কিন্তু টুপি থেকে তুমি আমার মুখে দিলে কী? উর্তাদো সন্দিগ্ধভাবে জিজ্ঞাসা করলে।
দিলাম একটা ভয়-ভাবনা কাটাবার বড়ি।
আমার কথাটা শেষ না হতেই উর্তাদো আবার কাতরে উঠল—তোমার ওটা জাদুর টুপি বুঝলাম। সব ও থেকে তুমি বার করতে পারো, কিন্তু ওষুধের বড়িতে কি সত্যকার ভয় কাটবে? চারিদিকে একবার চেয়ে দেখো। সমুদ্র ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে, কিন্তু তেকোনা ফলার মতো হাঙরের ডানাগুলো দেখতে পাচ্ছ? জল কেটে আমাদের দিকেই পাক দিতে দিতে ক্রমশ এগোচ্ছে।
উর্তাদো ভুল কিছু বলেনি। ডানা দেখেই বোঝা যায়, সত্যিই দুটো বাঘ-হাঙর তখন আমাদেরই তাক করে কাছাকাছি চক্কর দিচ্ছে।
কিন্তু হাঙরের ডানা শুধু নয়, আরও কিছু আমি তখন দেখেছি। উর্তাদোকে সেই কথাই জানালাম। বললাম, তোমার ভয় নেই, উর্তাদো। ভেলা উলটে তুফানের সমুদ্র থেকে বেঁচেছ, এ বিপদ থেকেও বাঁচবে। হাঙরেরা অন্তত তোমায় আমায় ছুঁতেও পারবে না।
ছুঁতেও পারবে না? উর্তাদো ভয়ে হতাশায় খিঁচিয়ে উঠল আমাকে, হাঙর দুটো আমাদের পাক দিতে দিতে কত কাছে এসে পড়েছে, দেখেছ?
দেখেছি! তাকে সাহস দিয়ে বললাম, সেই সঙ্গে সমুদ্রের শুশুক ওই পরপয়সগুলোকে দেখেছ কি! সমুদ্রের ওই সেপাইরা যখন এসে পড়েছে তখন আর ভাবনা নেই। সমুদ্রের প্রাণী হয়ে মানুষের ওপর কেন যে ওদের এত দরদ সেটা একটা রহস্য, কিন্তু ওরা কাছে থাকলে কোনও হাঙরের সাধ্যও হবে না আমাদের ছুঁতে।
যা বলেছি বেদবাক্যের মতো চোখের সামনে তা ফলতে দেখা গেল এবার। কোথা থেকে একটা শুশুক এসে গুতো দিলে একটা হাঙরের পেটে। তারপরেই আরেকটা। অন্য হাঙরটারও শুশুকদের গুঁতোয় সেই দুরবস্থা। একটা দুটো নয়, এক পাল পরপয়স তখন এসে হাঙর তাড়াবার দায় নিয়েছে। দেখতে দেখতে নাস্তানাবুদ হয়ে হাঙর দুটো চম্পট দিলে। শুশুকের পাল আমাদের সঙ্গেই রইল যেন পাহারা দিতে।
মাথামোটা দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পুবের প্রায় সবটা জুড়ে ব্রেজিল। ব্রেজিলের উত্তর-পুবে আটলান্টিক সাগর। সাধারণ মানচিত্রে দেখলে সে সমুদ্রে আফ্রিকার কূল পর্যন্ত গোনাগুনতি কটা দ্বীপের ফুটকি ছাড়া আর কিছু দেখা যাবে না। ম্যাপে দাগ ফেলবার যোগ্য না হলেও ছোট ছোট দ্বীপও সমুদ্রে কিছু আছে। ব্রেজিলেরই একটি নেহাত নগণ্য বন্দর কাবেদেলা থেকে মাইল পঞ্চাশ দূরের অমনই একটি অতি ছোট দ্বীপের সেদিন যেন কপাল ফিরে গেছে।
সাধারণত যে দ্বীপে বছরের পর বছর ছাগল ভেড়া আর তাদের ক-জন রাখাল ছাড়া আর কাউকে দেখা যায় না সে দ্বীপের মাঝখানে সে দিন সরকারি তাঁবু পড়েছে। সিয়ারার জেলা সদর থেকে বহু অফিসার এসেছে নিলাম ডাকতে। সাত বছর বাদে বাদে এ সব দ্বীপ আগের মালিক এসে আবার না চাইলে নিলাম ডেকে ইজারা দেওয়া হয়।
সেই নিলাম ডাকার দিন সকালেই আমি ঘুরতে ঘুরতে ভুল করেই যেন সরকারি তাঁবুর সামনে এসে পড়েছি।
প্রথমেই সেখানে দেখা হয়েছে উর্তাদোরই এক জ্ঞাতিভাই দে দিয়স-এর সঙ্গে।
দে দিয়স আমায় দেখে হয়তো অবাক। কিন্তু বাইরে তা বুঝতে দিলে না, বরং টিটকিরি দিয়ে বললে, কী দাস, তোমায় একলা দেখছি যে? লেজুড়টি মানে আমার ভাই উর্তাদোকে কোথায় রেখে এলে?
