কিন্তু খবর কি সত্যিই পাঠাতে পারবে গিয়োত্তো?
যদি পারেও তাহলে কেমন আর কী হবে সে খবর?
কী বলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধুরন্ধরেরা? কী বলেন আপনাদের টঙের ঘরের তিনি?
এ পর্যন্ত যা লেখা হয়েছে তা পড়ে যাঁরা ওয়াকিবহাল তাঁরা নিশ্চয়ই বুঝেছেন যে রণং দেহি চ্যালেঞ্জটা সেই মৌ-কা-সা-বি-স-এর।
কিন্তু এ চ্যালেঞ্জের জবাব কেমন করে দেওয়া যাবে? টঙের ঘরের তাঁকেও আসরে নামানো যাবে কী করে?
নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করে কোনও রাস্তাই যখন ঠিক করতে পারছি না তখন নিজেদের মধ্যে ঝগড়া দিয়েই আসরটা জমানো যায় কি না সে চেষ্টার কথা ভাবা হল।
হ্যাঁ, সোজাসুজি ঝগড়া। হ্যালির ধূমকেতু নিয়ে প্রায় হাতাহাতির অবস্থা পাকিয়ে তুলতে হবে।
ছিয়াত্তর বছর অন্তর দেখা দেওয়া ধূমকেতু এবার কী করবেন তাই নিয়ে যার যার নিজের কল্পনার লড়াই।
সুবিধে হয়ে গেল সকালের রেডিয়ো মারফত খবরটা শোনায়। তারিখ ২৭শে নভেম্বর। হ্যালির ধূমকেতু আজই নাকি আমাদের দেশের আকাশে দেখা দিচ্ছেন। তবে খালি চোখে নয়, তাঁকে দেখতে হলে দূরবিন জোগাড় করতে হবে।
খবরটা ২৭ শে সকালে পেলেও দূরবিনে দেখার মতো হ্যালির ধূমকেতুর আবির্ভাব নাকি হয়েছে ২১শে নভেম্বর সূর্যাস্তের পর।
বিশ্বাস করি না—
সমস্ত আড্ডাঘর এক মুহূর্তে চমকে একেবারে স্তব্ধ করে দেওয়া এ কার গলা? আর কারও নয়, আমাদের শিবুরই।
গুরু নানকের জন্মদিন বলে ছুটি থাকায় সকালেই সবাই এসে আড্ডাতে জমায়েত হয়েছি। বনোয়ারি সুরভিত চায়ের ট্রে নিয়ে নীচে থেকে উঠে আসবার সঙ্গে সঙ্গেই টঙের ঘরের তিনিও এসে তাঁর মৌরসি আরামকেদারা দখল করে শিশিরের মুখে সকালের বেতার সংবাদ শুনছেন—এমন সময় শিবুর এই চমকে দেওয়া ঘোষণা।
নিজের ঘোষণাটা আরও জোরালো করবার জন্য শিবু দ্বিতীয়বার সেটা গলা চড়িয়ে শোনাল, বিশ্বাস করি না আমি।
বিশ্বাস করো না? কী বিশ্বাস করো না? খানিক বিস্ময় বিমূঢ়তার পর আমাদের প্রশ্ন।
কী বিশ্বাস করি না? শিবু নিজের বক্তব্যটা জোরালো করবার জন্য প্রশ্নটা নিজেই আবার আউড়ে নিয়ে উত্তর দিলে, বিশ্বাস করি না তোমাদের ওই জ্যোতির্বিদ পণ্ডিতদের হিসেব নিকেশ।
বিশ্বাস করো না! একেবারে হতভম্ব হয়েই বললাম, কত যুগ যুগ ধরে যারা হিসেব মিলিয়ে আরও অনেক কিছুর জন্য এই ধূমকেতুর গতিবিধির নির্ভুল গণনা করে এসেছেন তাঁদের বিশ্বাস করো না? এতদিনে তাঁদের হিসেবের ভুল কোথাও ধরা পড়েছে?
