কিন্তু পার হবে কী করে? কেনেথ হতাশভাবে বলেছে, বললাম না, আমার কাছে শুধু একটা পিস্তল আর একটা ছোরা। পার হবার আগেই ওদের গণ্ডা গণ্ডা বন্দুকে আমি তো ঝাঁজরা হয়ে যাব।
কিছু হবে না! বন্দুকের মিস্ত্রি জোর দিয়ে বলেছে, প্রথমত তুমি আফ্রিকার শিকারি, জঙ্গলে কি করে নিঃসাড়ে গাছপালার সঙ্গে মিশে গিয়ে চলাফেরা করতে হয় তা তুমি ওদের সাতজন্ম শেখাতে পারো। সুতরাং ওরা এমনিতে তোমার হদিসই পাবে না। আর যদি বা পায়, ওদের কোনও বন্দুকের গুলি তোমার ডাইনে বাঁয়ে দু-গজের মধ্যে পৌঁছবে না।
দু-গজের মধ্যে পৌঁছবে না? ঘোর অবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছে কেনেথ, এ কী ঝাড়ফুঁক মন্ত্র নাকি?
না, মন্ত্র নয়, যন্ত্রযন্ত্রের কেরামতি, বলেছে বড় মিস্ত্রি, তুমি তাতে বিশ্বাস করে নির্ভয়ে চলে যাও। আর দেরি না করাই ভাল!
কিন্তু আপনি! যেতে গিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে সত্যিকার উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছে কেনেথ, আপনি যাবেন না আমার সঙ্গে?
না,বলে একটু থেমে বন্দুকের মিস্ত্রি কিছুটা কৌতুকের স্বরেই বলেছে, সত্যিকথা বলতে গেলে আমার এখন পোয়াবারো যাকে বলে তাই। যাকে সে হাত-পা বেঁধে কাঁচা চামড়ার গুদামের তাঁবুতে বন্দি করে ফেলে দিয়েছিল সকাল না হতেই টাইকুন ট্যানার তার কাছে ছুটে এল বলে! তারপর আমার আঙুল নাড়ায় টাইকুন ট্যানারকে ওঠবোস করাতে পারব। সোজা কথা নয়, দুনিয়ার সেরা সফরির সর্দার, তার গণ্ডা গণ্ডা সব বন্দুকে নিশানার চারধারে দু-গজের মধ্যে গুলি পৌঁছোচ্ছে না কেন, এ ধাঁধার উত্তরের জন্য তাকে বাঁদরনাচ করাতে করাতে আমি একদিন তাকে রাজধানী কাম্পালাতে বনবিভাগের বড়কর্তাদের হাতেই তুলে দেব। সুতরাং আমার জন্য তোমার ভাবনা করবার কিছু নেই। আর হ্যাঁ, তুমি নিজের প্রাণের মায়া ছেড়ে দিয়ে আমাকে বাঁচাবার জন্য যে এখানে এমন করে এসেছ, এ ঋণ আমি কোনওদিন ভুলব না। কখনও কোথাও যদি দারুণ বিপদে পড় তাহলে, তোমার হাতে যা দিয়েছি, ওই জার-বোয়ার ছাপ দেওয়া একটা বিজ্ঞাপন বিলেতের লন্ডন টাইমসে ছাপাবার ব্যবস্থা কোরো। আমি যেখানেই থাকি সে বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে তোমায় আমার তখনকার ঠিকানা জানাবই। তারপর তুমি আমার ঠিকানায় চিঠি লিখে তোমার বিপদ আর ঠিকানা জানালেই—আমি বেঁচে থাকলে—তোমার পাশে গিয়ে দাঁড়াবই, এটা নিশ্চিত জেনো।
ক্যাম্বিস ব্যাগের ভদ্রলোক দম নেবার জন্যই একটু থেমে বললেন, ক-দিনের জন্য আপনাদের এই শহরটা ছুঁয়ে যাবার সময়ই লন্ডন টাইমসের বিজ্ঞাপনটা দেখে হাতের কাছে পেয়ে আপনাদের এই বাহাত্তর নম্বরের ঠিকানাটাই জানিয়ে লিখে পাঠিয়ে দিয়েছি বলে একটা উত্তর না আসা পর্যন্ত আর নড়তে পারছি না। আপনাদের তাই বাধ্য হয়ে একটু কষ্ট দিচ্ছি।
না, না, কষ্ট কীসের? আমরা প্রায় সমস্বরে বলেছি, যতদিন লন্ডন টাইমসের বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে কোনও চিঠি না পান ততদিন আপনি থাকুননা এখানে—ওই ওপরের টঙের ঘরটা পছন্দ হলে সেখানেই থাকুন। কিন্তু একটা কথা শুধু জিজ্ঞাসা করছি, টাইকুন ট্যানার আপনাকে বন্দুকের পাকা মিস্ত্রি বলে তার সফরিতে নিয়েছে আবার শিকারি কেনেথকে আপনি যেভাবে জার-বোয়া ছাপের তাবিজ-পরা আফ্রিকার গুপ্ত বিপ্লবীদলের খবর দিয়ে ভরসা দিয়েছেন তাতে মনে হয় ওই জার-বোয়া ছাপের গুপ্ত দলের সঙ্গেও আপনার ভালরকম যোগাযোগ ছিল। এখন আবার আপনাকে দেখছি এই আমাদের কলকাতা শহরে। আসল পরিচয়টা তাহলে আপনার কী?
