কিন্তুর পর যে দীর্ঘ নীরবতা, সেটা প্রায় যন্ত্রণায় পৌঁছে দিয়ে ঘনাদা তাঁর বক্তব্যটা পেশ করলেন। বললেন, কিন্তু কানুড়ি থেকে ফাং-এ অনুবাদ করাতেই হয়তো ভুল হয়েছে। আর, তারপর হাউসায় তার কানগুলো ধান হয়ে সব এমন বরবাদ করে দিয়েছে যে, আমি সোজার বদলে উলটো খবরই পেয়েছি।
মুখটা তাঁর পক্ষে যতখানি সম্ভব করুণ করে ঘনাদা চুপ করলেন। কিন্তু আমরা যে তখন একেবারে অকূল পাথারে! ঘনাদার প্রথম হয়তোর গরেই যেটুকু ফাঁপরে পড়েছিলাম, ফাং হাউসা কানুড়ির জালে জড়িয়ে তা যে একেবারে গোলক ধাঁধার ফাঁদ হয়ে উঠল।
কী বলছেন ঘনাদা? মানে, বলতে চাইছেন কী? সোজাসুজি সে-কথা যে জিজ্ঞেস করব, তার উপায় নেই। কারণ অমন বেয়াদপিতে উত্তর যা মিলবে, তাতে নখ কাটাতে গিয়ে আঙুল কাটিয়ে ফেলার ঝক্কি নেওয়া হবে।
তার চেয়ে ধৈর্য ধরে একটু অপেক্ষা করাই ভাল। নিজের পাকানো জট ঘনাদা সময়মত নিজেই কি আর খুলবেন না?
সেই ধৈর্য ধরেই থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অবুঝ গৌরটার জন্য তা থাকা আর হল কই?
কী হাং ফাং করছেন? ঘনাদাকে সে একটু গরম গলাতেই জিজ্ঞেস করে বসল, হিং টিং ছটের মতো মন্তর-টন্তর নাকি?
না, মন্তর-টন্তর নয়? ঘনাদার গলার ঝাঁঝটুকু আর লুকনো নেই এবার, কিন্তু ওগুলো কী, বোঝাতে গেলে একটু ভূগোলের পরীক্ষা আগে নিতে হবে।
ভূগোলের পরীক্ষা? সভয়ে জিজ্ঞেস না করে পারলাম না, কী পরীক্ষা, ঘনাদা?
না, এমন কিছু পরীক্ষা নয়, ঘনাদা আশ্বাস দিয়ে বললেন, শুধু ক-টা অতি সোজা প্রশ্নের জবাব। যেমন, কোন দেশে একসঙ্গে আবলুস, সেগুন, মেহগনির সঙ্গে প্রচুর তাল-তমাল যেমন পাওয়া যায়, তেমনই প্রচুর পাওয়া যায় অভ্র, ম্যাঙ্গানিজ, টিন, বক্সাইড থেকে হিরে আর সোনা?
একটু থেমে আমাদের মুখের ভাবটা লক্ষ করে ঘনাদা এবার বললেন, এ সব যদি একটু কঠিন প্রশ্ন মনে হয় তা হলে একটা মাত্র অতি সোজা প্রশ্ন করছি। যার উত্তর জানলে দেশটার নাম বলতে কিছুমাত্র অসুবিধে হবে না। প্রশ্ন হল এই, কোন দেশে এই শতাব্দীর গোড়ায় ১৯০৯ আর ১৯২২-এ দু-দুবার এক আগ্নেয়গিরি থেকে দারুণ অগ্নদগার হয়েছে?
কী জবাব দেব এ সব প্রশ্নের?
ভ্যাবাচাকা ভাবটা কোনওরকমে লুকোবার চেষ্টা করে মাথা চুলকোবার অভিনয়ই করছিলাম, তারই মধ্যে শুনুন, ঘনাদা বলে গৌর হঠাৎ মুখ খোলায় সত্যিই সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলাম।
ঘনাদা এমনিতেই খুব ভাল মেজাজে আছেন বলে মনে হচ্ছে না। তার ওপর বেয়াড়া কিছু বলে গৌর যদি তাঁকে গরম করে দেয় তা হলে অন্তত আজকের দিনের মতো আমাদের বাহাত্তর নম্বরের মজলিশ একেবারে মাটি।
কিন্তু ভয় যা করছিলাম, উলটোটাই তার হল।
জাতে পাগল হলেও গৌর যে তালে ঠিক তা বোঝা গেল তার পরের কথায়! বেয়াড়া কিছুর বদলে, গরম হওয়ার বদলে ঘনাদা তাতে গলে একেবারে জল।
কী এমন বললে গৌর, যাতে খোঁচানো সাপও ফণা তুলতে ভুলে যায়? কী সে মন্তর?
