একটু থেমে চিংড়ি আবার বললে, গুলি করেও কোনও লাভ নেই অবশ্য। তোমার ওই রিভলভার আমি আগে দেখিনি মনে করেছ? এর মধ্যে আমায় মারবার মতো একটি গুলিও আমি রেখেছি? সুতরাং শান্ত হয়ে আমার কথা শোনেনা। শোনো, দেশকে ভালবাসো বলে নাৎসিদের দলে একসময় ভিড়েছিলে বটে, কিন্তু নীচ নোংরা কাজ কখনও করোনি। তা ছাড়া এককালে খ্রিস্টান সাধু হয়ে আফ্রিকার এই ক্যামেরুনস অঞ্চলের হতভাগ্য অধিবাসীদের মধ্যে থেকে তাদের সেবায় জীবন কাটিয়ে তাদের উন্নতির জন্য যা দরকার, তা করবার ইচ্ছে তোমার ছিল। আজ আবার সেই সুযোগই তোমার এসেছে। এই আগ্নেয়গিরির অজানা অঞ্চলে অসংখ্য বিষাক্ত গ্যাসের পাতাল-গুহা আছে। সেই সব গোপন গুহা থেকে বিষাক্ত গ্যাস মাঝে মাঝে বেরিয়ে আদিবাসীদের সব বসতি ধ্বংস করে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়। তাদের রক্ষা করবার ব্রত নিয়ে তুমি এই অঞ্চলে নিশ্চয়ই একটি মঠ গড়ে তুলতে পারো। সেই মঠ ধর্মের জন্যও যেমন, বিজ্ঞানের গবেষণাতেও তেমনই তন্ময় হয়ে থাকবে। অন্য সব কাজের মধ্যে এখানকার বিষবাষ্প জমানো গুপ্ত গুহার খবর রাখাই হবে তোমার মঠের প্রধান দায়িত্ব। এখানে সেরকম কিছু বেয়াড়া ব্যাপারের আভাস পেলেই তুমি যত তাড়াতাড়ি পারো তোমার জংলি আদিবাসী ভক্তদের দিয়েই রাজধানীতে না পারো অন্য কোনও ব্যবসার ঘাঁটিতে খবর পাঠাবে। সময়ে খবর পেলে এ বিষবাষ্পের সর্বনাশা ক্ষতি হয়তো ঠেকানো যাবে।
চিংড়ির কথা শুনে ব্রুল সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে ওই নিয়ল হ্রদের কাছেই তার মঠ স্থাপনা করেছিল। অন্তত করেছিল বলেই আমার ধারণা। গুপ্ত সব গুহা থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে যে ভয়ংকর সর্বনাশ এবার হয়ে গেল, তার আভাস পেয়ে, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কুল তা জানাবার জন্য তার আদিবাসী দূতকে নানা জায়গায় পাঠিয়েছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু ওই ফাং থেকে ফুলানি থেকে হাউসায় কথা চালাচালি করায় কোথাও না-কোথাও ভুল হওয়ার জন্যই সে-খবর আমাদের সভ্য জগতে পৌছয়নি। কিংবা—
কিংবা কী ঘনাদা, আমরা উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
কিংবা–ঘনাদা একটু ধীরে ধীরে বললেন, সেই চিংড়ির সঠিক পরিচয় জানার কৌতূহলটা তার কাছে এত বড় হয়েছে যে, সেই সন্ধানে বেরিয়ে আর তার আফ্রিকায় ফিরে মঠ গড়া হয়নি।
সত্যিই দুঃখের কথা, সহানুভূতি জানিয়ে আমরা বললাম, কিন্তু ওই চিংড়ি সত্যিই কে বলুন তো, ঘনাদা?
বনোয়ারির হাতে খাবারের প্লেট সাজানো ট্রে তখন এসে পড়েছে। ঘনাদার কাছে। কোনও উত্তর পাওয়া গেল না।
জয়দ্রথ বধে ঘনাদা
(১)
মহাভারতে নেই।
না, আছে।
কোথাও নেই।
আলবত আছে। ওই মহাভারতেই।
বাজে কথা। পড়েছ মহাভারত?
