কেন এল তা বুঝিস না? শিবু আমায় ধমকালে, ঘনাদার কাছে কি কেমন আছো, ভাল আছি গোছের চিঠি আসে? আসে সব অত্যন্ত গোপন জরুরি চিঠি। ডাকে মারা কি চুরি যাবার ভয়েই সেগুলো সরকারি জিম্মায় পাঠানো হয়। বুঝলি?
বুঝতেই হল সসম্ভমে। জিজ্ঞেস করতেও হল ঘনাদাকে-সেইরকম দামি চিঠি বুঝি? খুব গোলমেলে আন্তর্জাতিক ফ্যাসাদ-ট্যাসাদ বোধহয়?
না। ঘনাদা যেন আমাদের হতাশ করতে পেরে খুশি—দামি চিঠি হলেও কোনও ফ্যাসাদ-ট্যাসাদের ব্যাপারে লেখা নয়। বরং ফ্যাসাদ কেটে যাবার তারিখটা স্মরণ করে কৃতজ্ঞতা জানাবার।
ওঃ! কৃতজ্ঞতা জানাবার চিঠি!—গৌরের গলায় একটু যেন সংশয়ের খোঁচা– সে চিঠিও এমব্যাসি মারফত পাঠিয়েছে পাছে মারা যায় বলে!
না, মারা যাবার ভয়ে নয়।—ঘনাদা আমাদের সংশোধন করলেন—আমার টাকা ভাঙাবার হ্যাঙ্গামা বাঁচাবার জন্য।
টাকা ভাঙাবার হ্যাঙ্গামা!—আমরা যতখানি সম্ভব হাঁদা সেজে হাঁ করে করে রইলাম ঘনাদার দিকে তাকিয়ে।
ঘনাদা ব্যাখ্যা দিয়ে সে হাঁ বোজাবার ব্যবস্থা করলেন—এ তারিখটায় একটু উৎসব করবার জন্য উর্তাদো কিছু টাকা পাঠিয়েছে কিনা! ব্রেজিলের কারেন্সি ভাঙাতে পাছে অসুবিধা হয় তাই এখানকার এমব্যাসিকেই ভারতীয় মুদ্রায় বদল করে সে টাকা আমার কাছে তার চিঠিটার সঙ্গে পৌঁছে দিতে লিখেছে।
খুব বুঝদার বন্ধু তো আপনার ওই হুর্তাদো!—আমরা তারিফ করে তারপর আমাদের আশাটা জানিয়েছি—সব দিক ভেবে তার মুশকিল আসানের তারিখ স্মরণ করে উৎসব করতে মোটা কিছু আপনাকে পাঠিয়েছে নিশ্চয়?
হ্যাঁ, পঞ্চাশ টাকা তো দেখছি, বলেছেন ঘনাদা খুশি মুখে বেশ একটু গর্বভরেই।
পঞ্চাশ টাকা?-ছি-ছি-ছি-টা স্পষ্ট না উচ্চারণ করলেও আমার গলার স্বরে আর মুখের চেহারায় গোপন থাকেনি।
পঞ্চাশ?—শিবুর যেন অপমানে গলাটা বুজে এসেছে!
মাত্র পাঁচ দশে পঞ্চাশ সেই ব্রেজিল থেকে?—শিশিরের গলায় ধিক্কার।
ওই টাকা ভাঙাবার হ্যাঙ্গামা বাঁচাতে আবার এমব্যাসির মারফত পাঠানো? আর গৌরের গলায় বিদ্রুপ।
ঘনাদাকে একটু দিশাহারা করা গেছে কি? আহ্লাদে গদগদ মুখটা একটু চুন?
না, তা আর পারা গেল কই!
ঘনাদার মুখে তখন একটু ক্ষমা আর প্রশ্রয়ের হাসি।
আমাদের সব আক্রমণের বাণ ভোঁতা করে দিয়ে করুণাভরে বললেন, পঞ্চাশ টাকার বেশি পাঠাবে উর্তাদো! ওই পঞ্চাশই যে পাঠিয়েছে, তাই বলতে গেলে তার পাঁজরার ক-টা হাড় খুলে দিয়ে। মানুষটা ভাল হলে কী হয়, হাড়কঞ্জুস যে।
নিজেই সে কথা সে জানে। ঠিক এই তারিখে সে রাত্রে আমার কাছে নিজের এই মজ্জাগত দোষ নিয়ে কী তার আফশোস!