না, হাত কচলানো খোশামুদি গোছের কিছু নয়। বরং তাতে ফোঁস করার ঝাঁঝই একটু আছে বলা যায়। কিন্তু কাজ হল ওই ফোঁসানির সুরেই।
মিষ্টি সুরে-টুরে নয়, গৌর ঘনাদার ওপর অভিমানেই নালিশ জানিয়ে বললে, অত ভূগোলের পরীক্ষা যদি দিতে হয়, তা হলে পি. আর. এস., পিএইচ. ডি ডিগ্রির পিছনেই তো ছুটলে পারি! তার বদলে এই বাহাত্তর নম্বরে আপনার মুখ চয়ে হা-পিত্যেশ করে বসে থাকব কেন? মোড়ের দোকানে এক চেঙারি হিঙের কচুরির অর্ডার দিয়ে এসেছি। বনোয়ারি তা নিয়ে নীচের গেটের মুখেই বোধহয় পৌঁছে। গেছে। রামভুজের সেগুলো প্লেটে-প্লেটে সাজিয়ে পাঠাতে যা দেরি। কিন্তু এখন আর কী হবে তাতে, সব ঘাস লাগবে মুখে—হ্যাঁ, ঘাস।
গৌর চুপ করল এমন একটা হতাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে যে আমাদেরই দুচোখের পাতাগুলো কেমন যেন একটু ভিজে ভিজে হয়েছে মনে হল।
ঘনাদারও তা-ই হল কি না জানি না। কিন্তু তাঁর গলায় এবার যে সুরটা শোনা গেল, সেটা স্পষ্টই সান্ত্বনার।
আহা! হিঙের কচুরি ঘাস হতে যাবে কেন? তিনি আশ্বাস দিলেন, এই আমাদের মোড়ের জহর হালুইকরের হিঙের কচুরি তো? ও আজ বিকেলে আনিয়ে কাল সকালে মুখে দিলেও মুচমুচে থাকে। তবে
ঘনাদার হিঙের কচুরির কৌলীন্য-বিচার আর হল না। বিরাট ট্রে-র ওপর কচুরি-সাজানো প্লেট নিয়ে বোয়ারি তখন আড্ডাঘরের দরজা দিয়ে ঢুকল। সে ঢাকার আগেই তার ট্রের ওপরকার প্লেটে সাজানো কচুরির গন্ধেই অবশ্য আড্ডাঘর মাত হয়ে গেছে।
২.
বনোয়ারি তাঁর হাতেই প্রথম যে-প্লেটটা তুলে দিল, তার ডবল সাইজের কচুরির তাক যে প্লেটের ওপর প্যাগোড়ার মতো, তা বোধহয় আর বলতে হবে না।
সেদিকে চেয়ে অন্তরের খুশিটা অকপট উচ্ছাসে প্রকাশ করেই ঘনাদা বললেন, হিঙের কচুরি কী হে, এ তো রাধাচুরি! মানে রাধাবল্লভী আর কচুরির দ্বন্দ্বসমাস। তা বড় বেশি দিলে যে! এত কি আর এ বয়সে শেষ করতে পারব?
খুব পারবেন, খুব পারবেন, সবাই আমরা জোর গলায় আশ্বাস দিলাম, বয়স আপনার আর কী, চল্লিশই তো পার হয়নি।
চল্লিশ–! বলো কী হে! ঘনাদা বিষম খাওয়াটা কোনওরকমে সামলে বললেন, আমার চল্লিশ—।
মানে! চটপট বাধা দিয়ে বললাম, চল্লিশে পৌঁছে ঠেকে গেছে আর কী! পার হতে তো পারছে না। তাই বলছি–
তাই আর কিছু বলতে হল না। যে কারণেই হোক, ঘনাদা একটু বেশিরকম খুশি হয়ে তাঁর প্লেটের রাধাচুরি প্যাগোডার ওপর চুড়ো হিসেবে আরও দুটো শেষ করে চায়ে চুমুক দিতে দিতে শিশিরের এগিয়ে ও জ্বালিয়ে দেওয়া সিগারেটটায় ক-টা সুখটান দিয়ে যেন ধাতস্থ হয়ে, প্রায় মেজাজের অসীম প্রসন্নতার পরিচয় দিয়ে নিজে থেকেই গোড়ায় ধরা প্রসঙ্গটা স্মরণ করে বললেন, হ্যাঁ, ভূগোল শেখায় তোমাদের আপত্তি জানাচ্ছিলে, না? কিন্তু ভূগোলের প্রশ্ন কেন তুলেছিলাম জানো? তুলেছিলাম, যা বলতে যাচ্ছি, ভূগোল কিছুটা না-জানা থাকলে তার রহস্যটাই ঠিক বোঝানো যাবে না। ভূগোলের ক-টা সোজা প্রশ্ন মাত্র তোমাদের করেছি। প্রশ্ন আর-দুটো বেশি করলে হয়তো উত্তরটার আভাস তোমরাও পেতে। এই যেমন ক-টা প্রশ্ন করেছি তার ওপর যদি জানতে চাইতাম, কোন দেশে কোথায় গোরিলাও যেমন, সিংহও তেমনই পাওয়া যায়, তা হলে তোমরা চটপট উত্তর দিতে–আফ্রিকা। কিন্তু আফ্রিকা তো একটা বিরাট মহাদেশ। শুধু আফ্রিকা বললেই তো হবে না, আফ্রিকার কোথায় বোঝানো যাবে না। সুতরাং শুধু আফ্রিকা বললেই হবে না, আফ্রিকার কোথায়, সেটা সঠিক জানা চাই।
