নেব? ভদ্রলোক যেভাবে শিশিরের দিকে চেয়ে যে-গলায় নেব বললেন, তাতে প্রথমে মনে হল বুঝি শিশিরের তাঁকে সিগারেট দিতে চাওয়াটা অপমান জ্ঞান করে তিনি আসর ছেড়ে চলেই যাবেন উঠে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনে হল ভদ্রতার খাতিরেই শিশিরের স্পর্ধা সহ্য করে তিনি নরম হয়ে শিশিরের বাড়িয়ে দেওয়া টিনের উঁচিয়ে থাকা সিগারেটটা তুলে নিয়ে নিজের ওপরই বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, হ্যাঁ, প্যাকেটটা কোথায় যে ফেলে এসেছি কে জানে! হ্যাঁ, একটা কথা কিন্তু বলে রাখছি, কিছু মনে করবেন না। সিগারেট আমি কারও কাছে দান নিই না। সুতরাং এ সিগারেট আপনার কাছে ধার হিসেবেই নিলাম। মনে রাখবেন, আপনার কাছে একটি সিগারেট ধার রইল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই মনে রাখব, বলে শিশির তখন তাঁর সিগারেটটার জন্য তার লাইটারটা জ্বালিয়ে ধরেছে।
সে লাইটারের আগুনে সিগারেটটা ধরিয়ে তাতে দুটো রাম-টান দেবার পর প্রায় এক জালা ধোঁয়া ছেড়ে ভদ্রলোক বলেছেন, কী যেন বলছিলাম? হ্যাঁ, ওই টাইকুন ট্যানার-এর আতঙ্ক আর উল্লাসের কথা।
ঠিক! ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে টাইকুন ট্যানার তখন খুশিতে ডগমগ।
এই তো! টাইকুন ট্যানার-এর প্রাসাদের সিংহদরজার মান বাড়াবার জন্য এইটিরই দরকার ছিল। কম-বেশি প্রায় আশি কিলো ওজনের গজদন্ত নিয়ে কিছুদূরে স্বয়ং হাতিদের সম্রাট ঐরাবতই যেন তার সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে বনভ্রমণে বেরিয়েছে।
ট্যানার-এর হাতে বন্দুক ছিল না। আর থাকলেই বা সে করত কী? একবার তার দিকে ফিরে তাকে দেখতে পেলে গজরাজ কী করতে পারেন তাই ভেবে কাঁপতে কাঁপতে ট্যানার-এর গায়ে তখন যেমন ঘাম ছুটছে তেমনই আবার আশায় বুকও দুলছে যদি কোনওমতে হাতির পাল তার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে চলে যায় আর যদি তারপর কোনওমতে তাঁবুতে ফিরে সে দরকার মতো সকলকে ডাক দিয়ে এই হাতির পালের পিছু নিয়ে কেনেথকে দিয়ে আসল গজরাজকেই শিকার করতে পারে।
ট্যানার-এর ভাগ্য তখন ভাল। হাতির পাল নিয়ে গজরাজ নিজের খেয়ালে অন্য দিকে চলে যেতেই সে নিজের তাঁবুতে এসে সবার আগে বব কেনেথ আর সমস্ত বন্দুক পিস্তলের খোদ খবরদারির ভার যার ওপর সেই বড় মিস্ত্রিকে ডেকে পাঠিয়ে সমস্ত ব্যাপারটা জানালে। ভাগ্যের জোরে আপনা থেকে যা তার হাতের মুঠোয় এসে গেছে তার দেখা গজরাজের সেই দাঁতাল মুণ্ডটা যে তার চাই-ই, সক্কলকে সেটা সে জোর দিয়ে জানিয়েছে।
কিন্তু কই! এত বড় একটা খবরে কারওর কোনও সাড়াশব্দ নেই কেন? তার সামনে দুই মূর্তি যেন জড়ভরত হয়ে দাঁড়িয়ে।
কী? কী হল কী তোমাদের? টাইকুন ট্যানার এবার গর্জে উঠল, সব কালা বাবা হয়ে গেছ নাকি?
মানে?—আমতা আমতা করে এবার মুখ খুলল বব কেনেথ-বড় শিকার আর আমরা কি করতে পারি? আমাদের
আমাদের? ধমক দিয়ে কেনেথকে থামিয়ে দিয়ে টাইকুন ট্যানার আবার গর্জন করে উঠল, কী হয়েছে আমাদের? হাত ঠুটো হয়ে গেছে, না বন্দুকের সব বারুদ ভিজে গেছে? শিকার করতে পারব না কেন?
