ঘনাদা তাঁর চোয়াল নাড়া থামিয়ে হঠাৎ কি একটু টান হয়ে বসলেন! বসা আশ্চর্য কিছু নয়, কারণ এরকম সোজাসুজি ঘা তাঁর ওপর আমরা কখনও দিইনি।
এরকম ঘা খেয়ে ঘনাদা যদি একটু চমক খেয়ে থাকেন, তা মাত্র দু-সেকেন্ডের জন্য। সে মুহূর্তটুকু পার হতেই আবার যথাপূর্ব চোয়াল নাড়তে নাড়তে চোখে একটু উপহাসের ঝিলিক ফুটিয়ে বললেন, নেই নাকি? আচ্ছা নীচে গিয়ে বোস। আমি সেখানেই গিয়ে সব শুনছি।
প্রতিবাদ না করে নীচেই নেমে গেলাম বটে, কিন্তু মেজাজ তখন সকলেরই আমাদের খোশ। ঘনাদা এই সময় নেওয়া মানে যে তাঁর এখন সসেমিরে অবস্থা তাতে আর সন্দেহ নেই। তা সময় তিনি যত পারেন, নিন। শেষ মাত-এর চাল এখন আমাদেরই মুঠোয়। হাবুড়ুবু খেতে খেতে তিনি ধরবার মতো কুটোটিও পাবেন কিনা সন্দেহ।
শেষ পর্যন্ত ঘনাদা এলেন, বাইরে বেরুবার মতো সাজপোশাকে একেবারে তৈরি হয়ে। শেষে মৌরসি, কেদারাটি দখল করে যথারীতি শিশিরের বাড়িয়ে ধরা টিনটি থেকে সিগারেট নিতে গিয়ে টিনটি হাতে রাখতেও ভুললেন না। তারপর সিগারেট ধরিয়ে যেন ধীরে সুস্থে বললেন, আচ্ছা, তোমরা কী পড়েছ শুনি একটু!
সবই পড়েছি। আমরাও ভারিক্কি চালে বললাম, জয়দ্রথের সেই আদি বৃত্তান্ত, পাণ্ডবদের বনবাসের সময়ে তাদের আস্তানা লুট করতে গিয়ে পাণ্ডবদের হাতে মার খাওয়া, বিশেষ ভীমের থাপ্পড়ে পুরো দু-পাটি দাঁত উপড়ে যাবার পর তার সেই বারো বছরের দারুণ তপস্যা আর শেষে বাধ্য হয়ে শিবঠাকুরের সেই বর দিতে চাওয়া—
শিব বলে বর চাহ সিন্ধুর তনয়।
এত শুনি জয়দ্রথ হরে প্রণময়।।
অনেক করিয়া স্তুতি বলয়ে বচন।
অবধান কর প্রভু মম নিবেদন।।
এই বর দেহ শূলপাণি।
পাণ্ডবগণেরে যেন রণে আমি জিনি।।
তাতে শিব যা বললেন, সেই—
শুন তবে সত্য কথা সিন্ধুর তনয়।
জিনিবে পাণ্ডবগণে বিনা ধনঞ্জয়॥
এইসব শেষ করে অভিমন্যু বধ আর তারপর জয়দ্রথই অভিমন্যুর সহায়হীন ভাবে যুদ্ধে হত হওয়ার প্রধান কারণ জেনে—
জয়দ্রথ হেতু মরে অভিমন্যু বীর।
শুনি ধনঞ্জয় ক্রোধে হইল অস্থির॥
আর তারপরে অর্জুনের সেই প্রতিজ্ঞা—
মহাক্রোধে বলিলেন ইন্দ্রের নন্দন।
আমি যাহা বলি তাহা শুন সর্বজন।।
জয়দ্রথ হেতু মরে অভিমন্যু বীর।
এক বাণে নিপাতিব তাহার শরীর।।
তারপর—
দাঁড়াও দাঁড়াও! ঘনাদাই হঠাৎ গম্ভীর গলায় বাধা দিয়ে আমাদের থামালেন— এর পর আসল বিবরণটা ওখানে নেই।
ওখানে নেই মানে! আমরা তাজ্জব—কোথায় আছে তাহলে? ব্যাসের মূল মহাভারতে?
