তেতলায় ন্যাড়া ছাদের ঘর? আমরা ব্যস্ত হয়ে উঠে বলেছি, সেটা আবার ঘর কোথায়? যতসব ফালতু ভাঙাচোরা আসবাবপত্রে ভরা চোর কুঠুরি বললেই হয়।
তা হোক, ভদ্রলোক আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, ওখানে একটা ভাঙা তক্তপোশ রয়েছে দেখলাম। ঘরটা একটু পরিষ্কার করে আমার ব্যাগটা নিয়ে দুদিন বেশ কাটিয়ে দিতে পারব। ব্যাগটা তাই এখন নিতে এসেছি।
ঘরের টুকিটাকি দু-চারটে জিনিস রাখা বড় গোলটেবিলটার ওপর থেকে তাঁর ক্যাম্বিসের ব্যাগটা তুলে নিয়ে ভদ্রলোক চলে যাবার জন্য দরজার দিকে পা বাড়িয়ে যেন আমাদের আশ্বস্ত করবার জন্যই বলেছেন, ওই জার-বোয়া জবাবের জন্যেই তো অপেক্ষা। তা হয়তো অন্তত কালই পেয়ে যাব পাওয়া তো উচিত।
কী বললেন? কীসের জবাব? আমাদের সকলের প্রশ্নটা গৌরের মুখেই এবার শোনা গেছে।
জবাবটা জার-বোয়া ছাপের। মানে জার-বোয়া ছাপের ইশারায় ভদ্রলোক যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটু বিশদ হয়েছেন—কাগজে ও ছাপ দেখেই আমি আর কোনও ভুল করিনি। যেমন কথা ছিল তেমনই, যেখানে ও ছাপ দেখেছি সেখানেই, তখনই যেমন জুটেছে তেমনই আস্তানা জোগাড় করে যথাস্থানে ঠিকানা জানিয়ে দিয়েছি। এখন শুধু জবাবটা আসার অপেক্ষা। জার-বোয়ার ছাপ, কাগজে যে ছাপিয়েছে, গরজটা নিশ্চয়ই তার এমন যে জবাব দিতে এক লহমা সে দেরি করবে না। চাই কী, আপনাদের এই বনমালি নস্কর লেনে স্বয়ং সেই বব কেনেথই—
ওই পর্যন্ত বলেই ভদ্রলোক হঠাৎ থতমত খেয়ে থেমে গিয়ে, না, না, এসব কী বলছি। মাপ করবেন আপনারা, বলে তাঁর ব্যাগটা নিয়ে বারান্দার দরজার দিকে এগিয়েছেন।
কিন্তু দু পা-র বেশি বাড়াতে তিনি পারেননি। আমাদের সকলের হয়ে শিশিরই দাঁড়িয়ে উঠে তাঁকে বাধা দিয়ে বলেছে, আহা, যাবার জন্য অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? আপনার সেই চার পোয়া ছাপ যে ছেপেছে—
চারপোয়া নয়, জার-বোয়া! শিশিরকে বেশ একটু করুণার সঙ্গেই সংশোধন করে ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করেছেন, জার-বোয়া কী তা তো নিশ্চয় জানেন?
না। অত্যন্ত লজ্জিত ভাবে নিজেদের মূর্খতা স্বীকার করে বলেছি, জার-বোয়া বল্লম উল্লমের মতো কোনও অস্ত্রশস্ত্র, না কোনও রকম বাদশাহি পোশাকটোশাক?
না, সে সব কিছু নয়, অনুকম্পাভরে ভদ্রলোক জানিয়েছেন, জার-বোয়া হল সাহারার মরু অঞ্চলের এক রকম ইঁদুর। ইদুরের বদলে—
ভদ্রলোক এই পর্যন্ত বলতেই শিশির, শিবু দুজনেই এক সঙ্গে উঠে পড়ে তাঁর হাত থেকে ক্যাম্বিসের ব্যাগটা টেনে নিয়ে তাঁকে ধরে একটা খালি চেয়ারে বসাতে বসাতে বলেছে, আহা, আপনি যাবার জন্য অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? আপনার সেই জার-বোয়া ছাপের মক্কেল তো আর দোতলা বাদ দিয়ে আপনার তেতলায় পৌঁছতে পারবে না। আপনি এখানেই বসুন না। তারপর ওই মরু অঞ্চলের ইঁদুর জার-বোয়া নিয়ে কী যেন বলছিলেন?
