বন্দুকের মিস্ত্রি একটু ভেবে নিয়ে প্রস্তাবটায় রাজি হয়েছে। আর ঘণ্টাকানেক বাদে বাক্সবন্দী সব বন্দুক খুলে চালু করে দিয়ে তার পাওনা আর বকশিশ চেয়েছে।
বন্দুকগুলো সব হাতে পাওয়ার পর নিজমূর্তি ধরেছে ট্যানার। পাওনা আর বকশিশ চাও? সে যেন কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে বলেছে, দুই-ই পাবে এখনই।
পাওনাটা সে তখনই মিটিয়ে দিয়েছে, তার নিজের ক-জন দৈত্যাকার কাফ্রি সেপাই দিয়ে বন্দুকের মিস্ত্রিকে ধরে বেঁধে শিকার করা জানোয়ারদের ছাড়ানো চামড়া জমা করা একটা তাঁবুতে বন্দি করে ফেলে রেখে। আর ফেলে চলে যাবার সময় আশা দিয়ে গেছে যে বকশিশটা দিয়ে যাবে দাঁতাল গজরাজকে মেরে তার গজদন্ত নিয়ে এখানকার আস্তানা তুলে চলে যাবার সময়ে হাত-পা বাঁধা অবস্থাতেই এই জঙ্গলে ফেলে রেখে দিয়ে।
বন্দুকের মিস্ত্রিকে হাত পা বেঁধে বন্দি করে চলে যাবার পর টাইকুন ট্যানার নিজেই কিন্তু পড়েছে মহা মুশকিলে। হাতি মারবার চালু বন্দুক তো সে হাতে পেয়েছে, কিন্তু সে বন্দুক ছুঁড়বে কে? বন্দুক উদ্ধারের পর খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে শিকারি বব কেনেথকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। খোঁজাখুঁজির মধ্যে তার তাঁবুতে তার লেখা একটা চিরকুট পাওয়া গেছে। বব কেনেথ তাতে লিখে গেছে যে হুকুমনামায় যা লেখা আছে তা অগ্রাহ্য করে বাড়তি দাঁতালো হাতি তো নয়ই, অন্য কোনও কিছু শিকার করে সে সারা আফ্রিকায় অচ্ছুৎ শিকারি হিসেবে দাগী হয়ে নিজের সব রুজি-রোজগার আর ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পারবে না। সেই জন্যই টাইকুন ট্যানার-এর জবরদস্তি এড়াতে নিজের ন্যায্য পাওনাগণ্ডা না নিয়েই তাকে পালাতে হচ্ছে।
পালাতে হচ্ছে, কিন্তু পালিয়ে যাবি কোথায়? কেনেথের লেখা চিরকুট পড়তে পড়তে রাগে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলেছে টাইকুন ট্যানার, আমার সমস্ত লোকলস্কর লাগিয়ে সারা উগাণ্ডা চষে তোকে খুঁজে বার করব-ই।
যে কথা সেই কাজ। ট্যানার গজরাজের সন্ধান ছেড়ে কেনেথকে খুঁজতেই তার সফরির সকলকে লাগিয়েছে তখুনি। এমন বেড়াজালে জঙ্গল ঘিরে তল্লাশি চালিয়েছে যাতে একটা খরগোশও না গলে পালাতে পারে।
কিন্তু এই বেড়াজালে ঘেরা তল্লাশির ভেতর দিয়ে শিকারি কেনেথ গলে এসেছে। এসেছে রাতের অন্ধকারে টাইকুন ট্যানার-এর সফরির তাঁবু মহল্লায়। সেখানে নিঃশব্দে বন্দুকের মিস্ত্রিকে বন্দি করা শিকারে মারা জানোয়ারদের চামড়া রাখা তাঁবুতে ঢুকে সে কিন্তু অবাক। হাতে একটা ছোরা নিয়ে সে যতটা নিঃশব্দে সম্ভব হামাগুড়ি দিয়ে তাঁবুতে ঢুকেছিল বড় মিস্ত্রির বাঁধন কেটে তাকে মুক্তি দেবার জন্য। কিন্তু হাত-পা-র বাঁধন কেটে সে মুক্তি দেবে কী, বড় মিস্ত্রি নিজেই আগে থাকতে বাঁধনটাধন খুলে সেখানে বসে আছে। কেনেথ খানিকটা হামাগুড়ি দিয়ে যাবার পর হঠাৎ চমকে উঠে শুনেছিল—কে তাকে ফিসফিস করে বলেছে, আর না, ছোরাটা খাপে খুঁজে এবার উঠে বোসো।
গলাটা যে বড় মিস্ত্রিরই তা বুঝে একেবারে হতভম্ব হয়ে উঠে বসে কেনেথ দেখেছিল, বন্দুকের মিস্ত্রি হাত-পা খোলা অবস্থায় তার সামনে বসে একটা চামড়ার টুকরোয় কী যেন করছে।
কেনেথকে উঠে বসতে দেখে সেকাজ থামিয়ে মিস্ত্রি বলেছে, পালিয়ে গিয়েও তুমি যে ফিরে এলে?
