তুই নিজে শুধু আসিসনি, উর্তাদোকেও সঙ্গে করে এনেছিস? দে দিয়স রাগে। আমার গলাটা যেন নিংড়োবার মতো করে প্রাণপণে চেপে ধরল।
কাতুকুতু লাগছে। ছাড়ো! বলে এবার তার হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে মাটিতে নেমে বললাম, তোমার যা এখন অবস্থা কাগজের লেখা মগজেই ঢুকবে না। কীসে কেমন করে উর্তাদোকে নিয়ে এলাম চলো দেখিয়ে দিই।
চুলের মুঠিটা একটু আলতো করে ধরে তাকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে তাই দেখালাম। দেখাতে দেখাতে বুঝিয়েও দিলাম সব। যা বোঝালাম তার মোদ্দা কথাটা হল এই—
শনগাদা নামে ওই ভেলা পোর্তুগিজরা কলম্বাসের পর প্রথম ব্রেজিলে এসে ডাঙায় নামবার সময় দেখেছিল। মাঝারি একটা টেবিলের মাপের কটা হালকা গুঁড়ি-জোড়া-দেওয়া একটা ভেলায় বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচির মতো অতি মিহি কাপড়ের ঢাউস পাল খাটিয়ে ওদেশের জেলেদের বারদরিয়ায় পাড়ি দেওয়ার সাহস দেখে তারা অবাক।
পুরুষানুক্রমে সে বিদ্যা আর সাহস এখনও এ অঞ্চলের জেলেদের আছে। তারা এই যন্ত্রের যুগেও মাছ ধরার জন্য ওই বিপজ্জনক ভেলাই পছন্দ করে।
উর্তাদোকে নিলামের ডাকের দিন তার দ্বীপে নামতেই না দিয়ে তার মালিকানা ফাঁকি দিয়ে নেবার একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে বুঝে মোটর লঞ্চ স্টিমারের বদলে ওই ভেলাই আমি বাহন হিসেবে ঠিক করি। ভেলায় আসার জন্যই দে দিয়সের পাহারাদার বোট দুটো আমাদের হদিস পায়নি।
দে দিয়সের সব শয়তানি ফন্দিও ব্যর্থ হয়েছে তাইতো যে তারিখে দ্বীপটার ইজারা আবার পেয়েছিল তারই মান রাখতে উৎসব করবার জন্য উর্তাদোর টাকা ্পাঠানো। কম হোক বেশি হোক, ভালবেসে যখন পাঠিয়েছে তখন খরচ করো প্রাণ খুলে!
ঘনাদা গোটা সিগারেটের টিনটা শিশিরের হাতেই তুলে দিলেন।
কিন্তু ওই আপনার হুয়ার্তো–শিবু যা বলতে যাচ্ছিল তা আর বলা হল না।
বানানে এইচ থাকলেও উচ্চারণটা হুর্তাদো নয়, উর্তাদো! বলে শিবুকে থামিয়ে ঘনাদা টিনটা ভুলেই যেন ফেলে উঠে পড়লেন।
তারপর ঘর থেকে বেরুতে বেরুতে আর একবার পিছু ফিরে শেষ রাত্রের মারটি ছেড়ে গেলেন।
ও, উর্তাদো নামটা আবার ব্রেজিলেরও নয় পেরুর। মিউনিখ অলিম্পিকের কুস্তি লড়নেওয়ালাদের তালিকা খুঁজলেই দেখতে পেতে।
ঘনাদা সামনে থাকলে আমরা অধোবদনই হতাম। তার বদলে পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম একটু অপ্রস্তুতের মতো হেসে।
কিন্তু অপ্রস্তুত বা কেন? অত ফন্দি-ফিকির, অত মুসাবিদা, শিশিরের ওই পঞ্চাশটা টাকা নেহাত ভেস্মে ঘি ঢালা হযেছে কি?
হ্যালি-র বেচাল
দেখা গেছে?