ওই জার-বোয়া নিয়ে? ভদ্রলোক বেশ যেন একটু অনিচ্ছার সঙ্গে একটা চেয়ারে বসে বলেছেন, হ্যাঁ, বলছিলাম যে ইঁদুরের বদলে ওকে উত্তর আফ্রিকার মরুভূমির খুদে ক্যাঙ্গারু বললেই যেন ঠিক হয়। ক্যাঙ্গারুদের মতো সামনের পা দুটি খুদে খুদে আর পেছনের পাগুলো সামনের চেয়ে প্রায় ছ-গুণ লম্বা। ইঁদুরগুলো তাই তাদের আকারের তুলনায় ক্যাঙ্গারুদের চেয়ে লম্বা লাফ দিতে পারে।
তা পারে তো পারে! আমিই প্রথম একটু ঠাট্টার সুর লাগিয়ে বলেছি, উত্তর আফ্রিকার এক ক্যাঙ্গারু-মার্কা ইঁদুরের এত কী খাতির যে তার ছবি কোথাও ছাপা দেখলেই একপায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়াতে হবে, আর ওই ক্যাঙ্গারু-দুরের ছবি ছাপাও। বা হয়েছে কোথায়? এখানকার কোনও কাগজে তো দেখিনি।
এখানকার কোনও কাগজে দেখেননি! ভদ্রলোকের গলায় এবার যেন অবোধের প্রতি অনুকম্পা—তা দেখবেন কী করে? এখানকার কোনও কাগজে তো নেই, ও ছাপ বেরিয়েছে খাস লন্ডন টইমসে।
লন্ডন টাইমসে বেরিয়েছে আর আপনি–?
আমার কথাটা আর শেষ করতে হয়নি। ভদ্রলোক নিজেই বাক্যটা সম্পূর্ণ করে বলেছেন, আর আমি এখানকার ইমপিরিয়াল লাইব্রেরিতে গিয়ে সেটা দেখে এসেছি। যেখানে যখন যাই আর থাকি ওই লন্ডন টাইমসটার ওপর আগাগোড়া চোখ বোলানো আমার সাত বছরের নিত্য কর্ম।
সাত বছর! আমাদের সকলের হয়ে গৌর দূ-চোখ প্রায় কপালে তুলে বলেছে, আপনি সাত বছর ধরে লন্ডন টাইমস-এর ওপর চোখ বুলিয়ে আসছেন?
হ্যাঁ প্রায়–সাত বছরই তো হল। ভদ্রলোক একটু যেন দুঃখের সঙ্গে জানিয়েছেন।
কিন্তু কেন? সাত বছর ধরে রোজ রোজ নিয়ম করে একটা বিশেষ বিদেশি কাগজের ওপর চোখ বুলিয়ে যাওয়া সোজা কথা নয়। তার একটা কারণ নিশ্চয়ই আছে! শিশির আমাদের সকলের মনের কথাটাই প্রকাশ করেছে।
তা কারণ আছে বইকী। নিশ্চয় একটা কারণ আছে। ভদ্রলোক এখনও যেন কথাটা খোলসা করে বলতে চান না।
কিন্তু আমরা ছাড়বার পাত্র নয়। সোজাসুজি তাঁকে চেপে ধরেছি—তা সেই কারণটা একটু খুলে বলুন না!
খুলে বলব? ভদ্রলোক এখনও যেন দ্বিধা করে তারপর বলেছেন, তাহলে যেতে হবে কিন্তু উগাণ্ডায়!
উগাণ্ডায়? আমরা বিমূঢ়। গৌরই প্রথম নিজেকে সামলে জিজ্ঞাসা করেছে, উগাণ্ডা মানে আফ্রিকার উগাণ্ডায়?
হ্যাঁ, সেখানকার রিজার্ভড ফরেস্ট মানে অভয়ারণ্যে। ভদ্রলোক যেন বাধ্য হয়ে জানিয়েছেন।
কিন্তু সেখানে এখন যাব কী করে? জিজ্ঞাসা করে আর যা বলতে যাচ্ছিলাম তা আর বলা হয়নি।
ভদ্রলোক তাড়াতাড়ি আমাদের ভুল শুধরে দিয়ে বলেছেন, না না, এখন নয়, যাবার কথা বলছিলাম সাত সাড়ে সাত বছর আগেকার উগাণ্ডার সংরক্ষিত অরণ্যে। মানে সমস্ত ব্যাপারটার সেখানেই শুরু কিনা। শুরু টাইকুন ট্যানার-এর সেই আফ্রিকা-চমকানো শাহানশাহি-সফরি-তে!