পড়েছি বলেই বলছি। ওই মহাভারতেই আছে, ভালো করে পড়ে দেখো।
ওপরের কোটেশন চিহ্ন দেওয়া বাক্যালাপগুলো পড়েই ওগুলোর অকুস্থল বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেন নামে কোনও গলির একটি না নতুন না-পুরাতন মুক্তছাদের একটি মাত্র ত্রিতল নাতি-প্রশস্ত গৃহযুক্ত অট্টালিকা বলে যাঁরা ধরে নিয়েছেন, তাঁরা ভুল কিছু করেন নি।
কথাগুলি ওই বাহাত্তর নম্বরের দোতলার বৈঠকি ঘরেই শোনা গেছে। এবং সেগুলি তেতলার টঙের ঘরের সেই তিনি-কে শোনাবার জন্যই উচ্চারিত।
কিন্তু এ মেসবাড়ির সে মামুলি দস্তুরের সঙ্গে মিল ওইটুকুই—ওই ন্যাড়া ছাদের সিঁড়িতে টঙের ঘরের তাঁর চটির শব্দ পাওয়া থেকে সে শব্দ বারান্দায় এসে পৌঁছনো পর্যন্ত গলা ছেড়ে তাঁকে শোনাবার মতো আওয়াজে ওইসব আলাপ উত্তেজিত হয়ে চালিয়ে যাওয়া।
মিলটা তারপর ওইখানেই শেষ। তাঁর চটির আওয়াজ বারান্দা থেকে আমাদের বৈঠকি ঘরের দিকে এগগাবার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের চাল একেবারে আলাদা। অনেকদিন অনেক গোপন পরামর্শসভার তর্কাতর্কির পর ঘনাদার ওপর এই চাল। চালাই সাব্যস্ত হয়েছে।
এ চালের স্বপক্ষে সবচেয়ে জোরালো ওকালতি করেছে গৌর। বলেছে, ঘড়ি কি টিকটিক বন্ধ করে টিকতে পারে? জিন্দা আর জাগা থাকলে গোলা পায়রা কি বকবকম থামাতে পারে? নিলেমের হাটের ফড়ের সবচেয়ে বড় সাজা কী? কথার তুবড়ি ছোটাতে না পারুক, দু-চারটে জুতসই ফোড়ন কাটতে না পারা। ঘনাদাকে সেই সাজাই আমরা দেব।
তারপর দেখব, গৌরকে মদত দিয়েছে শিশির, এ সাজায় চিড়বিড়িয়ে মৃগীর রুগি না হয়ে উঠে উনি ক-দিন চাঙ্গা থাকতে পারেন?
ঘনাদাকে এই মোক্ষম সাজা দিতেই আমরা ক-দিন এই নতুন চাল চালছি! চাল খুব ঘোরালো প্যাচালো কিছু নয়। শুধু ঘনাদার মুখে এক রকম কুলুপ দেওয়ার ব্যবস্থা।
চালটা সোজাসুজি তাই এই। সকাল বিকেল তেতলার ন্যাড়া ছাদ থেকে নামবার সিঁড়িতে ঘনাদার চটি ফটফটানি শুনলেই আমরা তাঁকে শোনাবার মতো ছাড়া গলায় ওই মহাভারত বা আর কিছু নিয়ে জোর তর্ক শুরু করব। কিন্তু তিনি বারান্দায় নেমে বৈঠকি ঘরে এসে ঢোকার আগেই সব একেবারে চুপ।
তিনি প্রথমবারে ওই অবস্থায় ঘরে এসে মুখে কিছু বলেননি, শুধু একটু সন্দিগ্ধ বিস্ময়ে আমাদের সকলের মুখের ওপর চোখ বুলিয়েছিলেন।
কিন্তু আমরা সবাই তখন একেবারে ধোওয়া তুলসি পাতা। খল প্যাঁচ কিছু আমাদের মুখে ফুটবে কোথা থেকে?
দ্বিতীয়বার ঘনাদা আর মুখ না খুলে পারেননি।
সেদিন আমরা একটু অপ্রস্তুতই ছিলাম। ঘনাদা তাঁর বাঁধাধরা সময়ের একটু আগে নেমে আসায় ভেবেচিন্তে তৈরি করে রাখা কিছু তর্ক তুলে তাঁকে ছটফটানি ধরাবার ব্যবস্থা করতে পারিনি। তার জায়গায় হঠাৎ ন্যাড়া সিঁড়িতে তাঁর চটির আওয়াজ পেয়ে যা তৎক্ষণাৎ মাথায় এসেছে তাই শুনিয়েছি গলা চড়িয়ে।