না, ঘনাদা যেন দুঃখের সঙ্গে বললেন, সেখানেও ব্যাসদেব অর্জুনের খাতিরে একটু অদল বদল করে বলেছেন।
অদলবদল! আমরা একটু সন্দিগ্ধভাবে বললাম, কী রকম অদলবদল?
না, সেরকম কিছু নয়। ঘনাদা আশ্বস্ত করলেন, এই একটু বাড়িয়ে কমিয়ে উলটো-পালটা বসানো।
আমরা এ নিয়ে কিছু তর্ক তোলবার আগে ঘনাদা নিজে থেকেই আবার বললেন, এই যেমন অর্জন জয়দ্রথ বধের প্রতিজ্ঞা করে—এক বাণে নিপাতিব তাহার শরীর বলার পর যা থাকবার কথা তা নেই। অর্জুনের মুখে তারপর যা বসানো হয়েছে,
সে-সবও তার কথা নয়।
তার মানে? এবার আমরা সত্যিই হতভম্ব।
মানে, ওখানে যা থাকবার কথা তা হল, বলে ঘনাদা প্রায় সুর করেই আমাদের শোনালেন,
এত তীব্র পুত্রশোকে মূছাহত প্রায়।
অর্জুনের মুখে না আর বাক্য বাহিরায়॥
তখন চিৎকারী উঠি দেবকীনন্দন।
বলেন শুনহ সবে প্রতিজ্ঞা বচন॥
কালি যদি জয়দ্রথ বিনাশ না হয়।
সূর্যাস্তেই প্রাণ পার্থ ত্যজিবে নিশ্চয়॥
দিনান্তেও জয়দ্রথ না মরিলে কালই।
আত্মঘাতী হবে পার্থ নিজ চিতা জ্বালি।।
অর্জুনের হয়ে শ্রীকৃষ্ণই এসব কথা বলেছিলেন? ঘনাদা তাঁর শোলোক পড়া থামাবার পর আমরা বেশ সন্দিগ্ধভাবে জিজ্ঞাসা করলাম, মানে, এগুলো অর্জুনের তো মনের কথা না-ও হতে পারে? আর তা যদি না হয় তাহলে অর্জুনও একথা শুনেবেন না কি?
অর্জুন হয়তো বেশ একটু চমকেও গিয়েছিলেন, ঘনাদা তাঁর অনুমানটা বিস্তারিত করলেন, কিন্তু পুত্রশোকে তিনি তখন অধীর। শ্রীকৃষ্ণের কথা যত ভুলই হোক, তার প্রতিবাদের কোনও দরকারই আর তাঁর নেই।
সবই বুঝলাম, শিশির যেন পুলিশি জেরার ধরনে জানতে চাইলে, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হঠাৎ কাল সূর্যাস্ত পর্যন্ত জয়দ্রথ বধের সময় বেঁধে দিয়ে অর্জুনকে অমন রীতিমত বেকায়দায় ফেলতে গেলেন কেন?
কেন তা তিনিই জানেন।—ঘনাদা ভক্তি গদগদ হলেন—তবে বিশ্বসংসার যিনি চালাচ্ছেন, চতুর চূড়ামণি সেই কৃষ্ণ বাসুদেবের নেহাত বাজে খামখেয়াল ওটা নিশ্চয় নয়। একটা কিছু মতলব তাঁর নিশ্চয় ছিল। দেখা যাক সে মতলব শেষ পর্যন্ত জানা যায় কি না।
ভক্তি গদগদ হয়ে আগের প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলেও ঘনাদাকে পুরোপুরি হড়কে পালাতে দিলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের কথাগুলো মহাভারতে অর্জুনের জবানিতে চালান হল কী করে?
সেটা স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণেরই ইচ্ছায়, ঘনাদা মহাভারতের বর্ণন-প্রমাদের রহস্য ভেদ করে বললেন, নিজের মহিমা তাঁর আর বাড়াবার দরকার নেই। তাই কীর্তির গৌরবটা অর্জুনকেই দিতে চাইলেন। মহামতি ব্যাসদেবও মানসবার্তায় তা টের পেয়ে। সেই ইচ্ছাপূরণে ত্রুটি করেননি।
আচ্ছা, অনেক কথাই জানালাম!—গৌর হঠাৎ ঘনাদাকে বেকায়দায় ফেলতে মূল মামলায় ফিরে গেল—কিন্তু এসব কথার মধ্যে আসল প্রশ্নের জবাব আছে কি? সে জবাব কোথায়?