যেখানে রাখলে সুবিধে হয় সেখানে! যেন নিজের রসিকতায় এক গাল হেসে বললাম, এ সব কাজে সঙ্গী না রাখাই ভাল নয় কি? তুমিও তো একলা এসেছ। দেখছি।
তা না এসে কী করি, বলো? দে দিয়স আগের সুরটা পালটে যেন আন্তরিকতার সঙ্গে বললে, হাজার হলেও আমাদের পরিবারের সম্পত্তি তো ছিল। উর্তাদোর যখন গরজ নেই তখন আমাকেই ডেকে নিতে হয়।
তোমার এ দ্বীপটার ওপর লোভ কিন্তু আগেও যেন ছিল দিয়স! সন্দেহটা মুখে ফুটতে দিয়েই বললাম, উর্তাদো একবার আমায় বলেছিল মনে হচ্ছে।
বলেছিল? দে দিয়সের চোখদুটো যেন ছুরির ফলা হয়ে উঠল, তা লোভ থাকলে হয়েছেটা কী? লোভ আছে বলেই তো ডেকে নেব আজ!
ও! তাই তুমি এখানে! আমি যেন অনেক দেরিতে বুঝে আমার ভুলটা স্বীকার করলাম, আমি ভেবেছিলাম, তোমার ভায়ের হয়েই বুঝি আবার দ্বীপটার ইজারা চেয়ে নিতে এসেছ! একটু থেমে তারপর বললাম, কিন্তু ধরো, উর্তাদো যদি নিলামের ডাকের আগে এসে পড়ে?
এসে পড়বে উর্তাদো? দে দিয়স একেবারে খোলাখুলিই মুখ বাঁকিয়ে বললে, এলে তার ভূতটাই আসবে, তাকে জ্যান্ত আর আসতে হবে না।
হ্যাঁ, আসা শক্ত বটে! আমি মুখটা হতাশ করে স্বীকার করলাম, দ্বীপটার চারিধারে তোমার দু-দুটো মেশিনগান বসানো-লঞ্চ পাহারা দিয়ে ঘুরছে দেখে এলাম বটে। এ দ্বীপে যে বোট আসবে, গুলিতে ঝাঁঝরা করে ড়ুবিয়ে দেবে।
আমার কথা শুনতে শুনতে দে দিয়সের চোখদুটো হঠাৎ ছোট হয়ে উঠল। সেই সঙ্গে মুখটাও ছোটলোকের মতো। আমাকে যেন চোখের সড়কিতে ফুটো করার চেষ্টায় বললে, তুই! তুই কী করে এলি এখানে?
ভূত হয়ে ছাড়া আর কী করে আসব বলো! তার দিকে চেয়ে একটু ভুতুড়ে হাসি হাসলাম।
ভূতই তোকে বানিয়ে ছাড়ব! আমার গলাটা এক হাতে টিপে ধরে বিড়ালছানার মতো শূন্যে ঝুলিয়ে ধরে দে দিয়স বললে, সত্যি করে বল, কেমন করে এসেছিস।
বলব কেন শুধু! ঝোলানো অবস্থাতেই মাথার শনগাদেইরো টুপিটা খুলে তা থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বার করে দে দিয়সের হাতে দিয়ে বললাম, সব তো লিখে এনেছি। তুমি চোরাচালানের একটা বড় ঘাঁটি বানাবার জন্য এ দ্বীপটার ইজারা চাও, আর উর্তাদো চায় পশুপালনের একটা গবেষণা-কেন্দ্র বসাতে। তার উদ্দেশ্যটাই ভাল মনে হল বলে তাকে সঙ্গে করে আনলাম।
