ব্লুল সাহেবের এ-মূর্তি গোধা কখনও দ্যাখেনি। সে একটু থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করলে, গর্তে ফেলে দেব? ওই বিষাক্ত গ্যাসের গহূরে?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, তা-ই ফেলবি, ব্রুল গর্জন করে উঠল, ছোটখাটো নয়, সবচেয়ে গভীর যে গহ্বর, সেইটাতে। কী করেছে এই চিমসে চিংড়িটা তা জানিস? জানিস ও কে?
কিন্তু সে সব কথা শোনার জন্য গোধা আর তখন সেখানে দাঁড়িয়ে নেই। চিংড়িকে দু হাতে শূন্যে তুলে ধরে সে তখন তাঁবু থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছে।
তারপর কতক্ষণ বা আর পাঁচ, বড়জোর সাত মিনিট-কী করবে ঠিক করতে
পেরে ব্রুল তখন তার তাঁবুর ভেতর খাঁচায় ভরা বাঘের মতো এদিক থেকে ওদিকে পায়চারি করছে।
সেলাম সাহেব! তার অস্থির পায়চারির মধ্যে ডাকটা শুনে বুল চমকে ফিরে তাকিয়ে অবাক।
তাকে তাঁবুর দরজার পর্দা সরিয়ে ডাকছে লোধা কি গোধা নয়, ডাকছে চিমসে চিংড়িটা।
অ্যাঁ, তুই! ব্রুলের গলায় বিস্ময়ের সঙ্গে বেশ একটু ভয় মেশানো-গোধা কোথায় গেল?
কোথাও যায়নি, চিংড়ি যেন আশ্বাস দিয়ে বোঝাল, তবে একটু ভাল ব্যান্ডেজ বাঁধবার ব্যবস্থা করতে হবে। আর আপাতত একটু টিংচার আয়োডিন।
টিংচার আয়োডিন? ঝুল যেন রাগে দুঃখে চিৎকার করে উঠল, এমন অবস্থা হয়েছে যে, টিংচার আয়োডিন লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা দরকার? লোধা, লোধা, লোধা কোথায়?
না, না, তার তেমন কিছু হয়নি, চিংড়ি আশ্বাস দিলে, সেই তো দাদা গোর্ধকে বয়ে আনছে। তেমন জখম হলে কি পারত?
জখম হয়েও সে-ই দাদাকে বয়ে নিয়ে আসছে? বুলের গলায় যেন রাগ-দুঃখ-মেশানো আর্তনাদ ঠেলে উঠছে, এখন আমি কী করব বলতে পারো কেউ?
আমি পারি, চিংড়ি সান্ত্বনা দিয়ে বললে। তাতে ব্রুল আবার জ্বলে উঠল। হঠাৎ একটা ড্রয়ার থেকে তার রিভলভারটা বার করে চিংড়ির দিকে সেটা উঁচিয়ে ধরে সে গর্জন করে বললে, তোকে আমি গুলি করে মারব। যা তোর নাম, সে-ই চিংড়ি কি ইদুরের মতো।
রিভলভারের সামনে দাঁড়িয়েও চিংড়ি কি নির্বিকার? না। রীতিমত যেন ভয় পেয়ে সে বললে, থামো, থামো, ব্রুল, হুট করে এমন যা-তা করে ফেললা না। ও রিভলভারে আমাকে মারলে কী হবে তা একটু ভেবে দেখেছ? আমায় গুলি করে মারা মানে তোমার কী ভয়ানক বিপদ?
তোকে মারলে আমার বিপদ? ব্লুল জ্বলে উঠে বললে, তোর মতো একটা ছুঁচোকে মারলে–
থামো, থামো। চিংড়ি যেন কাতর মিনতি করে বললে, নেহাত যদি মারতেই চাও তো আমার পরিচয়টা তার আগে একবার ঠিক করে জেনে যাও। আমায় একবার বলছ ইঁদুর, তারপরে আবার চিংড়ি, তারপর আবার বললে ছুঁচো। আমি তোমার চোখে ঠিক কোনটা সেইটা মরার আগে-আগে জেনে যেতে চাই। সেই সঙ্গে এটুকু শুধু নিবেদন করতে চাই যে, চিংড়ি, ইঁদুর ছুঁচোকে কেউ গুলি করে মারে না। তাদের—
তু-তুই—, রাগে প্রায় তোতলা হয়ে ব্রুল গর্জন করে বলবার চেষ্টা করলে, হ্যাঁ, আমার সঙ্গে রসিকতা করছিস? এত বড় তোর সাহস? ভাবছিস, তোকে আমি গুলি করে মারতে পারি না? তোর মতো একটা ছুঁচো, একটা চামচিকে—
থামো, থামো, চিংড়ি এবার ঠাণ্ডা গলায় ঝুলকে যেন শান্ত করতে চাইলে, ছুঁচো, চামচিকে, ইঁদুর, চিংড়ি—যা-ই আমি হই না কেন, আমায় গুলি করে নিশ্চয়ই তুমি মারতে পারো, কিন্তু মারলে কী হবে তা একটু ভেবে দেখেছ?
