ছায়াপথের প্রায় কিনারায় কেন্দ্র থেকে কতদূরে আমাদের সৌরমণ্ডল পড়ে আছে—তুমি জানো?
শিবুকে খোঁচা দেবার ছল করে আড়চোখে যাঁর দিকে একবার চেয়ে দেখলাম তাঁর কিন্তু কোনও সাড়াশব্দই নেই! এক পেয়ালা শেষ করে টী-পট থেকে আর-এক পেয়ালা চা ঢেলে নিয়ে হাতের খবরের কাগজটাতেই যেন তন্ময় হয়ে আছেন। এমনই করে সাজিয়ে তোলা চালগুলো কি তাহলে ভেস্তেই গেল!
ওদিকে শিবু আবার তার নিজের ফাঁদেই না পা জড়িয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। ছায়াপথের কোন দূর কিনারায় আমাদের সৌরমণ্ডলের হেলায় ফেলায় পড়ে থাকার কী সব আঁকজোকের কথা বলছিল তা শেষ পর্যন্ত সামলাতে পারবে?
তা পারল শিবু। বেশ একটু মাতব্বরি চালেই বললে, আমাদের এই ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে আমরা যত দূরে আছি তার সেকেন্ডে যে আলোর গতি এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল সেই আলোর সমান বেগে ছুটতে পারলেও আমাদের ত্রিশ হাজার বছর লেগে যাবে। এই দূরত্ব থেকে যে বিশালতার আন্দাজ পাওয়া যাচ্ছে তার মধ্যে যা কিছু হচ্ছে তা আমরা জানব কী করে? তোমরা বলবে যে সেই মহাভারতের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি ছিয়াত্তর বছর পরে পরে কতবার হ্যালির ধূমকেতু ঘুরে গেছে। কম-বেশি সেই পাঁচ হাজার বছরে তার গতিবিধির কোনও এদিক ওদিক হয়েছে কি? হ্যাঁ, মানছি যে সামান্য কিছু গতিবিধির অদলবদল যদি হয়েও থাকে তা ঠিক ধর্তব্যের মধ্যে নয়। কিন্তু আমাদের কাছে অনেক মনে হলেও যে সময়টার অল্পবিস্তর সঠিক খবর আমরা পাচ্ছি তাই মাত্র পাঁচ হাজার বছর। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কাণ্ড কারখানায় পাঁচ হাজার বছর কি একটা হিসেবে ধরবার মতো সময়? আমাদের এই গোটা ছায়াপথ গ্যালাক্সি চরকির মতো অনবরত পাক খাচ্ছে তা জানো বোধ হয়। একটা পাক পুরো করতে তার কত সময় লাগে ভাবতে পারো? লাগে—লাগে–এই আন্দাজ—দশ—দশ—
শিবুর তোতলামির মাঝখানে হঠাৎ আড্ডাঘরটা কাঁপিয়ে বাজখাঁই গলায় ধমক শোনা গেল—না। কুড়ি কোটি বছর!
হ্যাঁ, বারুদের পলতেটা ঠিকই ধরেছে শেষ পর্যন্ত। ঘরের ছাদ কাঁপানো গলার ধমকটা আর কারও নয়, মৌরসি কেদারার সেই একমেবাদ্বিতীয়, তাঁরই। তিনিই আগের শেষ করা পেয়ালাটা সামনের টী-পট-এ নামিয়ে রেখে বললেন, হ্যাঁ, আমাদের ছায়াপথের একবার পুরোপুরি পাক খেতে লাগে পাক্কা কুড়ি কোটি বছর। আর আমাদের এই ছায়াপথ গ্যালাক্সির বয়স হল বারো শো থেকে দু হাজার কোটি বছর। হ্যালির ধূমকেতুর খবর যখন থেকে অল্পবিস্তর পেতে শুরু করেছি সেই পাঁচ হাজার বছর ওই অশেষ যুগযুগান্তের কাছে তো চোখের একটা পলকের বেশি নয়। সৃষ্টি থেকে আজ পর্যন্ত এ ধূমকেতুর অনেক চাল-বেচাল হয়েছে ভাবলে তাই ভুল কিছু হবে না। তারপর মাত্র পাঁচ হাজার বছর সুশীল সুবোধ থেকে এবারই তার হঠাৎ বিগড়ে গিয়ে কিছু বেচাল দেখানো তাই মোটেই অসম্ভব নয়। কিন্তু বেচালটা তার কী ধরনের হতে পারে, আর কেন, সেইটেই ভাববার!
