একটু থেমে আমাদের অবস্থাটা অনুমান করেই বোধহয় ভদ্রলোক তাড়াতাড়ি নিজের কথার ব্যাখ্যায় বিশদ হয়ে বললেন, সফরি মানে যে কী তা নিশ্চয় আপনারা জানেন, তবে টাইকুন ট্যানার-এর সফরির সঙ্গে এখনকার গোনাগুনতি খরচে ভাড়া করা সফরির আকাশ-পাতাল তফাত-জঙ্গলে বারশিঙা শিকার আর বাজার থেকে কাটা-পাঁঠার মাংস কেনার চেয়ে অনেক বেশি। টাইকুন ট্যানার-এর সফরি মানে একটা রাজসূয় ব্যাপার। বন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে যত খুশি যে কোনও প্রাণীশিকার আইন করে তখন বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু নামের আগে সিংহের ঘাড়ের কেশরের মতো টাইকুন শব্দটা যার জোড়া হয়ে গেছে, কোটিপতি ধনকুবেরদেরও যে শাহানশাহ, টেকসাস-এর সেই জীবন্ত ট্যাঁকশালা টাইকুন ট্যানার কি আইনের পরোয়া করে! সরি-তে গোনাগুনতি শিকার করবার সরকারি পারমিট মানে হুকুমনামা সে তো উগাণ্ডার অরণ্য-দপ্তরের বড়কর্তার কাছ থেকে নিজে নিয়ে নিয়েছে। টাইকুন ট্যানার-এর নাম জানতে কারও বাকি নেই। সেই টাইকুন ট্যানার নিজে সশরীরে অফিসে এসেছে। বন-বিভাগের বড়কা তাকে খাতির করে কোথায় বসাবেন ভেবে পাননি। টাইকুন ট্যানার-এর চেহারাটা তার ঐশ্বর্যের মাপে এমন দশাসই যে একটা প্রমাণ মাপের কোচ-এ তাঁকে আঁটানো যায় না। টাইকুন ট্যানার অবশ্য কোথাও বসার বদলে আগাগোড়া দাঁড়িয়েই বন-বিভাগের বড়কর্তার সঙ্গে তাঁর কথা সেরেছেন। শিকারের পারমিটটা সেখানে দাঁড়িয়েই তিনি পড়ে দেখেছেন যে অন্যসব সাধারণ জানোয়ারের বেলা তেমন কড়াকড়ি না থাকলেও হাতি গণ্ডার সিংহের মতো বড় বড় জানোয়ারের বেলা শিকারের অনুমতি দারুণ কড়া। এ হুকুমনামা পড়েও অন্য অনেকের মতো বিন্দুমাত্র অনুযোগ-আপত্তি না জানিয়ে টাইকুন ট্যানার যেন খুশি মনে বন-বিভাগের বড়কর্তার সঙ্গে করমর্দন করে চলে আসবার সময় শুধু জিজ্ঞাসা করেছে, শিকার যতই গোনাগুনতি করে রাখা হোক, সফরির লোকলস্কর লটবহরের বেলা সেরকম কোনও বিধিনিষেধ নেই তো?
না, তা নেই। বন-বিভাগের বড়কর্তা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, কিন্তু অত বড় বিরাট বাহিনী আপনি সঙ্গে নিচ্ছেনই বা কেন? ওর অনেক ঝামেলা।
ওই ঝামেলা পোহানোতেই আমার সুখ, বলেছে টাইকুন ট্যানার, তাছাড়া বিরাট আর কোথায় দেখলেন! শিকারি আমার একজন, ওই বব কেনেথ!