এলাম আপনারই বাঁধন কেটে আপনাকে মুক্ত করা যায় কি না চেষ্টা করে দেখতে। কিন্তু আপনি নিজেই যে বাঁধন খুলে বসে আছেন। কী করে খুললেন ওই জংলি কাফ্রি দৈত্যগুলোর অমন শক্ত বাঁধন?
কী করে খুললাম? বন্দুকের মিস্ত্রি একটু যেন হেসে বলেছে, সময় পেলে তোমায় শিখিয়ে দেব, কিন্তু এখন তুমি আর সময় নষ্ট কোরো না। এখুনি পালাও আর যাও উত্তর দিকে!
উত্তর দক্ষিণ কোনও দিকেই আর আমি যেতে চাই না, বেশ হতাশভাবে এবার বলেছে শিকারি কেনেথ, আমার হাতের এই ছোরাটা আর কোমরবন্ধের এই পিস্তলটা ছাড়া আমার কাছে আর কিছু নেই। এই নিয়ে গণ্ডা গণ্ডা যাদের কাছে রাইফেল আর বন্দুক আর কমপক্ষে ষাট-সত্তর জন জঙ্গল ঠেঙিয়ে খোঁজবার লোক-লস্কর তাদের বিরুদ্ধে আমি কী করব আর কোথায় পালাব? পালাতে হলে আপনি নিজে পালাননি কেন?
আমি? বন্দুকের মিস্ত্রি একটু যেন অবাক হয়ে বলেছেন, হ্যাঁ, আমি পালাইনি বটে, তবে এই কাজটা করতে এমন তন্ময় হয়ে গেছলাম যে সময়টা কত কেটেছে ঠিক খেয়াল করিনি।
এমন অবস্থাতেও সময়ের খেয়াল যার জন্যে করেননি সেটা কী এমন কাজ? শিকারি কেনেথ রীতিমতো অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন।
কাজটা কিছু নয়, এই চামড়ার টুকরোর ওপর একটা পেরেক দিয়ে আঁচড়কাটা একটা ছবি! বলে বড়মিস্ত্রি চামড়ার টুকরোটা কেনেথের হাতেই তুলে দিয়ে বলেছে, এটা তুমিই রাখখা। তোমার কাজে লাগবে।
আমি কাছে রাখব এই চামড়ার আঁচড়কাটা টুকরো? এটা আমার কাজে লাগবে? কী বলছেন কী আপনি! বন্দুকের মিস্ত্রির মাথাটা ঠিক আছে কি না সে বিষয়েই সন্দেহ ফুটে উঠেছে এবার কেনেথের কথায়।
যা বলছি আজগুবি শোনাচ্ছে, না? হেসে জিজ্ঞাসা করেছে বড় মিস্ত্রি, কিন্তু হাতে-হাতে ফল পেলেই বুঝবে আবোলতাবোল কিছু বলিনি। তোমার হার্তে যে চামড়ার টুকরোটা দিয়েছি তাতে আঁচড় কাটা কীসের ছবি তা জানো? জানবার কথাও নয়। ওটা আঁচড় কেটে যা দেখাবার চেষ্টা হয়েছে সেটা একটা জার-বোয়া। আফ্রিকার ঝানু শিকারি হলেও জার-বোয়া কাকে বলে হয়তো জানো না। জার-বোয়া হল একরকম মরু অঞ্চলের অদ্ভুত ইঁদুর। ইঁদুর না বলে খুদে ক্যাঙ্গারুও বলা চলে। সামনের পা দুটি ছোট ছোট আর পেছনেরগুলি ক্যাঙ্গারুর মতো লম্বা বলে শরীরের তুলনায় অনেকদূর পর্যন্ত লাফ দিতে পারে। তোমায় এখান থেকে পালিয়ে উত্তরদিকে যেতে বলেছি, এই উত্তরে চাড় থেকে শুরু করে সাহারার মরুভূমিতে এই খুদে ক্যাঙ্গারু জার-বোয়াদের পাওয়া যায়। এই জার-বোয়ার ছাপমারা তাবিজ-পরা আফ্রিকায় এক গুপ্তসমিতি আছে। তারা আফ্রিকাকে ইউরোপের সাদা চামড়ার লোকেদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করবার জন্য গোপনে বিরাট আয়োজন করে যাচ্ছে। তারা তোমার হাতের ওই জার-বোয়ার আঁচড় কাটা চামড়ার টুকরোটা দেখলেই তোমায় নিরাপদে সাহারা পেরিয়ে মিশরের কায়রো পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়ে আসবে। এখন তুমি শুধু উত্তরমুখো গিয়ে উগাণ্ডাটা পার হয়ে যাও।