কেন আমি ক-টা টাকা বাঁচাতে একটা মোটর বোট ভাড়া করলাম না, দাস! সে তখন ড়ুকরে উঠে বলছে, কাজ হাসিলের আশা তো ছেড়েই দিলাম, তার আগে প্রাণগুলোই নির্ঘাত যে দিতে হবে বেঘোরে!
তা অবস্থাটা উর্তাদো কিছু বাড়িয়ে বলেনি।
ঝড়ের রাতে দক্ষিণ আটলান্টিকের অকূল সমুদ্রে একটা ওলটানো ভেলা ধরে কোনওরকমে আমি আর উর্তাদো তখনও ভেসে আছি। এক-একটা পাহাড়-প্রমাণ ঢেউ যেন একেবারে পাতালে পৌঁছে দেবার জন্য থেকে থেকে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে আসছে। কী ভাগ্যি যে শনগাদা মানে যে ভেলা আমরা আঁকড়ে ধরে আছি। তা কখনও ডোবে না। কিন্তু ঢেউয়ের প্রচণ্ড ঘায়ে সে ভেলার শোলার মতো হালকা কাঠগুলোর, কাঠের গজাল-ঠোকা বাঁধন আলগা যদি না-ও হয়ে যায়, আমাদের হাতই তো অবশ অসাড় হয়ে খুলে আসতে পারে।
এক একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কা সামলাবার ফাঁকে ফাঁকে সামান্য দু-একটা কথা ওই ভাবে আমাদের হচ্ছিল। তাও দুজনেই ভেলার একদিকে একেবারে গায়ে গা লাগিয়ে ভাসছিলাম বলেই ঝড়ের গর্জন আর ঢেউয়ের কল্লোল ছাপিয়ে কথাগুলো কিছুটা কানে যাচ্ছিল।
একটু ফাঁক পেলেউ উর্তাদো তখন ওইরকম নিজেকে ধিক্কার দিয়ে আর্তনাদ করছে।
কয়েকবার শোনবার পর ধমক দিয়ে বললাম, একটু চুপ করে দমটা বাঁচাও তো! তুমি কঞ্জুস ঠিকই, কিন্তু মোটর বোট-এর বদলে শনগাদা নিয়ে পাড়ি আমি ইচ্ছে করেই দিয়েছি। শক্ত করে যদি শেষ পর্যন্ত ধরে থাকতে পারো তা হলে এই শনগাদাই বাঁচাবে, এটুকু বলতে পারি।
একদমে এতগুলো কথা অবশ্য বলিনি। বার চারেক বড় ঢেউয়ের ফাঁকে ফাঁকে ভাগ-ভাগ করে উর্তাদোকে এ আশ্বাস দিতে হয়েছে।
আশ্বাস পাকনা-পাক উর্তাদো চুপ হয়ে গেছে তারপর। পুবের আকাশ লাল হয়ে অন্ধকার ফিকে হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ঝড় থেমে গিয়ে ঢেউগুলো শান্ত হয়ে এসেছে।
ঝড় থেকে বাঁচলেও উর্তাদের তখন আর-এক কাঁদুনি শুরু।
সভয়ে চারিদিকে একবার চেয়ে দেখে বলেছে, আমাদের অবস্থাটা এখন কী তা বুঝতে পারছ, দাস?
খুব বুঝতে পারছি। মাথার এনামেল করা টুপিটা এক হাতে খুলে তা থেকে একটা বড়ি বার করে উর্তাদোর মুখে একরকম জোর করেই পুরে দিয়ে বলেছি, যে দিকে চাই, কূল নেই কোথাও একটা ওলটানো শনগাদা ধরে ভাসছি। মাথায় একটা টুপিই শুধু ভরসা।
এখনও তুমি ঠাট্টা করতে পারছ! উর্তাদো প্রায় ককিয়ে উঠল।
ঠাট্টা নয়, উর্তাদো! গম্ভীর হয়েই তাকে বললাম এবার, সত্যিই, মাথার এই টুপি আমাদের সবচেয়ে বড় ভরসা। যা ধরে এখনও টিকে আছি সেই শনগাদা নিয়ে। ব্রেজিলের এই উত্তর-পুবের রাক্ষুসে সমুদ্রের সঙ্গে মাছের জন্য যারা লড়ে সেই দুর্ধর্ষ শনগাদেইরোদের শেষ সহায় এই টপি। কোমরে বাঁধা ছোরা আর মাথার এই টপির জোরে তারা শনগাদার এই খুদে ভেলায় সমুদ্রের যে কোনও কুটিকে তুড়ি দিয়ে অগ্রাহ্য করে।