ধরা পড়েনি বলেই ভুল যে হয়নি তার ঠিক কী? শিবু হার না মেনে বললে, আর আগে যদি ভুল না-ও হয়ে থাকে, এবারে হয়েছে বলেই আমার ধারণা।
তোমার ধারণা! তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললাম, তোমার ধারণা মতে কী এবার হবে শুনি? হ্যালির ধূমকেতু এবার আসবে না?
আসবে না, বলছি না, শিবু জোর দিয়ে বলে চলল, এসেই যখন পড়েছে তখন আসবে না বলবে কোন আহাম্মুক? কিন্তু যেখান দিয়ে যেমন করে এসে যতদিন থাকবে বলা হচ্ছে সেসব হিসেব মিলবে না।
তার মানে, বিদ্রুপের সুরেই বললাম, তা হলে হ্যালির ধূমকেতু আমাদের এই পৃথিবীর ওপরই আছড়ে পড়তে পারে।
তা পারে না এমন নয়, শিবু আমাদের বিদ্রুপটা গ্রাহ্য না করেই যেন ধৈর্য ধরে বোঝালো, এর পরে কোনওবার হয়তো এসে পড়বে। তবে এবারে অমন একটা দুর্ঘটনা ধরতে না পারার মতো হিসেবের ভুল হয়েছে বলে আমি মনে করি না। তবে ভুলচুক কিছু যে না হয়ে পারে না সে বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। আর পৃথিবীর উপর আছড়ে পড়ার মতো ব্যাপারে না হোক, সে ভুল হ্যালির ধূমকেতুর এবারের গতিবিধিতেই ধরা পড়বে।
হাতে পাঁজি মঙ্গলবার, আর কেন? শিশির তর্কটা সিধে রাস্তায় চালাবার চেষ্টায় বললে, ধূমকেতু তো এসে পড়েছে, তখন তার গতিবিধির বেয়াড়াপনা দেখতে পাব আর ক-দিনের মধ্যে। কিন্তু জ্যোতির্বিদদের গণনায় ভুলচুক যে হবেই এ ধারণার ভিতটা কী জানতে পারি?
নিশ্চয় পারো, শিবু তার বক্তব্য ব্যাখ্যা করে বোঝাল, জ্যোতির্বিদেরা মূর্খ অথবা আনাড়ি গণক অবশ্যই নয়। তবু তাদের ভুল না হয়ে পারে না। আর সে ভুল হবার কারণ, যার কণামাত্র আমরা জেনেছি, সেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অতল রহস্য। জ্যোতির্বিদেরা তাঁদের দূরবিন আর রেডিয়ো-টেলিস্কোপ দিয়ে যেটুকু হদিস পান তা দিয়ে সে অসীম অতল রহস্যের কতটুকু অঙ্কের ছকে ফেলতে পারেন? এ যেন
পুকুরের জলের ঢেউ দেখে অপার সমুদ্রের রহস্যের ব্যাখ্যা করা।
না, শিবু বড় বাড়াবাড়ি করে ফেলছে। তার মানে তুমি বলতে চাও বলে শিবুর দার্শনিকতা এবার থামাবার চেষ্টা করা হল।
কিন্তু সে থামল না, সমান উৎসাহে বলে চলল, এই অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে আমাদের ছায়াপথের মতো সামান্য একটা গ্যালাক্সি অর্থাৎ নক্ষত্রমণ্ডলের এককোণে ছোট্ট একটা ধূমকেতু মাত্র ছিয়াত্তর বছর অন্তর আমাদের সূর্যের মতো একটা ছোটখাটো তারাকে পাক দিয়ে যায়। সেই পাক দিয়ে যাওয়ার রাস্তা আর সময়টা অনেককাল একরকম ছিল বলে কি চিরকাল থাকবে না, থাকতে পারে? বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ছেড়ে দিলাম, আমাদের এই ছায়াপথ গ্যালাক্সি-তেই কত কী না হচ্ছে যার ঢেউ এসে লেগে হ্যালির ধূমকেতুর গতিবিধি সব তছনছ করে দিতে পারে।
মানলাম যে তা পারে। বিতণ্ডাটা যেন জমেছে বুঝে একটু উসকানি দিলে গৌর, কিন্তু মহাশূন্যে অমন ঢেউ তোলার মতো তেমন কিছু ঘটেছে কি?
