যেতে যেতে একটু দয়া তিনি শুধু করলেন। বারান্দার দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবার আগে কটা কথা আমাদের দিকে যেন ছুঁড়ে দিয়ে গেলেন।
কথাগুলো হল—ভালো করে পড়ো। তা পড়লে যা কিছু আসল খেই সব ওখানেই পাবে।
(২)
আমরা ঘনাদাকে বেকায়দায় ফেলে জব্দ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনিই আমাদের থ বানিয়ে গেলেন।
তিনি ঘর থেকে হাওয়া—কিন্তু আমাদের বুদ্ধিসুদ্ধিও সেই সঙ্গে যেন জট পাকানো।
অভিমন্যু বধ পালা পড়ো, খেই পাবে—তিনি বলে দিয়ে গেলেন। এটা কি ভাঁওতা? কিন্তু রাম-ভাঁতা হলেও আমাদের তা হেসে উড়িয়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে থাকলে চলবে না। ভাঁওতাটা ধরিয়ে দেবার জন্যই অভিমন্যু বধের পর্বটা কাশীরাম দাসে অন্তত পড়তে হবে।
অন্য উপায় যখন নেই তখন আনাও কাশীরাম দাস। পড়ো অভিমন্যু বধের গোটা পালাটা।
চারজনে পালা করে তাই পড়লাম। সেই—
যুদ্ধিষ্ঠির বলে বাপু শুনহ বচন।
ব্যূহ ভেদিবারে তুমি জান প্রকরণ॥
অভিমন্যু বলে তবে শুন নরমণি।
প্রবেশ জানি যে আমি নির্গম না জানি॥
থেকে দ্রোণের সেই অতি দুঃখের স্বীকারোক্তি–
ন্যায়যুদ্ধে অভিমন্যু জিনিতে যে পারে।
কহিলাম হেন জন নাহিক সংসারে।
কৃষ্ণের সে ভাগিনেয়, অর্জুনের সুত।
দেখিলে সাক্ষাতে যার সমর অদ্ভুত॥
তাহারে নারিব ন্যায়যুদ্ধে কদাচন।
কহিনু জানিও মম স্বরূপ বচন॥
তারপর দুর্যোধনের কথায় সেই সপ্তরথীর একসঙ্গে অভিমন্যুকে আক্রমণ–
বেড়িল বালকে গিয়ে সপ্ত মহারথী।
হানাহানি মারামারি যুদ্ধ চলে অতি॥
আর এসব বিবরণের শেষে সেই—
সম্মুখ সমরে বীর ছাড়িল জীবন।
গমন করিল চন্দ্রলোকে সেইক্ষণ॥
শেষ পর্যন্ত কিছুই পড়তে বাদ রাখলাম না। কিন্তু আমরা যা চেয়েছি কোথায় সেই জবাব?
সেদিন বিকেলেই তাঁর বিকেলের সরোবরসভায় যাবার মুখে ন্যাড়া সিঁড়ির নীচেই তাঁকে ধরলাম।
কই? শুধু অভিমন্যু বধের বৃত্তান্ত নয়, গোটা দ্রোণপর্বই তো পড়ে ফেললাম। কোথাও কিছু পেলাম না।
ঘনাদা কি আমাদের এমন দল বেঁধে চড়াও হওয়াতে ভড়কালেন? বিন্দুমাত্র না।
বরং আমাদের আনাড়িপনায় যেন হতাশ হয়ে করুণা করে বললেন, তার মানে সব পড়েও আসল খেইটা ধরতে পারোনি।
আসল খেইটা কোথায়? আমাদের গলায় অবিশ্বাসের সুরটা বেশ স্পষ্ট।
কোথায়? ঘনাদা যেন ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে বললেন, জয়দ্রথ কে, তা জানো?
জানব না কেন! খুব জানি।—–আমাদের আস্ফালন।
তাহলে ওই জয়দ্রথের ব্যাপারটাই ভাল করে আর একবার পড়ো, বলে ঘনাদা হনহন করে আমাদের ছেড়ে বারান্দা হয়ে নীচে নেমে গেলেন।
আমরা রাগব, না হাসব বুঝতে না পেরে তখন সবাই হতভম্ব।
জয়দ্রথের ব্যাপারটা ভাল করে জানলেই আমাদের প্রশ্নের জবাব পাব? কী পেয়েছেন আমাদের ঘনাদা? আর কত এমন গুল ঝাড়বেন? নিজের গুল নিজেই শেষে সামলাবেন কী করে?