পারব না। বন্দুকের বড় মিস্ত্রি বেশ ঠাণ্ডা গলায় বললে, আমাদের পারমিটে আর বড় শিকারের অনুমতি নেই বলে। হুকুমনামায় যে কটা বড় শিকার আমাদের মারবার অনুমতি দেওয়া ছিল সব ক-টাই আমরা মেরেছি। দু-একটা ছোট শিকারের বন্দুক ছাড়া সব বন্দুক আমি তাই বাক্সবন্দি করে দিয়েছি।
কী করেছ, চিমসে চামচিকে? বলে ঘাড় ধরে বন্দুকের মিস্ত্রিকে শূন্যে তুলে টাইকুন ট্যানার বললে, বড় বন্দুক সব বাক্সবন্দী করে দিয়েছ?
হ্যাঁ, ট্যানারের হাতে ঘাড়-টিপে-ধরা অবস্থাতেই বন্দুকের মিস্ত্রি যেন সুখবর দেবার মতো গলায় বললে, শুধু বাক্সবন্দীই করিনি, তার আগে বন্দুকগুলোর কলকজা খুলেও দিয়েছি।
কলকজা খুলে দিয়েছিস! চিড়বিড়িয়ে উঠে টাইকুন ট্যানার বন্দুকের মিস্ত্রিকে আছড়ে মারবার মতো করে দূরে ছুঁড়ে দিয়ে বললে, তোকে আমি জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে মারব।
একটা ডিগবাজি খেয়ে বন্দুকের চিমসে মিস্ত্রি তখন কিছুদূরে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবুঝকে বোঝাবার মতো গলায় সে বললে, আমায় পুঁতে ফেলতে চান? তা অবশ্য আপনি পারেন। কিন্তু তাহলে আপনার ওই অত সাধের বন্দুকগুলোর মায়া যে ছাড়তে হবে। ওগুলোর কলকজা এখন খোলা। সেসব আবার জোড়া লাগাবার বিদ্যে অমন দু-পাঁচ হাজার মাইলের মধ্যে সারা উগাণ্ডায় আর কারওর নেই। আমি মাটির নীচে পোঁতা থাকলে ওসব বন্দুকের প্যাঁচ জানা মিস্ত্রির খোঁজে কাকে কোথায় পাঠাবেন? যাকে পাঠাবেন সে ঠিক ঠিকানায় পৌঁছবে কি! পৌঁছলেও কতদিনে সে ওস্তাদ মিস্ত্রি নিয়ে এখানে ফিরবে? আর যতদিনে ফিরবে ততদিন আপনি এখানে টিকে থাকতে পারবেন কি?
বন্দুকের মিস্ত্রি যতক্ষণ তার কথা শোনাচ্ছিল ততক্ষণ টাইকুন ট্যানার-এর মুখটা ছিল যেন বজ্রবিদ্যুৎ ঝড়বৃষ্টির ছবি ফোটানো ছায়াছবির পর্দার মতো। এই মনে হচ্ছিল রাগে দাঁত কিড়মিড়িয়ে হিংস্র হায়নার মতো সে ঝাঁপিয়ে পড়বে বন্দুকের মিস্ত্রির ওপর আবার মিস্ত্রির কথা শুনতে শুনতে নিজের অবস্থাটা বুঝে সে দমকা ঝড় হঠাৎ থেমে যাওয়ার মতো সামলাবার চেষ্টা করছিল নিজেকে। শেষ পর্যন্ত তার প্যাঁচালো বুদ্ধিরই জয় হয়েছে।
বেয়াড়া গরম মেজাজের জন্য নিজেই যেন নিজের কান মলে ট্যানার এবার যা বলেছে তার মর্ম হল এই যে বন্দুকের মিস্ত্রির ওপর রাগারাগি করা তার অন্যায় হয়েছে। মিস্ত্রির সঙ্গে সে মিটমাটই চায়। মিস্ত্রি যদি তার সব বন্দুকের কলকজা ঠিক করে সেগুলো চালু করে দেয় তাহলে সে, যা তার পাওনা, তার ওপর মোটা বকশিশ দিয়ে তাকে ছুটি দিয়ে যাবে।
