কিন্তু এ পর্যন্ত যা বলেছি তাতে অনেকের ভুরুই কুঁচকে উঠেছে বুঝতে পারছি। বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের দোতলার আজ্ঞাঘরে শুক্রবার ছটায় ঘনাদার সঙ্গে আমরা চারজন উপস্থিত থাকব এ তো নেহাত মামুলি রুটিন মাফিক ব্যাপার। অদ্ভুত কিছু তো নয়!
কিন্তু রামভুজ সেইসঙ্গে কেন?
হিঙের কচুরির ঝুড়ি কি ট্রে-তে করে মাংসের শিঙাড়ার প্লেট নিয়ে নিশ্চয়।
না, হল না।
কচুরির ঝুড়ি মাংসের শিঙাড়া আনবার জন্য বনোয়ারি থাকতে রামভুজ আসবে কেন?
ঘটনাটা তা হলে কী? ঘটনাটা একেবারে অবিশ্বাস্য! অভূতপূর্ব! কল্পনাতীত! রামভুজকে নিয়ে আমাদের পাঁচজোড়া চোখ বিস্ফারিত বিস্ময়ে ঘনাদার কোলের ওপর রাখা দক্ষিণ হস্ত আর সে হাতের একটি কাগজের দিকে নিবদ্ধ হয়ে আছে।
কেন? কীসের কাগজ সেটা? সিমলা প্যাক্টের খসড়া? নিকসন-চৌ-এনলাই-এর গোপন চুক্তির দলিল?
না, সে সব কিছু নয়।
ঘনাদার হাতে একটি নতুন ঝকঝকে মেটে সিঁদুরের রঙের কুড়ি টাকার নোট!
তা কুড়ি টাকার নোট ঘনাদার হাতে একটা থাকতে পারে না?নতুন কী রকম নোট বেরিয়েছে দেখাবার জন্য শিশিরই হয়তো সেটা তাঁর হাতে দিয়েছে।
না। এবারও হল না।
ঘনাদা নিজের পকেট থেকেই নোটটা বার করেছেন আর বার করে রামভুজকেই ডেকে পাঠিয়ে তাকে হুকুম দিচ্ছেন।
কী হুকুম?
অতি সাদাসিধে ক-টা ফরমাশ। বলছেন, তুমি বিরিয়ানি পোলাওই বানাও রামভুজ, আর চিংড়ির মালাইকারি, নিউমার্কেটে গেলে এই বিকেলেই একেবারে পয়লা নম্বর গলদা চিংড়ি পাবে। দামের পরোয়া কোরো না। এ কুড়ি টাকায় না হয় আরও যা লাগে নিয়ে যাও–
ঘনাদা পকেট থেকে অকাতরে আর-একটা কুড়িটাকার নোট বার করে আগেরটার সঙ্গে রামভুজের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়। না হয় আসবার সময় একটা ট্যাক্সি নিয়েই এস। ট্রাম-বাসের যা অবস্থা।
যেন দম দেওয়া পুতুলের মতো হাঁ করা মুখে ঘনাদার হাত থেকে টাকা নিয়ে চলে যেতে গিয়ে রামভুজকে আবার দাঁড়াতে হল।
ঘনাদা ডেকেছেন।
হ্যাঁ, শোনো, রামভুজ। সোনাই যখন হল তখন সোহাগাটা বাকি থাকে কেন? সেমুই পায়েসের ব্যবস্থাও কোরো। কিসমিস বাদাম পেস্তা—কিছুর যেন খামতি না হয়। পেস্তার আজকাল আবার সোনার চেয়ে পায়া ভারী। বাজারে সরেস পেস্তা পাওয়াই ভার। যা দাম চায় দিয়ে নিয়ে আসবে। বুঝেছ?
হাঁ, হুজুর বলে যেরকম চেহারা করে রামভুজ বেরিয়ে গেল তাতে সরিষার বেল দুটো পাকা তেল নিয়ে ফিরলে খুব আশ্চর্য হব না।
বিবরণ যা দিলাম তা কি স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে?
