ঘনাদা কি বেসামাল? হঠাৎ কোনও ছুতোয় তিনি কি ঘর ছেড়ে যাবার তাল করবেন এবার?
না। ভাঙলেও যিনি মচকান না, অমন সেই ঘনাদা অত সহজে দান ছাড়বার মানুষ নন।
বেশ ধীরে-সুস্থে হাতের সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে তিনি বললেন, আছে! আছে! জবাব ঠিক যেখানে থাকবার সেখানেই আছে। এরপর আর কী পড়লে শুনি না।
এরপর? শিবু মুখে যেন সত্যিকার অরুচি ফুটিয়ে বললে, এরপর তো সেই মামুলি থোড় বড়ি-খাড়া আর শ্রীকৃষ্ণের সেই সস্তা সস্তা ম্যাজিক দেখাবার ভড়কি!
ভড়কিটা কী রকম একটু শুনতে পাই না? ঘনাদার মুখে একটু বাঁকা-হাসি লাগানো বলে সন্দেহ হল।
বেশ, শুনুন তাহলে, শিবু তাল ঠোকার মতো করে ওখানেই আনিয়ে রাখা ঢাউস কাশীরাম দাস-খানি কাছে টেনে পাতা ওলটাতে ওলটাতে বললে, পরের দিন অর্জুন আর শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের রথে জয়দ্রথকে খুঁজে কী রকম হয়রান—দ্রোণাচার্যের বৃহ-রচনার কায়দায় জয়দ্রথই বা কেমন নিশ্চিহ্নভাবে লুকোল—সে সব বিবরণ পড়বার নিশ্চয় দরকার নেই, আমি শুধু ভড়কির বর্ণনাটুকুই পড়ছি।
শিবু সেই বিরাট কাশীরাম দাস খুলে এবার পড়তে শুরু করল–
জয়দ্রথে কোনো মতে পাওয়া নাহি যায়,
হতাশ হইয়া পার্থ সখাপানে চায়।
বলে, আর বৃথা কেন করি অন্বেষণ,
অগ্নিকুণ্ড জ্বালো দিব প্রাণবিসর্জন।
পার্থের হতাশা দেখি দেব নারায়ণ,
সখারে সাহস দিয়া কহেন তখন।
কি ভয় আছে রে ইথে উপায় সৃজিব,
জয়দ্রথে আজিকেই নিধন করিব।
এত বলি সুউপায় চিন্তি নারায়ণ,
সুদর্শনে করিলেন সূর্য আচ্ছাদন।
আচম্বিতে দেখে সবে হইল রজনী,
কুরুসেনা মধ্যে হল জয় জয় ধ্বনি।
ব্যাস? আর কী চাই?
শিবু তার কাশীরাম পড়া থামাতেই ওপরের মন্তব্যটি শুনে আমরা চমকে বক্তার দিকে চাইলাম।
না, আমাদের শুনতে কোনও ভুল হয়নি। বক্তা স্বয়ং ঘনাদা ছাড়া আর কেউ নন।
কিন্তু তিনি কী বললেন? কী? হঠাৎ বাতুল প্রলাপ বকতে শুরু করলেন নাকি? প্রলাপ না হলে কথা ক-টার মানে কী? ঘনাদাকেই সে কথা জিজ্ঞাসা করলাম।
মানে! ঘনাদা করুণার হাসি হেসে বললেন, মানে, যা চাও সবই তো পেলে!
সবই পেলাম! আমরা হাসব, না রাগে চেঁচাব বুঝতে পারছি না, তখন সেই অবস্থাতেই জিজ্ঞাসা করলাম, সব পেয়ে গেছি মানে আমাদের প্রশ্নের জবাবও পেয়ে গেছি বলতে চান? কোথায়?
