না, কালবোশেখি আর হবে না। শিশিরই প্রথম যা হোক করে একটা প্রসঙ্গ তুলেছে।
হবে না মানে? শিবু যেন মানহানির মামলা রুজু করেছে। কালবোশেখি বন্ধ হলে-
এ দেশ রাজস্থান হবে। শিবুর খুঁজে না পাওয়া জবাবটা পূরণ করে দিয়েছিল গৌর।
হবে কেন? রাজস্থানই তো হচ্ছে। শিশির জোর গলায় ওই শেষ কথাটি বলেই চুপ হয়ে গিয়েছিল, কারণ বারান্দার দরজা দিয়ে ঘনাদা তখন আড্ডাঘরে পা দিয়েছেন।
আমাদের সকলের মুখ হঠাৎ কুলুপ-আঁটা হয়ে গেলেও ঘনাদা কিন্তু আগের দিনের মতো নিজেও চুপ হয়ে থাকতে পারেননি। দরজা থেকে এসে তাঁর মৌরসি আরামকেদারাটি দখল করতে করতেই নিজের আগ্রহটা লুকোতে একটু হালকা সুর লাগিয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন—কী তর্ক হচ্ছিল হে?
আমরা সবাই তখন বোবা। প্রশ্নটা যেন বুঝতেই পারিনি, এমনভাবে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছি।
ঘনাদা অধৈর্যটা পুরোপুরি আর চাপতে না পেরে একটু ঝাঁঝালো গলাতেই বলেছেন—কী নিয়ে অত চেঁচামেচি করছিলে, বলেই ফেলো না।
এতক্ষণে যেন অতি অনিচ্ছায় মুখ খুলে গৌর বলেছে, আজ্ঞে, ও কিছু না!
কিছু না! ঘনাদা বেশ কষ্ট করেই গলাটা যথাসাধ্য ঠাণ্ডা রেখে বলেছেন, কিন্তু রাজস্থান নিয়ে কী যেন চেঁচাচ্ছিলে মনে হল?
রাজস্থান! প্রথমে বেশ একটু অবাক হবার ভান করে, তার পর উদাসীন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললাম, হ্যাঁ, কিছু বলছিলাম বোধহয়, ঠিক মনে পড়ছে না।
মনে পড়ছে না। ঘনাদার গলার আওয়াজেই এবার আর সন্দেহ করবার কিছু থাকে না যে সলতের আগুন খোলের ভেতরের মশলায় গিয়ে লেগেছে।
তা লাগুক! তবু এখনও নয়। ও সোঁ-সোঁ আওয়াজ পেয়েই এখুনি ছাড়লে কাজের কাজ কিছু হবে না। আঙুলের টিপুনিতে শুধু একটু ঘুরপাক খেয়েই মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে ফেঁসে যাবে।
তাই ভেতর থেকে একেবারে ঠিকরে বার হবার মতো প্রচণ্ড সেই ঠেলাটা আসার জন্য আর একটু অপেক্ষা করতে হবে।
একবার সে ছুটি-কি-ফাটি বেগ এসে গেলে আর ভাবনা নেই। দু-আঙুলে টিপে একটু পাক দিয়ে ছেড়ে দিলেই উড়ন তুবড়ি ক-পাক ঘুরে মাটি ছুঁতে গিয়েই আবার যেন ছোঁ মারা হয়ে তেশূন্যে উঠে যাবে।
যার জন্য অপেক্ষা করছিলাম সেই প্রচণ্ড বেগের ঠেলাই এরপর একদিন টের পেলাম।
শুধু সোঁ-সোঁ ডাক নয়, যে হাতের যে যে আঙুলে ধরে রাখা, সব একেবারে যেন ছিঁড়ে নিয়ে ছুটে যাবার ছটফটানি।
মওকা বুঝে আমরাও ঠিকমতো পাক লাগালাম এবার।
মওকাটা এল মহাভারতের কথা নিয়েই।
আমাদের অবশ্য সেদিন আগে থাকতে রিহার্সেল দিয়ে তৈরি থাকার সুবিধে ছিল। ন্যাড়া ছাদের সিঁড়ির মাথায় ঘনাদার চটি ফটফটিয়ে উঠতেই উদারামুদারা বাদ দিয়ে একেবারে তারায় তান ছেড়েছিলাম সবাই মিলে।
সব বাজে কথা!—প্রথম গলাবাজিটা গৌরের—মহাভারতে ও-সব কিছু নেই।
আলবত আছে! শিবুর গর্জন, পড়েছিস মহাভারত?