না, স্বপ্ন নয়, একেবারে নির্ভেজাল সত্য।
বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনে সত্যিই পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গেছে। ঘনাদা নিজের পকেট থেকে টাকা বার করে ভুরিভোজের বাজার করতে পাঠিয়েছেন আর তারপর যা করেছেন তা মাথায় চরকি-পাক লাগাবার মতো।
টাকার পকেট নয়, অন্য পকেট থেকে সিগারেটের একটা আস্ত টিন বার করে এয়ারটাইট ঢাকনা খুলতে খুলতে বলেছেন, হিটা শুনতে পেলে?
গোড়াতেই যে বিশেষণগুলো দিয়ে এ গল্প শুরু এবার সেগুলো লাগসই মনে হচ্ছে কি না?
কার চোখ কতখানি ছানাবড়া হতে পারে তার নমুনা দেখিয়ে আমরা এবার একেবারে বোবা বনে গেছি।
শিশিরই সকলের মহড়া নিয়ে ঘনাদার বেপরোয়া বদান্যতায় তাঁর ওপর প্রথম। দরদ দেখালে।
দমকা এত বাজে খরচ কিন্তু না করলেও পারতেন। সব ভূত-ভোজন বই তো কিছু নয়।
ভুতেরাও শিশিরের সঙ্গে জুড়ি গাইতে দেরি করলে না।
ঠিক, ঠিক, শিবু বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বললে, বিরিয়ানি হচ্ছিল হচ্ছিল, তার ওপর ওই সেমুই পায়েসের কী দরকার ছিল?
আর পায়েসই না হয় হল, তাতে আবার পেস্তা কেন? গৌর তার চরম আপত্তির কারণ জানালে, কাজু কুচি কুচি করে দিলে সোয়াদ কিছু কম হত?
ঘনাদার ওই তো দোষ! আমি ঘনাদার আখের ভেবে চিন্তিত হয়ে উঠলাম, পয়সার মায়া করতে কোনওদিন শিখলেন না। দু হাতে এমন করে খরচ করলে কুবেরের ভাঁড়ারেও যে টান পড়ে। না, হঠাৎ যেন সংকল্প স্থির করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার উপক্রম করলাম, রামভুজ এখনও বেশিদূর যেতে পারেনি বোধহয়। তাকে ফিরিয়েই আনি।
থাক, থাক। শিবু, শিশির, গৌর—-তিনজনেই শশব্যস্ত হয়ে আমাকে থামালে, ঘনাদাকে মিছি মিছি কষ্ট দিয়ে লাভ কী? ওঁর চিরকেলে খরচের হাত আমরা একদিন সামলে আর কত বাঁচাব!
বেশ, তোমরা বলছ যখন তখন বসছি।—-আমি যেন নেহাত অনিচ্ছাভরে আবার বসলাম—কিন্তু উনি দিলদরিয়া বলে ওঁর মাথায় এমন করে হাত বুলিয়ে এতগুলো টাকা খসানো কি উচিত হল? আজই বোধহয় ব্যাঙ্ক থেকে তুলে এনেছেন।
ব্যাঙ্ক শুনে একটু কাশির ছোঁয়াচ লাগবার উপক্রম হয়েছিল। ঘনাদার মৃদু হাসির সঙ্গে মাথা নাড়াতেই তা থেমে গেল।
না, ব্যাঙ্ক থেকে তোলবার দরকার হয়নি।—ঘনাদা হেসে আমাদের আশ্বস্ত করলেন—ওই তোমাদের উতাদো কার্লসের চিঠিটা আজ এল কিনা!
হুর্তাদো কার্লসের চিঠি!—একটু অবাক হবার পরই তামাদের স্মরণশক্তি আবার যেন ফিরে পেয়েছি—হ্যাঁ, হ্যাঁ, আজ কী একটা চিঠি যেন সকালে এসেছিল বটে।
ব্ৰেজিলের কনসালেট থেকে পিন বই-এ পাঠিয়েছিল, না?—শিশির
আমাদের সমর্থন চাইলে।
ডাকে এলে তবু স্ট্যাম্পগুলো পেতাম। আমরা আবার বলাবলি করলাম। গৌর ঘটনাটা সঠিক ভাবে স্মরণ করল।
তা সেটা বুঝি এই উদো বুধো কী নাম বললেন, হুতাদো না কী, তারই চিঠি? সে-ই ব্রেজিল থেকে লিখেছে? উত্তরটা ঘনাদার কাছেই চাইলাম—কিন্তু ব্রেজিল থেকে লেখা চিঠি সোজা ডাকে না এসে কনসালেটের মারফত এল কেন?