হ্যাঁ, দেখা গেছে! উনিশশো পঁচাশি বারোই নভেম্বর তারিখের খবর তাই।
কী দেখা গেছে যা নিয়ে এত উত্তেজনা, তা নিশ্চয় এখন আর বলতে হবে না। কোথা থেকে, কেমন দেখা গেছে সেইটেই আসল খবর।
দেখা গেছে আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলস থেকে, দূরবিন-টুরবিন নয়, একেবারে খালি চোখেই। এইটিই যা বারোই নভেম্বর তারিখের খবর।
লস অ্যাঞ্জেলস্-এর বাসিন্দাদের ঈর্ষা করবার কোনও কারণ কিন্তু নেই। আমেরিকার চিত্র-তারকাদের নিজস্ব মুলুক বলে ভাগ্য তাদের ওপর বেশি সুপ্রসন্ন এ কথা ভাবাও ভুল। যা দেখতে পাওয়া নিয়ে এত হইচই দুদিন বাদে সারা পৃথিবীর মানুষই প্রাণভরে তা দেখতে পাবে।
কিন্তু এই দেখতে পাওয়াটাই এমন কিছু কি বড় খবর?
যা দেখবার কথা হচ্ছে তা যে হ্যালির ধূমকেতু তা আর নিশ্চয় হাঁকডাক করে জানাতে হবে না। হ্যাঁ, হ্যালির ধূমকেতু আসছে, আসছে যেমন তার নিয়ম, সেই ছিয়াত্তর বছর বাদে। সে আসবে তার লম্বা আগুনের লেজটা পেছনে ছড়িয়ে আমাদের সূর্যকে একটা পাক দিয়ে, আবার ফিরে যাবে যেখান থেকে এসেছিল সেই অজানা সুদূর নিরুদ্দেশে।
ব্যাপারটা অদ্ভুত সন্দেহ নেই, কিন্তু নতুন কিছু নয়। এক জীবনে কোনও একজন একবারের বেশি দুবার ও-ঘটনা দেখবার সুযোগ পায়নি বললেই হয়। কিন্তু বিশেষ কোনও একজন পেলেও পৃথিবীর মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে এ ঘটনা যে দেখে লক্ষ করে আসছে, আরও অনেক কিছুর সঙ্গে আমাদের মহাভারতেও তার প্রমাণ আছে। যেমন তেমন প্রমাণ নয়, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধটাই যে এই ধূমকেতুর অশুভ আবির্ভাবের ফল এমন ইঙ্গিত নাকি দেওয়া আছে সেখানে।
তাই স্বীকার করতেই হচ্ছে যে হ্যালির ধূমকেতুর আসা যাওয়া একটা অসাধারণ ঘটনা হলেও একেবারে নতুন অজানা কিছু নয়।
হ্যালির ধূমকেতু আগেও যেমন এসেছে আর কিছুদিনের জন্য রাতের আকাশের পরম বিস্ময় হয়ে থেকে সূর্যদেবকে একবার পাক দিয়ে আবার নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে, এবারও তাই যাবে।
কিন্তু ব্যাপারটা এবার শুধু তাই কি?
এই ১৯৮৫-র ২রা জুলাই ফরাসি গায়নার কোস্ট থেকে গিয়োত্তো নামে যে রকেট ছোঁড়া হল সেটা কি নিছক বাহাদুরি! কী মতলবে জলের মতো পয়সা খরচ করে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি ব্রিটিশ এরোস্পেস-এর সঙ্গে থেকে সত্তর কোটি কিলোমিটার পাড়ি দেবার জন্য এই রকেট ছোঁড়ার ব্যবস্থা করেছে!
হ্যাঁ, লক্ষ্য যে হ্যালির ধূমকেতু তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু গিয়োত্তোকে ছোঁড়া হয়েছে যেদিক দিয়ে হ্যালির ধূমকেতু আসছে তার উলটো দিক থেকে তার সঙ্গে মোলাকাতের জন্য। আর সে মোলাকাত যদি সত্যিই হয় তবে হবে সেই ১৯৮৬-র ১৩ই মার্চ গ্রিনিচ মানা ঘড়ির হিসাবে সন্ধ্যা ৬-৩০ মিনিট থেকে পরের দিন ১৪ই মার্চ বেলা তিনটে ত্রিশ মিনিটের মধ্যে। সে সাক্ষাৎ যদি হয় তাহলে ৯৬০ কিলোগ্রাম ওজনের তিন মিটার লম্বা গিয়োত্তো তার খবর যা পাঠাবে সে রেডিয়োবার্তা পৃথিবীতে পৌঁছতে অন্তত আট মিনিট লাগবে।