কী ভেবে দেখব? ব্লুল চিৎকার করে বললে, তোকে মারলে কোন আইনে কে। আমাকে এখানে ধরবে? তোকে এই রিভলভারের গুলিতে বাঁঝরা করে লাশটা শুধু ওই একটা বিষাক্ত গ্যাসের পাতাল-গুহায় ফেলে দেব।
হ্যাঁ, তা দিতে পারো, চিংড়ি যেন তা স্বীকার করে নিয়ে বললে, কিন্তু তারপর?
তারপর মানে? ব্লুল দাঁত খিঁচিয়ে বললে, তারপর আবার কী?
তারপরেই যত গণ্ডগোল, যেন দুঃখের সঙ্গে জানালে চিংড়ি।
তারপরে গণ্ডগোল? তোর মতো একটা–তোর মতো একটা—
ব্রুলকে তার তোতলামির মধ্যে থামিয়ে দিয়ে চিংড়ি বললে, হ্যাঁ, আমার মতো ছুঁচো, ইঁদুর, চামচিকে, চিংড়ি, যা-ই বললা, তাকে মারার পর কত গণ্ডগোল শুরু, তা বুঝতে পারছ না? শোনো, বুঝিয়ে বলি। আমার মতো একটা ইঁদুর, চামচিকে, চিংড়ি যা-ই বলো, তাকে তোমার রিভলভারে ঝাঁঝরা করে একটা বিষাক্ত গ্যাসের পাতাল-গুহায় না হয় ফেলে দিলে। কিন্তু তারপর তুমি নিজেই যে একেবারে অথই গাজায় পড়বে, তা বুঝতে পারছ কি?
তোকে পাতাল-গুহায় ফেলে আমি অথই গাড্ডায় পড়ব?কথাগুলো রাগে গর্জন করে বলবার চেষ্টা করলেও ব্রুল তার হতভম্ব ভাবটা ঠিক লুকোতে তখন পারছে না। সে-ভাবটা যথাসাধ্য চাপা দিয়ে তবু দাঁত খিঁচিয়েই বললে, কেন? তুই ভূত হয়ে আমায় গাড্ডায় ঠেলে দিবি?
না না, ভূত হতে হবে কেন আমাকে? চিংড়ি বোঝাবার চেষ্টা করলে, আমি গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে কোনও পাতাল-গুহায় তলিয়ে গেলে তোমার কী অবস্থা হবে তা একটুও বুঝতে পারছ না? বুঝতে পারছ না যে, আমি না থাকলে তুমি তোমার ওই লোধা-গোধাকে নিয়েও কী অসহায়! ভুলে যাচ্ছ কেন যে, এই অজানা মরু-পাহাড়-জঙ্গলের দেশে আমি পথ দেখিয়ে তোমাদের নিয়ে এসেছি। আমি না থাকলে সারা জীবন খুঁজে খুঁজেও এখান থেকে উদ্ধার পাবার পথের হদিস পাবে না। সুতরাং আমার লাশ যদি বিষাক্ত গ্যাসের পাতাল-গুহায় পড়ে থাকে, তা হলে তোমার লাশও এখানকার মরু-পাহাড়-জঙ্গলে কোথাও রোদে-বৃষ্টিতে শুকোবে কি পচবে, কিংবা এখানকার সিংহ-চিতা-নেকড়ের মতো হিংস্র প্রাণীদের পেটেও যেতে পারবে। তাই বলছি, আমায় মারার মতো অমন ভুল করার চেষ্টাও কোরো না।