হ্যাঁ, পড়েছি।-গৌরের আস্ফালন—সব পড়েছি—ব্যাসদেব থেকে কাশীরাম দাস, সব।
শুধু যেমন-তেমন করে পড়লেই হয় না।—আমার শিবুকে সমর্থন—পড়তে জানা চাই। তাহলে দেখবি মহাভারতে যা চাস সব আছে? যা চাইব সব আছে? গৌরের ভেংচি কেটে টিটকিরি।
হ্যাঁ, মহাভারতে আছে। ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ঘনাদার আজ আর প্রশ্ন-ট্রশ্ন কিছু নয়—একেবারে সরাসরি বাড়ি কাঁপানো-গলায় ঘোষণা।
ভেতরে চলে এসে মৌরসি আরামকেদারায় বসার সঙ্গে সঙ্গেই সে ঘোষণায় আর একটু সংযোজন—পড়তে জানলেই পাওয়া যায়।
পড়তে জানলেই পাওয়া যায়? হ্যাঁ, আজ আর মুখে আমাদের কুলুপ-টুলুপ নয়। একেবারে প্রথম থেকেই যুদ্ধংদেহি-তাল-ঠোকা শিশিরের গলা দিয়ে মহাভারতে একটা অতি সোজা প্রশ্নের জবাব কোথায় পাব বলতে পারেন?
প্রশ্নটা কী? ঘনাদা শিশিরের আওলড়েঙ্গে গোছের তাল ঠোকার সঙ্গে তার বাড়িয়ে ধরা সিগারেটের টিনটার ভেতরও আঙুল চালিয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন।
প্রশ্নটা হল—শিশির যেন ভেবে নিতে গিয়ে মুশকিলে পড়ে হঠাৎ দুম করে বলেছে, এই—এই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধটার কথাই ধরুন না। ওটা কবে হয়েছে কিছু বলতে পারেন? আছে সেকথা মহাভারতে কোথাও? কই, বলুন-না?
কিন্তু বলবেন কী করে? ঘনাদা তখন শিশিরের টিন থেকে হাতানো সিগারেটগুলোর একটা ধরাতেই ব্যস্ত।
ঘনাদা কি সত্যি ফাঁপরে পড়েছে নাকি? অতক্ষণ ধরে সিগারেট ধরানো নিজের সেই বেসামাল অবস্থা ঢাকবার একটা ফিকির। কিন্তু এ ফিকির আর কতক্ষণ চালাবেন?
চালাতে পারলেন না। সিগারেট ধরানো শেষ করে শিশিরের নতুন লাইটারটা নিজের মুঠোতেই রেখে দিয়ে ঘনাদা প্রশ্নটা যেন ঠিক শোনেননি এমন ভাব দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হ্যাঁ, কী যেন জানতে চাইছিলে?
ঘনাদাকে বেকায়দায় পেয়ে আমরা সবাই যেন ঘোড়ার মুখে লাগাম দিয়ে তৈরি। শিশিরের বদলে শিবই সবিস্তারে আমাদের প্রশ্নটা ঘনাদাকে শোনালে। তার সঙ্গে আমিই এবার শেষ তালটা ঠুকে দিয়ে বললাম, যা শুনলেন তার জবাবটা কোথাও আছে মহাভারতে?
আছে! ঘনাদার বেশ জলদগম্ভীর স্বর। এটা ফাঁকা আওয়াজ না, সত্যিকার একটা পাকা চালের পাঁয়তারা পরখ করবার জন্য যা বলব ভাবছিলাম তা আর বলবার দরকার হল না।
ঘনাদা নিজে থেকেই বললেন, অভিমন্যু বধটা পড়েছ?ভাল করে পড়ে দেখো।
অভিমন্যু বধ পড়ব? কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের তারিখ জানতে?
আমাদের সকলের সব কটা চোখই তখন বুঝি কপালে। কিন্তু ধাঁধাটা যাঁর সরল করবার দায়, তিনি তো হঠাৎ আরামকেদারা ছেড়ে উঠে এ ঘর ছেড়েই চলে যাচ্ছেন। শিশিরের লাইটারটা অবশ্য ফেরাতে ভুলে গিয়ে।