তবু জয়দ্রথের ব্যাপারটা পুরোপুরি আর একবার না পড়ে আমাদের উপায় নেই। তাই পড়লাম। অভিমন্যু বধে যুধিষ্ঠিরের সেই বিলাপ থেকে—
যুধিষ্ঠির বলিলেন শুন বিবরণ।
চক্রব্যূহ করি দ্রোণ করে মহারণ॥
ব্যূহ ভেদি যুদ্ধ করে নাহি হেন জন।
অভিমন্যু প্রতি তবে কহি সে কারণ॥
এতেক শুনিয়া পুত্র লাগিল কহিতে।
নির্গম না জানি ব্যুহে, জানি প্রবেশিতে॥
তথাপিহ পাঠাই না করি বিচার।
প্রবেশিল ব্যুহে শিশু করি মহামার॥
তার পিছু যাই সবে হেন করি মনে।
ব্যূহদ্বার রুদ্ধ করে সিন্ধুর নন্দনে॥
জয়দ্রথে জিনিবারে নারে কোন জন।
সে কারণে মরিলেক অর্জুন নন্দন॥
থেকে—
জয়দ্রথ হেতু মরে অভিমন্যু বীর।
শুনি ধনঞ্জয় ক্রোধে হইল অস্থির॥
মহাক্রোধে বলিলেন ইন্দ্রের নন্দন।
আমি যাহা বলি তাহা শুন সর্বজন।
জয়দ্রথ হেতু মরে অভিমনু বার।
এক বাণে নিপাতিব তাহার শরীর॥
এসব কিছু নিয়ে সেই শ্রীকৃষ্ণের মায়া কৌশলে জয়দ্রথ বধ পর্যন্ত আগাগোড়া সবই পড়লাম। কিন্তু তার মধ্যে আমরা যা চাই সে জবাব কোথায়?
সেই কথাই বলতে পরের দিন সকাল হতেই সবাই মিলে টঙের ঘরে গিয়ে হাজির। অবশ্য উপযুক্ত ভেট না নিয়ে নয়।
ঘনাদা তখন সযত্নে তাঁর গড়গড়ার কলকেতে টিকে সাজাচ্ছিলেন। বনোয়ারির বয়ে-আনা ট্রের দুটি বড় বড় প্লেটে হিঙের কচুরি আর অমৃতিগুলির সুগন্ধ আর চেহারা তো বটেইবায়না দেওয়া ডবল সাইজগুলো দেখেও খুশিটা একেবারে গোপন করতে পারলেন না। টিকে সাজানো কলকেটা গড়গড়ার মাথায় বসিয়ে তামাকটা ধরতে দিয়ে বেদিগোছের তাঁর লম্বা চওড়া নিচু চারপায়াটির যথাস্থানে এসে বসে বললেন, এত সকালে এই হাতিমার্কা মাল কোথায় পেলে হে?
তাঁর এই খুশির ওপরই বড় ঘা দেবার জন্য তৈরি থেকে বললাম, আজ্ঞে, ওগুলো আমাদের গলির মোড়ের রাদুর দোকানেরই, তবে কাল প্রায় মাঝরাতে বায়না দেওয়া।
ঘনাদা তখন কচুরির প্লেট কোলের কাছে টেনে নিয়ে তার সদ্ব্যবহার শুরু করেছেন। সেই অবস্থাতেই যতটুকু বিস্ময় প্রকাশ করা সম্ভব তাই করে বললেন, তা মাঝরাতে কেন?
আজ্ঞে, তখনই আমাদের পড়াটা শেষ হল কিনাবড় গোলাটা ছাড়বার আগে আমরা একটু ছররা ছিটোলাম।
পড়া শেষ হল? কী পড়া? ঘনাদাকে সত্যিই দু-চোয়ালের বাঁধানো দাঁতের কাজ একটু থামাতে হল। তারপর পূর্ব কথাটা স্মরণ করে কতকটা অবহেলা ভরে বললেন, ও, তোমাদের যা পড়তে বলেছিলাম, সেই জয়দ্রথের কথা সব পড়লে?
হ্যাঁ—আমরা কামানটা দাগলাম—পড়ে দেখে বুঝলাম আপনি নিজে জয়দ্রথের বৃত্তান্ত কিছুই পড়েননি, কারণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কবে হয়েছিল তার কোনও হদিসই সেখানে নেই।