হ্যাঁ, কেনেথও ওই কথা জিজ্ঞাসা করেছিল আমাকে চামড়ার জার-বোয়া ছাপ নিয়ে তাঁবু থেকে জঙ্গলের পথে চলে যাবার সময়। তাকে যা বলেছিলাম, তাই আপনাদের বলি—নিজের পরিচয় কি কেউ আমরা জানি! সেই পরিচয়ই তো সবাই খুঁজছি সারা জীবন।
আমাদের হতভম্ব করে ওইটুকু বলেই টেবিল থেকে ক্যাম্বিসের ব্যাগটা নিয়ে তিনি তেতলার ন্যাড়া ছাদের সিঁড়ির দিকে চলে গিয়েছিলেন।
ক্যাম্বিসের ব্যাগটা না থাক, ভদ্রলোক এখনও আমাদের টঙের ঘরেই আছেন। না থেকে উপায় কী? লন্ডন টাইমসের জার-বোয়া ছাপ-মারা বিজ্ঞাপনদাতার উদ্দেশে লেখা তাঁর চিঠির জবাব যে এখনও আসেনি।
ঘনাদার চিংড়ি বৃত্তান্ত
হয়তো! হ্যাঁ, বাক্যটা ঘনাদার মুখ থেকেই উচ্চারিত হল। কিন্তু কেমন যেন নিতান্ত অনিচ্ছায় ওই শব্দটুকু মুখ দিয়ে বার করেই গুম হয়ে গেলেন ঘনাদা।
কী হয়তো? কেন হয়তো? এমন অনেক প্রশ্নই তখন মনের মধ্যে তো বটেই, জিহ্বাগ্রেও যে এসেছিল, তা অস্বীকার করব না। কিন্তু ঘনাদার মুখ-চোখে একটা
অস্বাভাবিক গাম্ভীর্যের ছায়া দেখে তা উচ্চারণ করতে আর সাহস করিনি।
ঘনাদার মুখ দেখে তাঁর মনের ভাব বুঝব, এত বড় ধুরন্ধর আমরা কেউ নই, তবু মনে হচ্ছিল একটা কী বিষয়ে তিনি যেন নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে মনঃস্থির করতে পারছিলেন না।
তাঁর মনে যে অস্থিরতাটা, সেটা এক হিসেবে না আর হ্যাঁ-এর দ্বন্দ্বও হতে পারে।
হয়তো বলে তিনি যে একটা সম্ভাবনার আভাস দিচ্ছিলেন, সেটা আমাদের কাছে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি প্রকাশ করবেন কি না, এই নিয়েই তাঁর মনে বেশ প্রবল দ্বিধা ছিল বলে মনে হয়।
শেষ পর্যন্ত এ-দ্বিধার মীমাংসায় না-এর উপরে হ্যাঁ-ই যে জয়ী হল, এ আমাদের ভাগ্য।
হ্যাঁ। মনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠে ঘনাদা তাঁর হয়তোকে বিস্তারিত করে বললেন, হয়তো সে ঠিক খবরই পাঠিয়েছিল। কিন্তু–