হ্যাঁ, ও তো একাই একশো। হেসে বলেছেন অফিসার, ওর চেয়ে বড় শিকারি এখন সারা আফ্রিকায় আর কেউ আছে বলে জানি না।
হ্যাঁ, তাই শুনেছি বলেই ওকে নেওয়া। দেখা যাক, যত হাঁক ডাক তত এলেম সত্যি আছে কি না! হেসে বলেছে টাইকুন ট্যানার।
এর ওপর আপনি শিকারের বন্দুকও গণ্ডা গণ্ডা নিয়েছেন—দেখলাম আমাদের অফিসে পাঠানো আপনার লটবহরের তালিকা থেকে। অত বন্দুক আপনার মিছিমিছি বওয়াই সার। কী কাজে লাগবে আপনার অত বন্দুক? হাসিমুখেই জিজ্ঞাসা করেছেন। বন-বিভাগের ওপরওয়ালা অফিসার।
মনে করুন, ও শুধু নিজের অহংকারকে একটু তোয়াজ, বলেছে টাইকুন ট্যানার, ওগুলো যে সঙ্গে আছে তাই দেখার সুখ। আর শুধু, এখন দুনিয়ার সেরা যা শিকারের বন্দুক আছে তা সব তো ওর মধ্যে আছেই, সেই সঙ্গে সেরা একজন বন্দুকের ডাক্তারকেও সঙ্গে নিয়েছি।
বন্দুকের ডাক্তার? রীতিমতো অবাকই হয়েছেন বন-বিভাগের বড়কর্তা—সে আবার কী?
কী তা বুঝলেন না! টাইকুন ট্যানার বলেছে, ডাক্তার মানে হালের বন্দুকের কারিগরির সেরা মিস্ত্রি। ম্যাচলককে যে রাইফেলের সঙ্গে পাল্লা দেওয়াতে পারে।
তা ভালো! তা ভালো! মনে মনে এই দাম্ভিক টাকার কুমিরটার ওপর যতই খাপ্পা হয়ে উঠুন, মুখে হাসি টেনে বন-বিভাগের বড়কর্তা বলেছেন, আইনকানুন সব মেনে আপনার এত সাধের সফরি সার্থক হয়ে ফিরে আসুক এই শুভকামনাই জানাই।
ও, আপনাদের আইনের কথা বলছেন? কিচ্ছু ভাববেন না, ফিরে আসার পর তার গায়ে আঁচড়ও দেখতে পাবেন না। এ শুভকামনার জন্য ধন্যবাদ, বলে টাইকুন ট্যানার বন-বিভাগের বড়কর্তার এমন করমর্দন করে দপ্তর থেকে বেরিয়ে এসেছে যে জখম হাত নিয়ে বনের বড়কর্তাকে ককিয়ে ওঠা চাপতে হয়েছে অনেক কষ্টে।
টাইকুন ট্যানার-এর যাদের নিয়ে অত হম্বিতম্বি তার সফরিতে গোল বাধল কিন্তু তাদের নিয়েই—সেই কে না কে বন্দুকের ডাক্তার আর আফ্রিকার সেরা শিকারি বব। কেনেথ।
ঢাইকুন ট্যানার-এর সফরি তখন জানা-অজানা অনেক বন জঙ্গল পার হয়ে এক নতুন জায়গায় আস্তানা গেড়েছে। এ পর্যন্ত যা শিকার হয়েছে তা সাধারণ তিনটে দলের সফরির পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু ট্যানারের তাতে মন ভরেনি। এ সফরি থেকে সে এমন কিছু মেরে নিয়ে যেতে চায়, দুনিয়ার শিকারিমহলের চোখ যাতে ছানাবড়া হয়ে যাবে।
এই নতন আস্তানায় সেই ভাগ্যই যেন তার জন্য অপেক্ষা করছিল। আস্তানা পাতবার পরের দিনই সকালে নিজের বাদশাহি তাঁবু থেকে বেরিয়ে কাছাকাছি জঙ্গলটা একটু ঘুরে আসতে গিয়ে সে এক জায়গায় এসে দাঁড়াবার পরই আতঙ্কে যেমন কেঁপে উঠল তেমনই হয়ে গেল মোহিত।
ভদ্রলোক এই মোক্ষম জায়গায় এসে, হঠাৎ থেমে গিয়ে, নিজের গায়ের কোটটার দুদিকের পকেট দুটো দুবার চাপড়ে, মুখটায় কেমন যেন বিরক্তি ফুটিয়ে চুপ করে গেলেন।
কী হল কী তাঁর হঠাৎ ভেবে যখন আমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছি শিশির তখন ব্যাপারটা ঠিক বুঝে ফেলে তার হাতের টিন থেকে একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিয়ে বললে, সিগারেট খুঁজছেন? এই নিন না।