কোথায় আবার?—ঘনাদা আমাদের মূঢ়তায় যেন বিস্মিত—এইমাত্র যা পড়লে ওই শোলোকগুলিতেই। তবে অবশ্য ঠিক মতো পড়তে জানা চাই।
ঠিক মতো আপনার পড়াটা কী শুনি?—এবার আমাদের আর গরম হবার ভান করতে হল না—ওই সুদর্শনে করিলেন সূর্য আচ্ছাদন পড়ে কী গভীর রহস্যের আপনি সন্ধান পেলেন বুঝতে চাই।
আরে!ঘনাদা মৃদু ভর্ৎসনার সুরে বললেন, রহস্য গভীর হবে কেন? একেবারে ওপরেই ভেসে রয়েছে। সুদর্শনে করিলেন সূর্য আচ্ছাদন মানে কি সত্যি সত্যি সুদর্শন চক্রে সূর্য ঢেকে দেওয়া? ওর আসল মানে, সে দিন ওই কুরুক্ষেত্র অঞ্চলে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের ইঙ্গিত দেওয়া। শ্রীকৃষ্ণ আর যেমন-তেমন কেউ নন, আর সব কিছুর সঙ্গে জ্যোতিষশাস্ত্রটাও তাঁর পুরোপুরি জানা। তিনি আগেই কষে জানতে পেরেছিলেন, কোনদিন ওখানে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হবে। দিনটা ঠিক অর্জুনের জয়দ্রথ বধের প্রতিজ্ঞার পরের দিন হওয়ায় তিনি অমন করে অর্জুনের হয়ে কথা বলার ছলে অমন অসম্ভব প্রতিজ্ঞার কথা শুনিয়েছিলেন সবাইকে। যতদূর বোঝা যায়, সেদিন বেশ মেঘলা ছিল, সেই মেঘের আড়ালে বেশ খানিকটা বেলা থাকতেই হঠাৎ গ্রহণ শুরু হয়ে একেবারে পূর্ণগ্রাসে পৌঁছয়। দিন শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামছে ভেবে জয়দ্রথকে নিয়ে কুরুযযাদ্ধারা অর্জুনের অগ্নিকাণ্ডে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ-বিসর্জন মজা করে দেখতে আসে। আর তখনই পূর্ণগ্রাসের পর সূর্যের রাহুমুক্তি আবার শুরু হয়, আর দিনের আলো থাকতেই জয়দ্রথকে সামনে পেয়ে অর্জুনের প্রতিজ্ঞা পালনের কোনও অসুবিধা আর থাকে না।
এ বিস্তারিত ব্যাখ্যা শেষ করে ঘনাদা শিশিরের পুরো সিগারেটের টিনটি হাতিয়ে আরামকেদারা ছেড়ে ওঠবার উপক্রম করতে আমরা তাঁকে প্রায় জোর করে ধরে রেখে দাবি করেছি—কিন্তু আমাদের প্রশ্নের জবাব মহাভারতে কই?
এখনও সে কথা জিজ্ঞাসা করছ? আমাদের সম্বন্ধে তাঁর হতাশাটা ভাল করেই গলার স্বরে বুঝতে দিয়ে বললেন, আরে, সূর্যগ্রহণ কারওর খামখেয়ালে হয় না। তা হয় একেবারে নির্ভুল অঙ্কের হিসেবে। এই কদিন আগে আমাদের এখানে সূর্যের পূর্ণগ্রাস হয়ে গেছে। সত্যিকার জ্যোতির্বিদ কাউকে ধরে, এই গ্রহণ থেকে পিছনে হিসাব চালিয়ে সেই গ্রহণের তারিখ, জয়দ্রথ-বধ মানে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পল-বিপল পর্যন্ত নির্ভুল বলে দেবে।
আমাদের চোখগুলো কপালে উঠিয়ে রেখেই ঘনাদা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। এবার আর তাঁকে বাধা দিতে পারলাম না।
ভেলা
অবিশ্বাস্য! অভূতপূর্ব! কল্পনাতীত!
ঠিকানা–বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেন।
স্থান-দোতলার আড্ডাঘর।
সময়—শুক্রবার সন্ধ্যা ছটা।
কুশীলব—শিব শিশির গৌর আমি রামভুজ।
না, হল না। ঘনাদার নামটাই বাদ নাকি? তাঁর নাম তা হলে যাবে কোথায়? শেষে?
হ্যাঁ, পুজো সংখ্যার বিজ্ঞাপনে নামকরা কোনও কোনও লেখককে মাথার ওপরে না তুলে আরও খাতির বাড়াতে একটি এবং-এর নকিবের পেছনে যেমন সকলের শেষেই আলাদা করে রাখা হয়, ঘনাদার নামটাও তেমনই আমাদের ক-জন গার্ড অফ অনার-এর পেছনে ভিন্ন সারিতে একেশ্বর হয়েই থাক।