ঘনাদা থামলেন। শিশিরও প্রস্তুত। ঘনাদার কথা শেষ হতে না হতেই তার নতুন। সিগারেটের টিন খোলার মৃদু শিসের আওয়াজ শোনা গেল। তারপর ঘনাদা তা থেকে সিগারেট তুলে মুখে ঠোঁটের ফাঁকে বসাতে না বসাতেই শিশিরের লাইটার জ্বালার মৃদু শব্দ শোনা যায় কানে।
সিগারেট ধরিয়ে ঘনাদা হালকা থেকে শুরু করে গোটা তিনেক রাম টান দিয়ে এক কুণ্ডলী ধোঁয়া না ছাড়া পর্যন্ত আমরা অধীর আগ্রহে খানিক চুপ করে থেকে ছেড়ে দেওয়া খেইটা একটু ধরিয়ে দেবার চেষ্টায় দ্বিধাভরে বললাম, হ্যালির ধূমকেতুর বেচাল তাহলে এবার সত্যি হতে পারে? তা বেচালটা কীরকম?
কথা শেষ হতে না হতেই ঘনাদার ধমক—কীরকম হতে পারে আর কেন তা নিজেরাই একটু ভেবে বলো না।
নিজেরাই ভেবে দেখব? চালের ভুলে শেষ কিস্তিটাই কাঁচিয়ে দিলাম নাকি? ঘনাদা কি চটেছেন নাকি?
না, গলাটা কড়া হলেও ঘনাদা বেশ তৃপ্তিভরেই সিগারেটে সুখটান দিলেন। দরকার এখন তাঁকে একটু তোয়াজ করা। তাই করলাম।
বোকা সেজে বললাম, বেচাল কী আর কেন হতে পারে, বলব? বেচাল হবে আমাদের গ্যালাক্সির ওই যে বলেছেন ত্রিশ হাজার আলোকবর্ষ দূরের কেন্দ্র সেখানে কোথাও কোনও সুপার-নোভা নক্ষত্রের বিস্ফোরণের দরুন আর তার ধাক্কায় হ্যালির ধূমকেতু এবার সূর্যকে পাক দেওয়ার বদলে হয় তার ভেতর মরণ ঝাঁপ দেবে কিংবা কোনওরকমে মান বাঁচিয়ে খসে যাওয়া লেজটা শুধু রেখে পালাবে।
লেজটা তোমার জন্যেই রেখে যাবে, আমার বাড়িয়ে দেওয়া চালটা শিশির উচিত মতোই চড়াতে ভুল না করে বললে, সুপারনোভা অমন অনেকে ফেটেছে আমাদের গ্যালাক্সিতে গত হাজার বছরে, তার জন্য অবশ্য হ্যালির ধূমকেতুর কোনও বেচাল আজ পর্যন্ত হয়েছে বলে জানি না। না, ঘনাদা আপনি বলুন, কী বেচাল দেখব এবার হ্যালির ধূমকেতুর কী বেচাল দেখব তা কেউই ঠিক করে বলতে পারে না, তবে— ঘনাদা যেন সুদূর মহাশূন্যেই নিজেকে চালান করে দিয়ে বললেন, তবে হয়তো-হতে-পারে এমন সব কিছু ব্যাপার অনুমান করতে পারি। তার যা এবার হতে পারে বা হতে যাচ্ছে। আমাদের নিজেদেরই কর্মফল। হ্যাঁ, ফ্রেঞ্চ গায়নার কোস্ট থেকে ছোঁড়া গিয়োত্তো হয়তো তাকে যা হুকুম তার চেয়ে আলাদা বেশি কিছু করবে। হয়তো তার গণকযন্ত্র ভুল করে বসবে, আর সেই ভুলের দরুন হ্যালির ধূমকেতু থেকে এক হাজার কিলোমিটার দূর থেকে তার খবর নেবার বদলে সে ধূমকেতুর মাথায় ঝাঁপিয়ে টু মেরে বসবে, আর তাতে যা হবে সেইটেই আশ্চর্য অবিশ্বাস্য ব্যাপার। গিয়োত্তোর গুঁতোয় ধূমকেতুর মাথা কিংবা লেজ থেকে যা বেরিয়ে আসবে সেইটেই সাত রাজার ধন মানিকের চেয়ে অবাক করা এক বস্তু। পৃথিবী থেকে লক্ষ রাখা দূরবিনে সে বস্তুর দেখা পাওয়া মাত্র পৃথিবীর দুই মহাশক্তির কেউ হয় ফেরি-রকেট চ্যালেঞ্জারে, নয় অন্য কোনও মহাকাশযানে তাকে উদ্ধার করে আনবে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু উদ্ধার করার পর সমস্ত পৃথিবীর বিস্ময়ের আর সীমা থাকবে না—জিনিসটা কী তা বুঝতে পারার পর। জিনিসটা একটা অসাধারণ টি ভি ক্যামেরা যা হ্যালির ধূমকেতুর ভেতরে গাঁথা হয়ে থেকে আগাগোড়া তার ছিয়াত্তর বছরের মহাকাশ পরিক্রমার সব বিবরণ ধরে রেখেছে। পৃথিবীর মানুষেরা এরকম একটা যন্ত্র হ্যালির ধূমকেতুর ভেতরে গেঁথে তার ছিয়াত্তর বছরের পাড়ির সব বৃত্তান্ত ধরে রেখে সংগ্রহ করার কথা ভাবছিল। সে চেষ্টা তাদের আর করতে হল না।
